মাননীয় আইনপ্রণেতা মাশরাফির উদ্দেশ্যে বলছি …

0

জাকিয়া সুলতানা মুক্তা:

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা জীবনে আমি আমার এমন সহকর্মীদেরও দেখেছি যাঁরা দিনের পর দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। ঠিকঠাক ক্লাস তো নেনই না, অধিকন্তু পরীক্ষার জন্য প্রশ্নপত্র মডারেশন বোর্ড চলার সময়ে এসে ওনারা প্রায়শই ভুলভালভাবে প্রশ্নপত্র জমা দেন, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি করেন, পরীক্ষার ফলাফল দিতে মাত্রাতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয় শুধু তাদের কাছে গচ্ছিত মূল্যায়ন পত্র দেরি করে জমা দেয়ার কারণে, ফলাফল প্রস্তুত করার ব্যাপারে ওনাদের যাচ্ছেতাই অসহযোগিতা ইত্যাদি ইত্যাদি।

উপর্যুক্ত বিষয়াদির বেশিরভাগকেই গর্বভরে প্রশাসনিক কার্যক্রম বলে আখ্যায়িত করে, সেসব ওনারা ভালো পারেন না দাবি করতে দেখেছি।
দেখেছি কেবল ক্লাসটাই নাকি ওনারা ভালো নিতে পারেন এমনটা দাবি করতে!
যদিও ওনাদের ক্লাসেও যথাসময়ে পাওয়া যায় না।

যাই হোক, এসব শিক্ষক নামের মহীরুহদের কিন্তু জায়গায়-বেজায়গায় অহরহ ক্ষমতাদণ্ডের আশপাশ দিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়।
উপরন্তু ওনারা মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে ভীষণ জনপ্রিয়ও বটে।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কাজে ওনাদের খুব একটা না পাওয়া গেলেও আর্থিক বিষয়াদিতে ওনাদের যারপরনাই একাগ্রতা অবলোকন করেছি এ কয়বছরের অভিজ্ঞতায়।

ওনাদের দেখেছি নতুন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের বেলায় কোনরকম ছাড় না দেয়ার মনমানসিকতা ধারণ ও লালন করতে এবং ব্যক্তিগত অর্জনের পথে বৈধ ও অবৈধ পন্থায় বিভিন্ন সুবিধাদি নেয়ার কূটকৌশলে লিপ্ত হতে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষকতাকে এখন আর উপভোগ করি না, কেবল এই জাতীয় শিক্ষক নামধারী অপশিক্ষকদের জন্য এমন বলবো না কেবল। আমি এই পেশার প্রতি বীতশ্রদ্ধ বর্তমান সময়ের অধিকাংশ চাটুকার টাইপ শিক্ষার্থী-অভিভাবক এবং তৈলপ্রিয় প্রশাসন ও এসব হঠকারিতার প্রেষণাদানকারী প্রশাসনের কার্যক্রম লক্ষ্য করেও।

কিন্তু এতো অনিয়ম, এতো বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও আমি এটা মেনে নিতে অপারগ যে কোন জনপ্রতিনিধি মাস্তানি স্টাইলে, পূর্বে কোন ধরনের সতর্কবাণী না দিয়ে কিংবা কীভাবে উনি প্রশাসন চালাতে চান তার বর্ণনা না দিয়ে (যেহেতু এই দেশের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই একটা অদ্ভূত উটের পিঠে চড়ে বেড়াচ্ছে, তার প্রেক্ষিতেই বলছি!) হুটহাট জনসম্মুখে কোন পেশাজীবীকে হেনস্থা করাকে!

কোন প্রশাসক দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর অবশ্যই তাকে তার অধীন প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনে একটা বিস্তারিত কর্মকাঠামো দিকনির্দেশনা হিসেবে দিতে হবে। মানুষ একভাবে চলায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে তা রাতারাতি পাল্টাতে গেলে মুশকিল বাঁধে। কারণ অনিয়মগুলো একদিনে এই কাঠামোতে এসে দাঁড়ায়নি।
এগুলোকে নিয়মে আনতে হলে, ধৈর্য নিয়ে কাজ করার মন-মানসিকতা থাকতে হবে।

ফাঁক-ফোঁকড় বের করে, নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার বজায় রেখে অতিরিক্ত দায়িত্ব এভাবে হেলাফেলা করে লোকদেখানো হম্বিতম্বির মাধ্যমে করা শোভনীয় নয়।

আমি উপরে বর্ণিত নীতিহীনতার অবসান অবশ্যই চাই, এবং সেটা চাই কোন সুষ্ঠু সুন্দর উপায়ে, এমন অশোভন আচরণের মাধ্যমে নয়।
কারণ তাহলে ওই নীতির মুখোশ পড়া নীতিবিবর্জিত ফাঁপা মানুষগুলোর মতোনই; ফাঁপড়বাজ বলে মনে হয় মাস্তানি স্টাইলপ্রিয় এসব জনপ্রতিনিধিদেরকে!
এগুলো সুস্থ কাজের লক্ষণ নয়।

ফাটাকেস্টদের সিনেমা নাটকেই দেখতে ভালো লাগে, বাস্তবে কাজের একটা সুনির্ধারিত কাঠামো আছে।
সেসব ঠিকঠাক পালন করানো গেলেই দেশের প্রশাসন সঠিকভাবে কাজ করবে।
এইসব লোক দেখানো কার্যক্রম অগ্রহণযোগ্য।

কর্মক্ষেত্রে অন্যায়কারীকে শাস্তি দেয়ার সুনির্দিষ্ট তরিকা আছে, তাই বলে কাউকেই জনসম্মুখে অপমান করার অধিকার কারোর নাই; তা সে যতই গুরুতর কারণ থাকুক না কেন, এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত।

মজার ব্যাপার কী জানেন, আমার যেসব সহকর্মীগণ ঐসব নীতিহীন কাজ করে থাকেন, ওনারা কিন্তু যতটা সময় কর্মস্থলে থাকেন;
সেসময়টাতে ওনারা এতোটাই হম্বিতম্বি করে থাকেন, যাতে মনে হয় ওনাদের চাইতে বেশি আর ফলপ্রসূ কাজ বুঝি আর কেউ করেন না বা করতে পারেন না!

এমপি হয়ে দুই-তিন মাস বা কেউ কেউ দিনের পর দিন এলাকায় না এসে, জনগণের সুখ-দুঃখের খবরাখবর না নিয়ে, সংসদে তাদের প্রয়োজন তুলে না ধরে; কেবল লোক দেখানো ভিডিও বাজারে ছাড়লে, মাথামোটা জনগণের কাছে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায় বটে, কিন্তু আপনাদের ফাঁকিবাজি গলতিভরা কাজের দৃষ্টান্ত তাতে অসত্য হয়ে যায় না!

ওহ!
ওই পেশাজীবী নিজের কর্মস্থলে ছিলেন না বটে, আর আপনি বা আপনারা তো দেশের নাম উজ্জ্বল করতে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তখন! সেলিব্রেটি বলে কথা, আপনাদেরতো সাত খুন মাফ!!

জানেন, আমার বর্ণিত ওইসব শিক্ষক সহকর্মীগণও ঐ একই ভাষায় কথা বলে!

ওনাদের নীতিহীনতার সাথে আপনাকেও একই কাতারে দেখতে চাইনি বলে কষ্ট লাগছে, এটাই হলো মূল কথা।

মাননীয় এমপি সাহেব,
এটা জানেন তো যে আপনি জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য হয়েছেন দেশের বিদ্যমান আইন জনগণের সেবায় প্রয়োজনে ঢেলে সাজানোর জন্য, দরকার হলে নতুন আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার জন্য।
এইসব লোকাল ফাঁপড়বাজি করার জন্য নয়।
এগুলো সংসদ সদস্যদের কাজ নয়।

এলাকার উন্নয়নে কাজ করবে এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বারগণ। প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর তদারকিতে, অধিদপ্তরগুলোর সাহায্য-সহযোগিতায়-দিক নির্দেশনাতে।
আপনি করবেন আইন প্রণয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আপনি ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবেন; যদু-মদু-কদুর গাফিলতি ধরার দায়িত্ব আপনার নয়, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের।

যাই হোক।
অবশেষে এমপি মাশরাফির কল্যাণে চারজন ডাক্তার ওএসডি হয়েছেন জানতে পারলাম।
ভালো খবর। দায়িত্বে অবহেলা করলে এমন ওএসডি করানোটাই স্বাভাবিক।

জাকিয়া সুলতানা মুক্তা

যদিও এমপি মাশরাফি সাহেবের একজন পেশাজীবীকে ধমকানোর ভিডিও, ভাইরাল করানোর স্টাইলটা পছন্দ হয়নি আগেই বলেছি।
চেয়েছিলাম নিয়মমাফিক কোন উদ্যোগ নেয়ার। সেটা নেয়া হয়েছে, তাই এ ব্যাপারে আমার কোন আপত্তি নেই।

প্রশ্ন হলো, এই কাজ এমপি মাশরাফিকে কেন করতে হলো? এই কাজের জন্যতো একটা মন্ত্রণালয় আছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নামে! তাদের তদারকির এই বেহাল দশা কেন? তাদের দায়িত্ব এমপি মাশরাফিকে নিয়ে হলো কেন?

এখন আমি ডাক্তারদের সাথে সাথে একইভাবে দেখতে চাই দেশের অপরাপর পেশাজীবী/চাকরিজীবীদেরকেও দায়িত্বে গাফিলতির কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকিতে যথোপযুক্ত শাস্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত হওয়া।

তারও আগে চাই, কেন এসব পেশাজীবী/চাকরিজীবী কর্মস্থলে থাকতে চান না, তা আন্তরিকতার সাথে খতিয়ে দেখে সেসবের সুরাহা করার ব্যবস্থা করা।

কেবল বেতন-ভাতাদি বাড়িয়ে কর্মস্থলে কাউকে নিয়মিত রাখা যায় না, দায়িত্ব পালনে কেবল বেতন-ভাতাই প্রেষণা হিসেবে কাজ করে না। এগুলো বোঝার মতন সুস্থ মস্তিষ্কের, ধৈর্যশীল প্রজ্ঞাবান মননের প্রশাসনিক কাঠামো সৃষ্টি বাস্তবায়িত হতে দেখতে চাই একইসাথে।

ডাক্তাররা কেন থাকেন না কর্মস্থলে? গিয়ে দেখেন, অন্যান্য পেশাজীবীদের/চাকরিজীবীদের অধিকাংশই প্রত্যন্ত অঞ্চল হলেও তাদের কর্মস্থলে ইচ্ছা না থাকলেও যান, কিন্তু ডাক্তারগণ যেতে চান না!

কেন চান না? শুধু অহমিকার কারণে যেতে চান না, এটা আমি অন্তত মানি না! মূল কারণ অনেক দূরের, দয়া করে খতিয়ে দেখেন।

আপনারা দেশের একটা মেধাবী অংশকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পাঠাতে চাইবেন, কোন রকম কোন প্রণোদনা না দিয়ে; তাতো হতে পারে না! রাজধানী শহরের বাইরে গেলেই যেকোন পেশাজীবী/চাকরিজীবীর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার কেন ক্ষতির সম্মুখীন হয়, খুঁজে দেখেন!

একজন পেশাজীবী/একজন গবেষককে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সমর্থন না দিলে, সে ছাপোষা চাকরিজীবী ব্যতীত আর কিছুই হতে পারে না! এই কষ্ট আপনারা অনুধাবন করার সক্ষমতা রাখেন কি?

সবাই কি চাকরিজীবী হতে চায়?
চায় না।
কেউ কেউ আছেন যাঁরা পেশাটাকে সাধনা হিসেবেও নিতে চান। গবেষণা করতে চান, নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলে সমাজের কাজে লাগতে চান।

আছে এরকম কোন সুযোগ রাজধানীর বাইরে বা ভেতরেও যথেষ্ট পরিমাণে?
নেই!

কোন পেশাজীবী/ কোন চাকরিজীবীই আজ সন্তুষ্ট নয় তার কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নিয়ে!
কেন নেই তা খুঁজে দেখুন।

কেন একই চাকরি কাঠামোর (বিসিএস ক্যাডার হয়েও!) অধীনে ডাক্তাররা একরকম ব্যবহার সমাজের কাছ থেকে পান, একধরনের সুযোগ-সুবিধা পান; আর অপরাপর ক্যাডারভূক্তরা অন্যরকম বৈধ-অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নেয়ার রাস্তা পান; এগুলো খুঁজে দেখুন।

এসবও যে ডাক্তারদের কর্মস্থলবিমুখ হতে প্রণোদনা দেয়, তা খতিয়ে দেখুন দয়া করে।

সবাই টাকাগোনার মতন চামার হয় না। দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন।

দেশের ক্ষমতাদণ্ডকে দয়া করে বিকেন্দ্রীকরণের আওতায় আনুন। উন্নয়নের এই জোয়ারে এই বিকেন্দ্রীকরণ করার সুবর্ণ সুযোগ বর্তমানে আছে, সুযোগটা দয়া করে কাজে লাগান।

প্রতিটি অঞ্চলেই যেন প্রতিটি পেশার/চাকরির অধীন সবাইকে সন্তুষ্ট রাখার মতন পরিবেশ বিদ্যমান থাকে, এটা নিয়ে কাজ শুরু করুন।

বিশৃঙ্খলার পুরু দেয়াল ভাঙ্গতে, তাহলে আর মাস্তানি/ফাঁপড়বাজি স্টাইল ধরার প্রয়োজন হবে না আশা করি।

দেশ চালনায় প্রতিটি সেক্টর ঢেলে সাজাতে, সব সেক্টরগুলোকে নিয়মের মাঝে আনতে~
দয়া করে দেশের সব সেক্টরগুলোর অতীত-বর্তমান পর্যালোচনা করে, ভবিষ্যৎ অবস্থা সুনিয়ন্ত্রণ ও সুন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য একটা দীর্ঘমেয়াদি কর্ম-পরিকল্পনা তৈরিতে কাজ করুন।
বেশি করে সংশ্লিষ্ট সেক্টরগুলোর সমস্যা চিহ্নিতকরণে এবং সমস্যাগুলোর থেকে উত্তরণে প্রজ্ঞাবান  অভিজ্ঞ গবেষক নিয়োগ দিন।

আর্থ-সামাজিক অবস্থা, বাস্তবিক রাজনৈতিক প্রভাব বলয় আর এই প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো না বুঝে, তাদের চাহিদাকে উপেক্ষা করে কোন প্রশাসনকেই সুন্দর অবস্থায় আনা সম্ভব নয়।

তাই চেষ্টা করুন মাননীয় এমপি মহোদয়,
দেশকে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে, চাটুকারিতার নোংরা গণ্ডি থেকে বের করার যাবতীয় ধনাত্মক প্রকল্প হাতে নেয়ার।
এসব ফাটাকেস্ট স্টাইল কাম্য নয়।
অন্তত আপনার মতন মানবিক ও আমরা এতদিন যা জেনে এসেছি যে আপনি একজন বিবেচনাবোধসম্পন্ন মানুষ, আপনার মতন মানুষের কাছ থেকে তো অবশ্যই নয়।

সবশেষে
এই যে চিকিৎসাক্ষেত্রে অনিয়মের চিত্রটা সবার সামনে আপনার কল্যাণে আরও একবার আলোচিত হলো, এটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে চাই।
যদি এর মাধ্যমে সুদূরপ্রসারী ধনাত্মক কোন পরিবর্তন সূচিত হয় তবেই এবং তা শুধু এককভাবে চিকিৎসাক্ষেত্রেই নয়, সবক্ষেত্রেই সঠিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা দেখতে চাই।

শেয়ার করুন:
  • 121
  •  
  •  
  •  
  •  
    121
    Shares

লেখাটি ১,৩৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.