বিদেশে বাঙালী প্রবীণ ডে কেয়ার ও আমাদের সময়

0

রিমি রুম্মান:

অনেক আগে নিউইয়র্কের বাইরে কানেক্টিকাটে এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য দেশ থেকে বেড়াতে আসা তাদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সাথে সাক্ষাত করা। দুই মাসের ছুটিতে এদেশে এলেও সেখানে গিয়ে জানলাম সহসাই দেশে ফিরে যাচ্ছেন তারা।
যতোটা আগ্রহ নিয়ে একমাত্র পুত্রের কাছে বেড়াতে এসেছিলেন, ততোধিক মনখারাপ নিয়ে ফিরে যেতে চাইছেন। শ্বশুর-শাশুড়ির এই আগমনে পুত্রবধূ খুশি হতে পারেনি, কেননা তার স্বাভাবিক, স্বাধীন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল। পুত্রবধূর অসন্তুষ্টির বিষয়টি টের পেয়ে প্রচণ্ড রকমের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষিত এই প্রবীণ দম্পতি দেশে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি এমন যে, আমাদের যে ভালোবাসতে পারেনি, ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি, অন্তত তাকে বিরক্ত করা থেকে দূরে থাকা গেলো ! অতঃপর নির্ধারিত সময়ের আগেই তারা ফিরে যান দেশে।

রিমি রুম্মান

তখন এদেশে দীর্ঘ শীত শেষে কেবল বসন্ত এসেছে। বসন্তের প্রথম প্রহর বলা চলে। তাদের আর এদেশের ম্যাগনোলিয়া কিংবা চেরি ফুলের উপর সূর্যের স্নিগ্ধ কিরণ এসে পড়ার সময়কার অসাধারণ সব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা হয়নি। শহরময় গাছে গাছে নতুন গজিয়ে উঠা হালকা সবুজ পাতারা যে ঔজ্জ্বল্য বিলানো শুরু করেছে, রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোয় ফুলের মিষ্টি সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়েছে, কিছুই দেখা হয়নি প্রবীণ এই দম্পতির।
প্রবীণ শব্দটির সাথে জড়িয়ে থাকে কুঁচকে থাকা চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে অভিজ্ঞতা বহনকারী, জীবনের দীর্ঘ সময় পাড়ি দেয়া শুভ্রকেশধারি, দৃষ্টিশক্তি ধূসর ঘোলাটে, বয়সের ভারে খানিক নুইয়ে আসা মানুষ। অনেকটা খুব ধিরে ভূগর্ভে বিলীন হওয়া কোন নগরীর মতো।

আরেকবার জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম এক বন্ধুর বাবা-মা’কে বিদায় জানাতে। তারা এসেছিলেন এদেশে পুত্রের কাছে ইমিগ্রেন্ট হয়ে। কনকনে শীত আর তুষারপাতের সময়ে অনেকটা গৃহবন্দী সময় কাটিয়ে হাঁপিয়ে উঠে অবশেষে তিনমাসের প্রবাস জীবনের পাট চুকিয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন দেশে। এয়ারপোর্টে যথারীতি প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে ওয়েটিং এরিয়ায় অপেক্ষা করছিলাম আমরা। নিজেদের মাঝে গল্প করছিলাম দেশ এবং প্রবাস নিয়ে। প্লেন ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এলে বিদায়ের পালা আসে। যাত্রীরা একে একে সিকিউরিটি চেকিং এর জন্যে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বিমান, বিধায় যাত্রীদের প্রায় সকলেই বাংলাদেশি। চলে যাওয়া আর থেকে যাওয়া, দুই পক্ষই অশ্রুজলে একে অপরকে বিদায় জানাচ্ছিলেন।
বিদায় মুহূর্তটি বড় বেদনাদায়ক। মানুষের এইসব মনখারাপ করা বিষাদগ্রস্ত মুখ আমার মাঝেও সংক্রমিত হয়। আচমকা ৫/৬ বছরের ছোট্ট এক বালিকার কান্নার শব্দে আমরা সকলেই সেদিকে ফিরে তাকাই। বাবা-মায়ের সাথে শিশুটি এসেছে তার দাদুকে বিদায় জানাতে। দাদুর কোল থেকে কিছুতেই তাকে নামানো যাচ্ছিল না। শিশুটি যথাসাধ্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দাদুর গলা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছিল, আর বারবার বলছিল, ‘দাদু, ডোন্ট লিভ মি এলোন… ‘। শিশুটির বাবা তাকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিল। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! সেইসময়ে সেখানে আমরা যারা উপস্থিত ছিলাম। আমাদের সকলের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে। কাউকে কাউকে চোখ মুছতে দেখা যায়। অবশেষে আমাদের পালা। বন্ধুর বাবা-মা তাদের ৬/৭ বছরের নাতিকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুজলে বিদায় নেন।

আমরা ফিরছিলাম পার্কিং লটের দিকে, যেখানে আমাদের গাড়িগুলো অপেক্ষমান। যেতে যেতে বন্ধুপত্নীকে বললাম, তাদের ছোট্ট ছেলেটিরও নিশ্চয়ই ক’দিন মনখারাপ থাকবে দাদা-দাদুর জন্যে। আমায় অবাক করে দিয়ে তিনি জানালেন, তার ছেলেটি বরং খুশিই হয়েছে। এয়ারপোর্টে আসবার পথে শিশুটি নাকি মাকে জানিয়েছে, ‘ভালোই হয়েছে, এবার আমরা আরাম করে থাকতে পারবো’। এতোদিন ইচ্ছেমত টিভি দেখতে পারেনি দাদা-দাদুর কঠোর শাসনে। নিজগৃহে থেকেও স্বাধীনভাবে যা খুশি তা করতে পারেনি। আমার কিঞ্চিৎ মনখারাপ হয় শিশুটির এহেন মনোভাবের কথা জেনে।

বাড়ি ফিরছিলাম। শত শত গাড়ি শাঁ শাঁ শব্দে হাইওয়ে ধরে ছুটে চলছিল। আমি জানালায় বাইরে চেয়ে ভাবছি, ঠিক ওদের বয়সে আমরা দাদুকে পেলে কতোই না খুশি হতাম! গ্রাম থেকে আমাদের শহরের বাসায় বেড়াতে আসতেন দাদু। ক’দিন থাকতেন। চলে যাবার সময় যতোই ঘনিয়ে আসতো, আমাদের মনখারাপের ঘনত্বও বাড়তে থাকতো। কয়দিন কী ভীষণ নিঃসঙ্গ মনে হতো নিজেকে। অথচ সেদিন দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ঘটনা দেখা হলো। দুটি শিশু সম্পূর্ণ দুই ধরনের মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে। আমার মনে হলো পরিবারের বড়রা যদি বয়োবৃদ্ধদের সম্মানের চোখে দেখে, গভীর ভালোবাসায় আগলে রাখে, তবে শিশুরাও একই মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে।

পরক্ষণেই মনে হলো, সবচেয়ে বড় বাস্তব সত্য হলো, বিদেশের যান্ত্রিক জীবনে পরিবারের প্রতিটি সদস্যই নিজ নিজ অবস্থানে ব্যস্ত। দিনের শুরুতে কেউ কর্মক্ষেত্রের দিকে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে, কেউবা স্কুল কিংবা কলেজে থাকে সারা দিনমান। বয়োবৃদ্ধ বাবা-মাকে যত্ন আত্তি করা, সময়মত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, সে সময়টুকু কোথায়? সার্বক্ষণিক দেখভালের মানুষ তো নেই এই ভিনদেশে।
তাছাড়া প্রবীণরা তাদের পুরনো রীতিনীতি কিংবা মানসিকতা সন্তানদের উপর, ভিনদেশে বেড়ে উঠা নাতি-নাতনিদের উপর চাপিয়ে দিতে চান। কিন্তু দুই কিংবা তিন প্রজন্মের মাঝে সময়ের ব্যবধানের কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানসিকতার বড় একটি ব্যবধান থাকবেই। এভাবেই মতপার্থক্য থেকে মতবিরোধ, এবং মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। অগ্রজরা ভাবেন তাদের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। অযত্ন আর অবহেলা করা হচ্ছে। একসময়ের শারীরিক কর্মক্ষম, দাপুটে মানুষগুলোর শেষ বয়সে এসে দূরদেশে এহেন নিরানন্দের জীবন ভালো না লাগাটাই স্বাভাবিক।

তবে এখন অবস্থা অনেকটা বদলেছে। জীবন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে উঠেছে। আগে যারা বাবা-মাকে এদেশে রাখতে বোঝা ভাবতেন, তাদের অনেকেই এখন বয়োবৃদ্ধ বাবা-মাকে নিজের কাছে এনে রাখছেন। ‘হোম কেয়ার’ সার্ভিস এর কল্যাণে বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখাশোনা করার সুবাদে বাড়তি আয় করতে পারছেন। কখনোবা বাড়িতে নার্স এসে দেখে যাচ্ছেন। আমার এক বন্ধু প্রয়োজনীয় কাজে গিয়েছিল জ্যামাইকার এক এডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টারে।

তার কাছ থেকে জানলাম, সেখানে প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে একেবারেই বিনামূল্যে ডে কেয়ার সার্ভিস দেয়া হচ্ছে। রোজ ভোরে নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী বয়োবৃদ্ধদের গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয় ‘এডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার’ এ। বাড়িতে নিঃসঙ্গ সময় কাটানোর চেয়ে এটিই তাদের জন্যে উত্তম স্থান। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ শিশুসুলভ আচরণ করে থাকে। অতীত স্মৃতি হাতড়ে বেঁচে থাকতে চায়। তারা বারবার সেইসব স্মৃতিচারণ করতে পছন্দ করেন। কখনো কখনো একই বিষয় নিয়ে বার বার বলতে থাকেন। বাড়িতে তাদের সেইসব কথা শুনবার কেউ নেই। এডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টারে যেহেতু সকলেই প্রায় সমবয়সী, নিজেদের মাঝে গল্প করে চমৎকার সময় কাটে। সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিতরা চা, কফি বানিয়ে দেয় চাইলেই। দুপুরে বাংলাদেশি মজাদার খাবারের আয়োজন থাকে। কেউ নামাজের রুমে বসে ইবাদতে মগ্ন থাকতে পারেন। কিংবা ইজি চেয়ারে শুয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন। বিস্মিত হই জেনে যে, সেখানে একটি রুমে তাদের জন্যে বিউটি পার্লারও আছে। মেনিকিওর, পেডিকিওর, ফেসিয়াল কিংবা হেয়ার কালার সহ সব রকম যত্ন আত্তির ব্যবস্থা আছে। সন্ধ্যা ঘনাবার আগে সকলকে গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দেয়া হয়। অনেকগুলো নিঃসঙ্গ মানুষ একসাথে সুখ দুঃখের গল্প করে সারা দিনমান আনন্দমুখর সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরেন। ততক্ষণে পরিবারের অন্য সদস্যরাও একে একে ফিরেন কর্মস্থল, স্কুল, কলেজ থেকে।

ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি, ‘পিতামাতাকে সম্মান করা ইবাদতের অংশ’। আমরা পিতামাতাকে নিয়ে সার্বক্ষণিক পরিবারের সান্নিধ্যে থাকাটাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। আর তাই বিষয়টি অস্বাভাবিক কিংবা অমানবিক মনে হতে পারে। কিন্তু যেহেতু একান্নবর্তী পরিবার দিনে দিনে ছোট হয়ে এসেছে, কিংবা বিলুপ্তপ্রায় এবং প্রবাসে এমনটি দেখা যায় না বললেই চলে, সেইদিক থেকে সেবা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সত্যিই অসাধারণ।
বেঁচে থাকলে সময়ের সাথে সাথে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে একদিন, জানি। আমার চাওয়া-পাওয়া কিংবা আনন্দের প্রতি সহানুভূতিশীল হবার সময় থাকবে না কারো হয়তো। জীবনে যে কোন পরিস্থিতিতে সত্যকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারাটা জরুরি। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বোঝাপড়া’ কবিতার কিছু লাইন মনে পড়ছে,

‘মনেরে আজ কহ যে,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক,
সত্যরে লও সহজে।’

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৯২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.