‘সবুজ বাতাসে যখন শিক্ষা ফোটে’

0

আনন্দময়ী মজুমদার:

১) আমরা চাঁদের আলোয় দেখতাম লোডশেডিং-হওয়া শৈশবে। মায়েরা দোলনায় দুলতেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, আমরা গুটিসুটি বসে তাঁদের সঙ্গে। কেউ কেউ গান করছে। অন্ধকারের সেসব বিপুল রূপ। এখনো আমার সন্ধ্যেবেলায় চোখ ঝলসানো আলো পছন্দ হয় না। মোমবাতির আলো ভালোই চলে। কেউ হয়ত বলে, তোর চোখে প্রবলেম। হ্যাঁ, প্রবলেম আমার স্মৃতিতে খোদাই সেইসব মফস্বলের অন্ধকার ছমছমে চাঁদের আলোর রাতের।

চাঁদের আলোয় রবীন্দ্রনাথ পালকি ছেড়ে হাঁটতে লাগেন। তখনকার দিনে গাড়ির অভাবে পালকি। কিন্তু পালকি চড়ে কে যাবে যখন মর্মরিত মর্ম চাঁদের আলোয় আকুলি বিকুলি করছে? রবীন্দ্রনাথেরও তাহলে প্রব্লেম ছিল!

২) এখনো শৈশবে আমাদের শিশুরা ফিরুক, ফিরে থাক, এই আশায় থাকি। মফস্বলের আদি ভিটেতে এসে তার খেলতে খেলতে ঘাম ঝরে, বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল, ঘুড়ি, লুকোচুরি, কুকুর নিয়ে খুনসুটি, বেড়ালছানার পেছনে আদিখ্যেতা করে সময় কাটে। খাঁ খাঁ রোদের বোশেখ সকালে আমের মুকুল আর অজস্র ভেষজ গন্ধ জড়াজড়ি করে থাকা আমাদের ভিটের আশেপাশে মাধবীমঞ্জরী, দেবদারু, কাঁঠাল, বাগানবিলাস, ঝুমকোলতা, বেলী বা কাঠটগরের ফুললতাপাতা শুঁকে বেড়াই। বাড়িতে ফিরলে মা দেন বেলের পবিত্র শরবত। এ খেলে মানুষ বেশি দিন বাঁচে।

৩) নয় বছরের আমাদের এক মেয়ে তার নিজের হাতে বানানো ছোটো সবুজ এক শ টাকার নোট এগিয়ে দেয়। তার বোনের জন্য কি আমার লজেন্স হবে? হবে। লজেন্স যে খুব প্রয়োজনীয় জিনিস এ কথা কে না জানে? পকেটে ভরে রাখতে হয়। লজেন্স সহ টাকাটা ফেরত দেওয়ায় নয় বছরের মেয়ে একটু ইতস্তত করে বলে, মানসম্মান যাবে না তো?

টাকাটা রাখলেই হতো। শিশু বলে কি ওদের সম্মান নেই?

৪) চলে আসার আগে আরেক মেয়ে এসে তার বন্ধুকে চন্দ্রমল্লিকার ছবি দিয়ে দুঃখী পাখির মতো মুখ করে ইস্কুল চলে যায়। দেখা হবে না অনেকদিন। সেখানে লেখা দৃপ্র-কে …। দীপ্র নামটা আগে অনেকের মুখে মুখে ছিল দীপ্য অথবা দীপ্লো। নতুন আকার পাওয়ায় আরো এক চলতি ডাক পাওয়া যায়।

৫) ছেলে নিজে তিনটে বেড়াল বাচ্চার পেছনে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছে। লাল ছানাটা বন্ধুরা সকলেই পোষ্য নেবে। কারণ? সে সব চেয়ে শান্ত। আমি বললাম, আসলে, আলসে। ছেলে হেসে বলল, অলসই তার পছন্দ। কালোটা দুরন্ত আর মায়ের পেটের কাছে দুধ খাবার সময় সে অন্যদের হারিয়ে দেয়। লালটা কালোটা আর শাদা-কালোটা একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে টবের মাটিতে শুয়ে শুয়ে জটলা বাঁধায়, দুপুর কাটায়, হাই তোলে। তারপর দেখি এইসব নিরীহ প্রাণী এক অপূর্ব পাখিকে এক থাবায় ঘায়েল করে দিব্য মিউমিউ করতে লেগেছে যেন বল খেলে বাড়ি এলো।

৬) ছেলের আরেক বন্ধু প্রাণী ভালোবাসে বলে অন্যের ঘরের কুকুর ছেড়ে দেয় এবং সে কুকুর মালিকের কাছে বেওয়ারিশ হয়ে পাড়া দাপিয়ে খুশিতে নাচতে থাকে, মিস্ত্রির ব্রাশ চুরি করে এনে লেজ নাড়ায়। বন্ধু দলের অন্যরা ভয়ে থাকে পাছে জানাজানি হয়ে বকা খেতে হয়। আমি জিগ্যেস করি, ছাড়লে কেন? সে উত্তর দেয়, ওর বাঁধা থাকতে ভালো লাগে না। তাই ছেড়ে দিসি।

গর্বের বিদ্রোহ।

এদিকে আমাদের পাড়াতুতো অটো ড্রাইভার আমাদের পলিথিন কাগজের ঘুড়ি বানিয়ে দেন, শোলার কাঠি দিয়ে। আর প্লাস্টিকের শিশির গায়ে সুতো জড়িয়ে বানান লাটাই। নয় বছরের ছোটো মেয়ে দেড় বছরের বুনুর হাত ধরে সিরিয়াস গলায় বলে, এসব আমার জন্য না। আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি।

ছেলে রাতে মায়ের হাত ধরে বলে, মা আমি বেড়ালছানা ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই না।

কেন, শুনি?

তোমার কাছ থেকে আমাকে নিয়ে চলে গেলে তোমার কেমন লাগতো?

হুম বুঝলাম। সবুজ বাতাসে শিক্ষা ফোটে। আম পাকার মতো সুগন্ধ সে শিক্ষার।

এই সব আপাত বোধোদয় বিভা আমাদের মাবেলার ডায়েরিতে লিখে রাখি।

২০১৯ ০৪ ২৭

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১১৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.