‘নিকেতন’ এক জীবন জয়ের গল্প

0

তানবীরা হোসেন:

উনিশো তিরানব্বই সালে অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর, ছাব্বিশ বছরের ঝকঝকে এক ডাচ তরুণী, পনের মাস সাইকেল চালিয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে নেদারল্যান্ডসে এসে পৌঁছে। পথিমধ্যে ‘বাংলাদেশ’, প্রথম দর্শনেই প্রেম, বাংলাদেশের প্রকৃতির সাথে, বাংলাদেশের মানুষের সাথে। নাম না জানা এক শান্ত নদীর তীরে, সাইদ নামে এক প্রতিবন্ধী শিশুর সাথে তার দেখা হয়, সে কথা দিয়েছিলো সাইদ এর কাছে সে আবার ফিরে আসবে।

নেদারল্যান্ডসে ফিরে এসে কিছু টাকা যোগাড় করে, তারপর ফিরে যায় সাইদসহ আরও অনেক প্রতিবন্ধী শিশুদের কাছে, যাদের শিক্ষা দরকার, যত্ন দরকার, দরকার ভালবাসার। তার পরের তিন বছর অনেক ঝঞ্ঝার, ঝড়ের, কিন্তু গড়ে ওঠে এক আশ্রয়কেন্দ্র। প্রত্যন্ত গ্রামে এদের নিয়ে কাজ করতে করতে হয়ে যায় এদেরই একজন। স্থানীয় শিশুদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন অতি আদরের ‘খালাম্মা’।

গল্পটি খুব সাধারণ লাগছে তো পড়তে? এরকম তো অনেকই হয়, গল্প করার মতো এটির বিশেষত্ব কী? না, বিশেষত্ব কিছু না থাকলেও অন্যরকম মানবতার খোঁজ পেতে পারেন, যা নিজেকে অতিক্রম করে এসেছে।

নামহীন, বিশেষত্বহীন গরমের কোন এক সন্ধ্যায় ‘খালাম্মা’ ভীড় বাজারে অন্যান্যদের সাথে বসে ‘কোকাকোলা’ খাচ্ছিলেন। ছোটবেলায় মা হারানো মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবক যার অজানা কোন কারণে ‘খালাম্মা’র ওপর হয়তো রাগ ছিলো, ধারালো ছুরি দিয়ে “খালাম্মা”র ঘাড়ে তিন তিন বার আঘাত করে। ৩০ বছর বয়সী ডাচ তরুণী’র নিচের অংশ সম্পূর্ণরূপে বোধহীন হয়ে পড়ে। তাকে নেদারল্যান্ডসে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়, পুনবার্সন কেন্দ্রে রাখা হয়। গল্পটি হয়তো এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু না এই গল্পটি তো জীবনকে জয় করার গল্প, কী করে এখানে এটি থেমে যেতে পারে?

পাইনআকারের তরুণী এন্টনিয়েটে টেরমোসহাউজেন আবার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ায়, পুরোপুরি না হলেও দাঁড়ায়। ক্র্যাচে ভর করে ফিরে আসে বাংলাদেশে, শেষ করে তার প্রকল্প। ছাব্বিশ বছর পর আজ তার প্রকল্প ‘নিকেতন’ যার সমার্থক বাংলা শব্দ ‘ঘর’ পাঁচ হাজার শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুর দেখাশোনা করে।

বাংলাদেশ সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে যৌথ উদ্যোগে “মানসিক প্রতিবন্ধী” শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম বিকাশ ও উন্নয়নের কাজ করে যাচ্ছেন। এন্টনিয়েটে তার এই শরীর নিয়ে বছরে তিনবার বাংলাদেশে যান, দুইমাস করে থাকেন, নিজে ব্যক্তিগতভাবে তার পরিচিতদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করেন নিকেতনকে চালিয়ে নেবার জন্যে।

একজন স্বর্ণকেশি ভিনদেশি তরুণী বলতে গেলে নিজের পুরো জীবনটাই দান করে দিয়েছেন ‘বাংলাদেশের মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী’ শিশুদের উন্নয়নের জন্যে, তাদের বিকাশের জন্যে, টিকে থাকার জন্যে।

আমি আপনি কি পারি না তার এই চলার পথে সাথী হতে? অনেক বেশি কি দরকার তার জন্যে? অনেকগুলো হাত খুব সামান্য করে সামনে বাড়ালেও তো বাচ্চাগুলোর জীবনে কিছুটা নিশ্চিত হয়। অনাত্মীয় ওরা আমাদের বটেই, তাই বলে কি আমাদের কোন দায়িত্ব নেই? কিছুই হয় না বুঝি ওরা আমাদের!

নিকেতন সম্বন্ধে আরও জানতে চাইলে নিচের লিংকটি দেখতে পারেন …

https://www.niketan.nl/en/?fbclid=IwAR1S5JhmcINo60jnyoEoB1oyEb5Lb7htFi5AXoelVZHiecb8ja7JRxsfTks

শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares

লেখাটি ৩০২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.