পরকালে বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর আমাদের অসহিষ্ণুতা

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

সাফা কবির নামে একজন অভিনেত্রী বলেছেন যে তিনি নাকি পরকালে বিশ্বাস করেন না। বেশ কথা। তাঁর ইচ্ছা তিনি পরকালে বিশ্বাস করেন কী করেন না বা কেন করেন বা কেন করেন না। তাতে আপনারই বা কী আর আমারই বা কী? এইজন্যে তাঁকে যারা গালিগালাজ করছেন, এরা কারা? অশ্লীল সব গালিগালাজ আর সে যে কীসব হুমকি! আমি এইসব কথা টাইপ করে আপনাদের সামনে উল্লেখ তো করতেই পারবো না, এমনকি একান্ত বন্ধুদের সাথে বসেও উচ্চারণ করতে পারবো না।

অভিনেত্রী সাফা কবির

আমি ভেবেছিলাম এইটা নিয়ে ফেসবুকে কোন উচ্চবাচ্য করবো না। কেননা এখন যদি একদল লোক সাফার পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়, তাইলে ও গালাগালিওয়ালাদের গালি ও হুমকির মাত্রাও বেড়ে যাবে। কী দরকার! বেচারা সেলিব্রিটি মানুষ, অভিনেত্রী, ওর পক্ষে লোকজনকে খেপিয়ে দেওয়াটা কোন কাজের কথা হবে না আরকি! তিনি হয়তো পুলিশের সাহায্য নিয়ে গালাগালিওয়ালাদের নেতাদের দুই একজনকে ধরে প্রাইভেট লেভেলেই ব্যাপারটা সামলে ফেলবেন, অথবা প্রথম আলো যা করেছিল, কোন ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে তওবা ফওবা করে বিবাদ শেষ করে দিবেন।

কিন্তু বিষয়টা নিয়ে বলা দরকার। শুধু এই অভিনেত্রীর কথা নয়, সাধারণভাবে আমাদের এখানে যে অসহিষ্ণুতা বেড়েছে, সংখ্যাগুরু লোকজন কথায় কথায় মর্মাহত হয়ে লোকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, কেবলমাত্র মতামত প্রকাশের জন্যে লোকজনকে এইভাবে হেনস্তা করতে থাকেন, এটা নিয়ে কথা বলা দরকার। কেননা যে দেশ কথায় কথায় মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করে সেটি তো কোন সভ্য দেশ হতে পারে না। সভ্যতা ও সভ্যতার বিকাশের পূর্বশর্তই হচ্ছে যে একদল মানুষ প্রচলিত জ্ঞান, প্রচলিত বিশ্বাস ও প্রচলিত প্রথা প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন করবে, ওদের যার যার মতামত প্রকাশ করবে। রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে এইসব মানুষের কণ্ঠ যাতে কেউ রুদ্ধ করতে না পারে সেটা দেখা।

আমাদের এখানে তো কণ্ঠ রুদ্ধ হচ্ছেই। লেখকরা দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচছেন। যারা পালাতে পারেননি, তারা হয় চুপ করে থাকছেন অথবা উগ্রবাদীদের হাতে প্রাণ দিচ্ছেন। এটা কেবল যে ধার্মিক লোকদের হাতে নিধার্মিক লোকদের হেনস্তা হওয়ার ব্যাপার সে তো কেবল নয়। আওয়ামী লীগের লোকজনও এইরকম আচরণ করেন, ওদের সরকার ওদের নেতা বা ওদের নীতির সমালোচনা করলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এগুলি ঘটনা তো আপানরা দেখছেনই বছরের পর বছর ধরে। উদাহরণ দেওয়ার তো কিছু নাই।

নীতিটা কী? সরকারের করণীয় কী? আমাদের সরকার কী করছে? এইরকম অসহিষ্ণুতা কেন হচ্ছে আমাদের এখানে? আমরা কী করবো?

নীতিটা হচ্ছে যে একজন নাগরিক তার যা ইচ্ছা তাই বলতে পারবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে অপরের ক্ষতি করছে। এইটাই চিন্তা ও কথা বলার স্বাধীনতা। এইটাই মোটামুটি সকল সভ্য দেশেই অনুসরণ করা হয়। সাফা কবিরের ঘটনাটাই উদাহরণ হিসাবে নিতে পারেন। তিনি যদি মনে করেন যে পরকাল বলে কিছু নাই সেটা তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা আর সেটা যদি তিনি লিখে বা বলে প্রকাশ করতে চান বা অন্যকে জানাতে চান সেটা হচ্ছে ওর বাক স্বাধীনতা। আপনারও স্বাধীনতা আছে সেই কথাটিকে সমালোচনা করার, নিন্দা করার বা সেটা নিয়ে হাস্যরস করার। সে আপনার স্বাধীনতা।

ইমতিয়াজ মাহমুদ

কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আপনি যখনই তাঁকে গালি দিচ্ছেন বা হুমকি দিচ্ছেন তখনই আপনি আপনার স্বাধীনতার সীমানা পার হয়ে যাচ্ছেন। আপনি যা ইচ্ছা তাই বলতে পারেন কিন্তু অন্যের ক্ষতি করে নয়। যখনই আপনি তার মানহানি করছেন বা শারীরিক ক্ষতির হুমকি দিচ্ছেন, সেটা তো অন্যের ক্ষতি হয়ে গেল।

এনালজি হচ্ছে যে আপনি ইচ্ছামতো মুষ্ঠি ঘুরাতে পারেন, কিন্তু আপনার সেই স্বাধীনতা সেখানেই শেষ হয়ে যাবে যেখানে আমার নাকের শুরু। আপনি যেখানে খুশি সেখানে ঘুরে বেড়াতে পারেন, আপনার ফ্রিডম অব মুভমেন্ট চর্চা করেন, কিন্তু যেখানে আমার দরোজা শুরু সেখানেই আপনার ফ্রিডম অব মুভমেন্ট শেষ।

এইটা হচ্ছে না। কেন? একদল লোক কথায় কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। মেরে ফেলবো কী ফেলবো। তাইলে সরকারের করণীয় কী এইসব ক্ষেত্রে? আমাদের সরকার কি তাঁর করণীয় কাজটা করছে? সরকারের প্রথম কাজটা তো হচ্ছে পীড়িতকে রক্ষা করা। সাফা কবিরকে যারা হুমকি দিচ্ছে ওদেরকে নিবৃত করা, প্রয়োজনে প্রচলিত আইনে শাস্তির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এটা তো সরকার করছেই না। দেখা যাচ্ছে যে সরকার পীড়িতকে রক্ষা তো করেই না, উল্টা সরকারই মানুষকে তাদের মতামতের জন্যে পীড়ন করে।

সরকারের আরেকটা কাজ আছে। সেটা দীর্ঘমেয়াদী এবং বেশী গুরুত্বপূর্ণ। সেটা কী? সেটা হচ্ছে বাচ্চাদের স্কুল কলেজে সহিষ্ণুতা শেখানো, মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান ও ভালোবাসা শেখানো। এইটা যদি সরকার না করে তাইলে অসহিষ্ণুতা দেশ থেকে যাবে না, আমরা একটা সভ্য সমাজ গঠন করতে পারবো না এবং পর্যায়ক্রমে আমরা একটা পশ্চাৎপদ অনগ্রসর জঙ্গি সমাজে পরিণত হবো। এইটাতেও সরকার পুরা উল্টা কাজ করছেন। শিশু কিশোরদেরকে অসহিষ্ণুতা শিখাচ্ছেন।

কীভাবে? আমাদের স্কুলের ধর্মীয় অ নৈতিক শিক্ষার বইগুলি খুলে দেখেন। এইসব বইতে বাচ্চাদেরকে শেখানো হয় যে কেবল মাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে একজন মুসলমান সকল অমুসলমানের চেয়ে উত্তম।

এটা তো ঠিক কথা না আরকি। কেবল মাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে আমি আপনার চেয়ে উত্তম হয়ে যাব? বা কেবলমাত্র গায়ের রঙের কারণে একজন আরেকজনের চেয়ে উত্তম হয়ে যাবে? মুসলমানের বাচ্চা হলেই হিন্দুর বা খৃস্টানের বাচ্চার চেয়ে মানুষ হিসাবে ভালো? কেবল মাত্র ধর্ম বিশ্বাসের কারণে আপনি মাদার তেরেসাকে একজন মুসলিম গুণ্ডার চেয়ে উত্তম বলবেন? সেটা তো হয় না। আর যার যার ধর্ম তার তার কাছে প্রিয়, যার যেটা ইচ্ছা অনুসরণ করুক। যাদের ইচ্ছা হয় না ওরা করবে না। এটা বলার কারণেই তো আর মানুষ ভালো মন্দ হয় না।

সরকারের তো এইটা শিখানো দরকার ছিল ইশকুলে, কলেজে। যে না ভাই, একজন লোক হিন্দু মানেই সে মন্দ হয়ে গেল না। একজন মানুষ তোমার ধর্ম নাও মানতে পারে, তার মানেই এই না যে সে চুরি ডাকাতি ধর্ষণ হাইজ্যাক রাহাজানি করে। আমাদের সরকার ইশকুলে ঠিক উল্টাটা শিখাচ্ছে- ইসলামে যারা বিশ্বাস করে না, ওরা চোর ডাকাত হাইজ্যাকার।

এইসব বুনিয়াদি শিক্ষা যদি বাচ্চাদেরকে শিখানো হয়, তাইলে কিন্তু এইসব সহিংসতা কমে যায়। অসহিষ্ণুতা কমে যায়। মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান শ্রদ্ধা এইসব বেড়ে যায়। এইগুলি শিখাবেন না, উল্টা ঘৃণা ও মুসলিম সুপ্রিমেসি শিখায়ে থাকবেন, তাইলে তো এই অবস্থা হবেই দেশে।

দেখেন, আমি কিন্তু হুজুরদের ওয়াজও বন্ধ করার পক্ষে না। কেউ যদি অন্যদেরকে হুমকি দেয়, মেরে ফেলবো কেটে ফেলবো বলে বা গালাগালি করতে থাকে, সেটা আলাদা কথা। যেমন নাস্তিক হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে গেছে, এসব কথা বলা তো ফৌজদারি অপরাধ। মানে হচ্ছে অন্যের অধিকার যতক্ষণ খর্ব না করে যে কোন হুজুরের অধিকার আছে যা ইচ্ছা তাই বলা। সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করবে কেন? সরকার ওয়াজকারিকে রক্ষা করবে, আবার একই সাথে ঐ ওয়াজকারিকে যারা সমালোচনা করবে তাঁদেরকেও রক্ষা করবে। নাইলে এটা কীসের গণতন্ত্র, আর কীসের সভ্য সমাজ?

সমস্যাটা ঐখানেই। সরকার নিজেই বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে না। সরকার নিজেই স্কুলে ঘৃণার চাষ করছে। তাইলে আপনি কী করবেন?

শেয়ার করুন:
  • 46
  •  
  •  
  •  
  •  
    46
    Shares

লেখাটি ৫৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.