নুসরাত আর একজন আমি

0

রিফাত মাহবুব:

২০০০-০১ সালের কথা। আব্বা তখন ফেনীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার মুজিবনগর কলেজের প্রধান অধ্যক্ষ। নুসরাতের সোনাগাজী থেকে খুব দূরে নয় কোম্পানীগঞ্জ। আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটি’তে ইংরেজি বিভাগের ছাত্রি। ফেমিনিজম, জেন্ডার ইকুয়ালিটি — যে বিষয়গুলা আজকের বাংলাদেশে বেশ সাধারণ বিষয়–তখন মাত্র পড়তে আর বুঝতে শিখেছি। আমাদের সমাজের নিয়মগুলো যেগুলো একটি ছেলেকে ছেলে আর একটি মেয়েকে মেয়ে হতে শেখায় খুব বেশি করে চোখে পরছিল তখন।

লেখক: রিফাত মাহবুব

এরই মাঝে একবার পরীক্ষা শেষে তিনদিনের জন্য আব্বার সাথে কোম্পানীগঞ্জ বেড়াতে গেলাম। আমরা তখন ঢাকায় থাকতাম –আব্বা একাই ঢাকা-কোম্পানীগঞ্জ যাতায়াত করতেন। আমি যাওয়াতে স্বভাবতই ‘প্রিন্সিপাল স্যার এর মেয়ে ঢাকা থেকে এসেছে’ একটা সাজ সাজ রব উঠেছিল কলেজের সম্মানিত শিক্ষক আর ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে। সারাদিন ছোট ছোট দলে কলেজের মেয়েরা এসেছিল আমার সাথে দেখা করতে।
তাদের অনেকের অনেক প্রশ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে — কিভাবে ভর্তি হওয়া হয়, ভর্তি পরীক্ষায় কেমন প্রশ্ন আসে ইত্যাদি। সবার সাথে আলাপ হলেও দুঃখজনকভাবে আমি কোনো মেয়ের মুখ দেখতে পাইনি। আমি একজন মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের মুখঢাকা বোরখা আর নেকাবে এতোই অভ্যস্ত ছিল যে তারা মুখ ঢেকেই আমার সাথে কথা বলেছিলো, আর আমিও তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কাউকে নেকাব সরাতে বলিনি। তখনও ঢাকা শহরে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব আর বোরখা পরা মেয়ের সংখ্যা সীমিতই ছিল।

ইসলাম তখন আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের একটা অংশ হলেও, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েনি। কাজেই আমি কোম্পানীগঞ্জের সব মেয়েদের বোরখা আর নেকাব পরিহিত বেশ দেখে হকচকিয়ে গিয়েছিলাম; ভাবতে লাগলাম, কোন নিয়মের বলে আর কার নির্দেশে সবাই বোরখা পরছে? যদিও ওই অল্প সময়ে এইসব উত্তর জানার কোন উপায় ছিল না।

নোয়াখালী-ফেনীতে তখন জয়নাল হাজারীর দাপট। ইলেক্শনও তখন কাছাকাছি থাকায় সব বাসাতেই রাজনীতির আলোচনা হচ্ছিলো। লোকমুখে টুকরো টুকরো কথায় বুঝেছিলাম হাজারী-বাহিনী ওই জনপদে একধরনের ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছিল।

আমি ঐসব টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনদিন পর ঢাকা ফিরে এসে হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম; মনে হচ্ছিলো, ‘যাক বাবা, আমার চেনা শহরে এসে পৌঁছালাম!’ কোম্পানীগঞ্জের মানুষের আতিথেয়তা, ভালোবাসা আমাকে সিক্ত করেছিল, কিন্তু সেখানকার মেয়েদের পোশাক-বন্দি জীবন আমাকে বিচলিত করেছিল। আমার নিজের সালোয়ার কামিজ পরা সত্ত্বাটাকে বড় বেশি ‘বেল্লালা’ মনে হচ্ছিলো ওদের সামনে।

নুসরাতের ভয়াল হত্যার খবর পড়ার পর থেকে বহুদিন আগের ম্লান হয়ে যাওয়া স্মৃতির টুকরোগুলো ফিরে ফিরে আসছে। নুসরাত ছিল সোনাগাজীর মাদ্রাসার ছাত্রী —আমার থেকে অনেক আলাদা। কিন্তু নুসরাত অনেক সাহসী — আমার মতো সে পালিয়ে হাফ ছাড়তে চায়নি। নুসরাত তার সমাজে থেকে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে চেয়েছিলো।

আমরা হয়তো নুসরাতকে বাঁচাতে পারতাম যদি অনেক আগেই আমাদের চোখের সামনে দ্রুত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়া সমাজের হাল ধরতাম –যদি ভাবতাম ‘আমি একা বাচঁলেই সমাজ বাঁচে না; সমাজকে বাঁচাতে হলে অনেক সাহসী প্রশ্ন করতে হয়, জোড়ালোভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়।’ নুসরাত আমাদের উদাসীনতা আর আত্মতুষ্টি’র শিকার। আমরা নুসরাতদের হারতে বাধ্য করছি।

রিফাত মাহবুব
লন্ডন, ইউকে

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 127
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    127
    Shares

লেখাটি ৪৯৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.