ব্যান্ডেজে মোড়া দেশে রুখে দাঁড়াবার এইতো সময়

0

শামীমা জামান:

নুসরাত চলে গেলো। যেন ওর মৃত্যু সংবাদে সব আমরা আকাশ থেকে পড়লাম। ৮০শতাংশ পুড়ে যাওয়া শরীরে,পুড়ে যাওয়া ফুস্ফুসে ও যেন বাচতো। আর ওইভাবে বাঁচলেও পোড়া দেশে কি বাঁচা যেন সে বাচতো। তবু আমরা ভাবতে পারিনা এই চলে যাওয়া। যদিও ওরা অবলীলায় কেরোসিন ,পেট্রোল ঢেলে মৃত্যু চাইতে পারে মানুষের।ওরা কারা ?

ওরা কারা এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া চার বোরকা, হাত মোজা, নেকাবের দুই একজনের নাম ডায়িং ডিক্লেয়ারেশন এ বলে গেছে নুসরাত। শম্পা নামের একজনকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ।

এমন ঘটনা আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। সমাজের পরিবারের নারী চরিত্ররাই এই পুরুষতন্ত্রের ঝাণ্ডা ধরে পুরুষের সাথ দিয়ে যায়। সেখানে কেউ সত্য উচ্চারণ করেছে তো মরেছে। প্রতিবাদী হয়েছে তো লক্ষ্মীমন্ত মেয়ের তকমা ছুটে গিয়ে খারাপ মেয়ের তকমা লাগতে সময় লাগেনি। এই সমাজ দাড়ি টুপিওয়ালাদের বদনাম শুনতে চায় না। তারা যেন সব অন্যায়ের ঊর্দ্ধে বাস করেন। তাদের দিকে তর্জনি তোলা মেয়েদের রেহাই দেয় না বেকুব সমাজ।

অভিযুক্ত ধর্ষক অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা জামাতের রুকন ছিল। ২৭ মার্চ তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে রক্ষা করতে তার মুক্তির দাবিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ইন্ধনে গত ২৮ মার্চ ফেনীর সোনাগাজীতে মিছিল বের করা হয়েছিল। তাকে বাঁচানোর জন্য কাউন্সিলর মাক্সুদুল আলম নেপথ্যে কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এই অধ্যক্ষ্যের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আগেও ছিল। ছিল অর্থ আত্মসাৎ এর মামলা। এইরকম একটি অপরাধী জানোয়ার ১৬ বছর ধরে কী করে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর প্রধান পদে থাকেন সে এক রহস্য।

এই লেখা লিখতে লিখতে একটি ভিডিও চোখে পড়লো। জীবিত নুসরাত অভিযোগ করছে দুটি পুরুষাঙ্গের কাছে। নুসরাত এর কান্নার মাঝে তারা বারংবার ধমকে ধমকে ওঠে। তার বর্ণনা থামিয়ে একশো বার অহেতুক প্রশ্ন করে তোমাকে প্রিন্সিপ্যাল ডেকে নিছে না তুমি নিজে গেছ? এর উত্তরে সে পিয়নকে দিয়ে ডেকে নিয়েছে তাকে বলার পরও পুরুষদণ্ড ধমকে আবার বলে, তোমাকে ডেকে নিছে না নিজে গেছ? সব কথা শোনার পর পুরুষদণ্ড বলে, কিচ্ছু হয়নি। তোমার কথা কেউ লিখবে না। এমন কিছু হয়নি যে তোমাকে এখনি কানতে হবে। এডা কিছু না।

বাহ! এডা কিছু না। তোদের কাছে এডা কিছু নারে ইতর পুরুষ। মেয়েটির কান্নার মধ্যেও তোরা মজা নিস, বুকে হাত দিসে নাকি জিজ্ঞেস করিস। অই জিজ্ঞেস করার মাঝেও মজা খুঁজিস হারামজাদারা। কারণ নিভৃতে পেলে তুইও হয়ে যাবি নির্ঘাৎ ধর্ষক।

আগুন লাগার ঘটনা না ঘটলে নুসরাত এর ঘটনাটা আসলে কিছুই না। যেমন করে আরো সব নারীর যৌন হয়রানি কিছুই না এই সমাজে। প্রিয়তী, সীমন্তি, লাইজুরা খ্যাতি পাওয়ার জন্য এসব মিটু করেছিলো। এই মিটু কেউ পছন্দ করেনি। প্রগতির মুখোশপরা নারীবাদী পুরুষেরা পর্যন্ত। অথচ আজ এই মিটুই নুসরাতের প্রাণ নিয়ে গেল। মিটু দিয়েই নুসরাত বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়ে গেলো। নাহ, মিটু মুভমেন্ট বোঝার মতো লেখাপড়া জ্ঞান নুসরাতের মতো মাদ্রাসা ছাত্রীর ছিলো না। থাকার কথাও নয়। তবু সে ইতিহাসের সবচেয়ে সাড়া জাগানো মিটু করে গেলো নিজের জীবন দিয়ে। এরপর বাকি নুসরাতরা কী করবে? না বুঝেই শয়তানের মানব বন্ধনে, ক্ষমতার মিছিলে পা বাড়াবে। শিখিয়ে দেয়া বুলি আওড়াবে ভয়ে? এভাবে ভুলের মাঝে বড় হয়ে তারা যৌনদাসীতে রুপান্তরিত হবে?

এখনো বাকি পাঁচ আসামী গ্রেফতার হয়নি। যদিও নুসরাত এর ঘটনা প্রধানমন্ত্রী নজরে এনেছেন। এ নিয়ে তিনি প্রতি মুহুর্তে বক্তব্য দিয়েছেন, খোঁজ নিয়েছেন ডাক্তারদের কাছে। নিয়মিত ধর্ষণ আর নারী নিপীড়নের দেশে প্রধানমন্ত্রীর এই ভূমিকা আশাব্যঞ্জক। যা আগের ঘটনাগুলোতে আমরা দেখতে পাইনি। একথা সত্যি পুরুষের কুকুর দণ্ডের খামখেয়ালিপনার দায়ভার প্রধানমন্ত্রীর দিকে দিতে হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী কি তাদের নিজস্ব অস্ত্রচালনার নির্দেশও দিয়ে থাকেন নাকি যে কিছু মানুষ সর্বদা তাকেই দোষারোপ করে যান!

কিন্তু বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে পুরুষ যখন বেপরোয়া তার অপরাধে, একের পর এক সাংঘাতিক ঘটনাগুলোর আসামীরা দুদিন পরই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারো অপরাধে লিপ্ত হয়, তখন আমরা আমাদের রাষ্ট্রকে ক্ষমা করতে পারি না। এই যে দু বছর আগে এতো এতো ধর্ষণ নিয়ে যে লিখলাম সকলে, কোথায় আজ সেই বনানীর ধর্ষক সিফাত? দিব্যি জামিনে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তনুর হত্যাকারীরা কোথায়? সেইতো নুসরাত আজ আমাদের হৃৎপিণ্ড নাড়া দিলেও কাল সব সয়ে যাবে আমাদের। আমরা লাল সাদা শাড়িতে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবো। পান্তা খেয়ে আদিখ্যেতা করবো। সারাজীবন কেঁদে বেড়াবে নুসরাতের মা। আমাদের কী! এই রকম পৈশাচিক ভাবনা বোধ হয় আর ভাবার সময় নেই। নুসরাতের মাও যেমন কদিন আগে ভাবেননি। তেমনি মেয়েশিশুর মায়েরা কী ছেলে শিশুর মায়েরা কেউই যৌন হয়রানির মহামারিমুক্ত নন। রুখে দাঁড়াবার এখনই সময়।

শেয়ার করুন:
  • 134
  •  
  •  
  •  
  •  
    134
    Shares

লেখাটি ১৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.