মধ্যযুগীয় অন্ধকার পথে হাঁটছে দেশ

0

মাকসুদা আকতার প্রিয়তী:

ধরুন শেখ হাসিনার পিতা এবং খালেদা জিয়ার স্বামী ছাড়া, শুধুমাত্র নিজের যোগ্যতায় তৃণমূল থেকে দেশের প্রধান হলেন। যেহেতু উনাদের পিছনে গাছের বড় ঢাল হিসেবে কেউ নেই, সুতরাং কোন ধরনের যৌন হয়রানি ছাড়াই বাংলাদেশের মতো পুরুষতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং দেশের প্রধান হলেন। ভাবা যায়? কী ভাবতে পারেন? একজন সাধারণ মানুষ কি ঐ পদ কল্পনাও করতে পারবে? প্রশ্নটা না হয় আপনাদের দিকেই ছুঁড়ে মারলাম।

কাঠের চশমা পড়ে তো বলাই যায় বাংলাদেশের অনেক উন্নতি হচ্ছে, আর আমি খালি চোখে দেখি দিনকে দিন এই দেশ মধ্যযুগীয় অন্ধকার যুগে উল্টা পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। যেই দেশকে মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্তানের নোংরা মৌলবাদী শাসন থেকে মুক্তি করেছিল, সেই দেশ তাদেরই অনুসারীদের দেয়া পথে হেঁটে যাচ্ছে এবং তাদের লালন-পালন করা হচ্ছে।

মাকসুদা আকতার প্রিয়তী

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি, ফ্লাইং ট্রেইনিং সাধারণত শুরু হয় ছেসনা ১৫০-১৫২ দিয়ে, যার দুটি সিট, একদম আমাদের রিকশা মতো। অর্থাৎ একজনের গায়ের সাথে আরেকজনের গা লাগবেই। তো আমাদের মক টেস্টের সময় যেটা নিয়ম যে, একজন স্টুডেন্ট পাইলট যেই ইন্সট্রাক্টর এর আন্ডার এ থাকে তাকে বাদ দিয়ে অন্য যেকোনো ইন্সট্রাক্টর এর সাথে মক ফ্লাইট টেস্ট দিতে হয় যার সাথে ঐ স্টুডেন্ট কখনো ফ্লাই করেনি। অর্থাৎ আপনাকে আপনার কমফোর্ট জোন থেকে বের করে আনা। সুতরাং আমি আর আরেকজন ইন্সট্রাক্টর এর সাথে ফ্লাই করা শুরু করলাম। আমার কাছে তখন ফ্লাই করার প্রতিটা মিনিট অনেক দামী। একজন পাইলটের সর্বোচ্চ মনোযোগ টেক-অফ আর ল্যান্ডিং এর সময় দিতে হয়, আমার যেহেতু মক টেস্ট, সুতরাং আমার মাথায় কোন ধরনের ভুল ছাড়া টেক-অফ ব্যতীত কিছুই নেই।
আমি আমাদের স্থানীয় টেক-অফ প্রসিডিউর মেইন্টেইন করে বিমান লেভেল-অফ করার পরপরই লক্ষ্য করলাম আমার ইন্সট্রাক্টরের ইরেকশন হয়েছে, অর্থাৎ তার পুরুষাঙ্গ শক্ত হয়ে গিয়েছে, এবং তিনি তা চাপ দিয়ে ধরে আছেন। আমি বিষয়টি খেয়াল করার সাথে সাথে, তখন থেকে যে তিনি দুঃখিত বলা শুরু করলেন, সেই দুঃখিত বলা শেষ হয়েছে কোথায় একটু পর বলছি।

আমাকে শুধু বললেন, তুমি তোমার ফ্লাইট প্ল্যান অনুযায়ী ফ্লাই করো। জানেন, এই হঠাৎ অবাঞ্ছিত ঘটনায় আমি কিছুটা বিচলিত হলেও মোটেও ডিস্টারবড হইনি, কারণ আমি জানি আমি নিরাপদ, আমার কিছুই হবে না, তবে আমার মনে একটাই আশঙ্কা হচ্ছিল যে, আমার মক টেস্ট ঠিকমতো না হলে আমি মূল ফ্লাইট টেস্টের জন্য তৈরি হবো কিনা? আমি আর বিস্তারিত গেলাম না, আমরা ল্যান্ড করলাম। তিনি আমাকে শেষবারের মতো আন্তরিকভাবে সরি বলে চলে গেলেন। আমি নিজ জীবনের সাথে কিছু ক্যাল্কুলেশন করে চুপচাপ কাউকে কিছু না বলেই চলে এলাম।

দুদিন পর গিয়ে শুনলাম, সেই ইন্সট্রাক্টর চাকুরি ছেড়ে চলে গিয়েছেন এবং যাওয়ার আগে তিনি মক টেস্টের ফি’টা নিজের পকেট থেকে ফেরত দিয়ে গেলেন। সবাই উনার হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেয়াটা অবাক হচ্ছিলেন, যেহেতু উনার প্রাইভেট লাইফে কিছু অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। উনি আমাকে উলটো ফেল না করিয়ে, আমার উপর পাল্টা দোষারোপ না করে, উনি উনার ভুল মেনে, মাথা নত করে চলে গেলেন। উনার সরি বলা শেষ করলেন। আর আমি আজ প্রথমবারের মতো এই ঘটনা শেয়ার করলাম।

এই যে এক লম্বা কাহিনী আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম, তার কারণ হয়তো আপনারা বুদ্ধিমানেরা বুঝে গিয়েছেন। একজন পুরুষের কামনাগত বাসনা জাগা স্বাভাবিক, কিন্তু যখন সে তা নিজের আয়ত্তে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তখন সে হয়ে উঠে মানুষ। আর এই মানুষ হয়ে উঠার কোন সীমা নেই, মাপার জন্য নেই কোন ব্যারোমিটার। দিনকে দিন মানুষ নিজেকে গড়ে উঠায়, ভাঙ্গে, আবার ডেভেলপ করে তার পারিবারিক, সামাজিক শিক্ষা এবং তার পারিপার্শিক সামাজিক অবস্থান ও কাঠামো দিয়ে যা রাষ্ট্র এর ভূমিকাই প্রধান। রাষ্ট্র বলতে রাষ্ট্রের প্রধানরা, যারা নীতি নির্ধারক এবং তার মূল চাবি কাঠি।

এইবার একটু দেশের দিকে ফিরে তাকাই, তনু, রিশা, আয়েশা, দুই বছরের বাচ্চাদের ধর্ষণ করে হত্যাকাণ্ডের পর পরবর্তী যেই সব নাটক আমি/আমরা দেখেছি, তাতে স্পষ্টতই হয় দেশ এখন বর্বরদের হাতে এবং দেশের অধিকাংশ নেতারা, মূল হোতারা তাতে মহা আনন্দে আরও বর্বর প্রডিউস করে যাচ্ছে।
এখন এই দোষ কি স্বাধীন দেশের ঐ জনগণের, ঐ জাতির?

আমি বলবো, না।
আমি বলবো, খুব ঠাণ্ডা মাথায় দেশের সাধারণ জনগণকে দিন দিন ঠেলে দিচ্ছে অসভ্য, বর্বর ও মধ্যযুগের সেই অন্ধকার রাস্তায় রাষ্ট্রের শোষণকারী, ক্ষমতাধারী ও প্রভাবশালীরা তারা তাদের নিজের এবং নিজেদের চৌদ্দ গুষ্ঠির সুবিধার্তে ও মুনাফা অর্জনে। প্রভুত্ব পাওয়ার লোভে তারা মানুষকে আর মানুষ মনে করছে না। তাদের অংশ এই সমাজে ১০% হলেও তাদের প্রভাব আমার/আপনাদের মতো ৮০% মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, গরীব মানুষদের জন্য বিষাক্ত, ক্যান্সারের মতো। তিক্ত হলেও সত্য যে আমরা/ আপনারাই সাহায্য করে যাচ্ছি তার ব্যাপ্তি বাড়াতে, প্রসারতা বাড়াতে, তাদের বানানো দুর্নীতি এক্সেপ্ট করে এবং ফলো করে।

আচ্ছা বিক্ষিপ্তভাবে একটা প্রশ্ন করি, কোনদিন আপনার এলাকায় বা শহরে দেখেছেন সামাজিক সৃজনশীল কাঠামো তৈরি করতে কোন মিছিল, প্রতিবাদ, মানব বন্ধন?

একটা সময় ভাবতাম বাংলাদেশ ঘনবসতি পূর্ণ দেশ, জনসংখ্যা অতিরিক্ত বলে সরকারের সীমিত রিসোর্সে সামলাতে হিমশিম খায়। কিন্তু আমার ধারণা ভুল। এই দেশের ঐ ১০% ভাগ মানুষের কাছে অকল্পনীয় বিপুল পরিমাণে অর্থ, ঐ অর্থ কোথা থেকে তৈরি হলো? মেশিন ছিলো? ঐ ৮০% ভাগ মানুষদের রক্ত চুষেই, তাদের ঘাড়ে পা দিয়ে উপরে উঠছেন তারা। উনারা করবেন না সমাজের সচেতনাতা বৃদ্ধি করতে কোন পরিকল্পনা, নিবেন না সুস্থ সমাজ ব্যাবস্থা তৈরি করতে কোন পদক্ষেপ, করবেন না নাগরিক জীবন ব্যবস্থার কোন উন্নতি ও স্থায়ী কাঠামো তৈরিতে দিবেন না কোন জোড়ালো আওয়াজ। দিনকে দিন উন্নয়নের নাম করে সাধারণ মানুষদের রাখবে জিন্মি করে। উনারা ধর্মের নাম দিয়ে চোখে কালো কাপড়ের পট্টি দেয়া মানুষদের সাপোর্ট করে যাবেন, কারণ তাতে যে তাদেরই সুবিধা হয়। নিজের সন্তানদের পাঠাবেন বিদেশে পড়তে আর জায়গায় জায়গায় সস্তায় ছওয়াব কামানোর জন্য মাদ্রাসা খুলে দিবেন। কারণ যত মূর্খ পয়দা হবে, ততই শোষণকারীদের সুবিধা হয়। গণ্ড মূর্খরা শিক্ষিত হলে তো তাদের সব হিসাব নিকাশ নিবে, পশ্চিমাদের মতো সমান সমান মানুষের মতো মানুষ সম্মান ও অধিকার চাইবে। প্রভুত্ব চলে যাবে। এর মধ্যে অবশ্য কিছু প্রবাসীও আছেন। শর্টকাট উপায়ে বেহেশত যাওয়ার জন্য উনারাও মাদ্রাসা খুলে দেন।

কেন উনারা মিলে কি একটা সাংস্কৃতিক ক্লাব, কোন খেলাধুলার ক্লাব, আরেকটি ভিকারন্নেসা, হলিক্রস, নটরডেম বা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল বা কলেজ খুলতে পারেন না? পারেন না, বছরে ২/১ টা ট্রিপ করে সুবিধাবঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের দেশের গণ্ডি থেকে বের করে বাইরে কোথাও ঘুরিয়ে আনতে? ছোট্ট শহরের ঐ বৃত্তের বাইরে বিশ্ব যে কী রেইসে দৌড়াচ্ছে তা নিজ চোখে দেখে শিখে আসার জন্য! কেন শেখাচ্ছেন না তাদের? কেন আপনাদের শুধু মাদ্রাসাই দিতে হবে? কেন এখনো কুসংস্কারেরই চর্চা হবে?

একটা দেশের উন্নতি যে শুধু ব্রিজ আর অপরিকল্পিত জায়গায় জায়গায় নিয়ম – নীতি ভঙ্গ করে বিল্ডিং করা নয়, তা আমাকে নতুন করে আর বলতে হবে না। দিনকে দিন আপনারাই বাড়িয়ে তুলছেন দুর্নীতি। সবার মাঝে কেমন যেন কাউকে ঠকিয়ে উপরে উঠার এক প্রতিযোগিতা। কারও থেকে এক টাকা মারতে পারলেই, মহা আনন্দ, মহা উৎসব চলে অনেকের মধ্যে। ভাবতে শুরু করে দেয় সে এখন ধনী হওয়ার পথে। কিন্তু আপনি নিজেও যে আপনার করা সিস্টেম এর মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন, তা বুঝতে ও মানতে রাজি নন আর তাই কাকের মতো চোখ বন্ধ করে রাখছেন।

ডাক্তার, উকিল, আমলাতন্ত্রতে সব শিক্ষিতরা আছেন এই ক্ষেত্রে এগিয়ে। খালি ধান্ধা, টাকা খাওয়ার ধান্ধা। আর এই রেইস উপভোগ করছেন সমাজে যারা উপরে বসে আছেন ঐ যে ১০% শোষণকারীরা, প্রভাবশালীরা। আর রাষ্ট্র শুধু তাদের খেলার পুতুল মাত্র আর এই পুতুল খেলা সুন্দরভাবে পরিবেশন করছেন রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা।

একটা কথা শেষমেষ না বললেই না, আজ যদি নুসরাতের ঘটনা কোন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা বড় প্রোফাইলের রাজনৈতিক নেতার দ্বারা হতো, সব কিছুই কবে চুপ হয়ে যেতো, ঘটনা বদলে যেতো। নতুন ইস্যু তৈরি হয়ে যেতো। তদন্ত কমিটি হয়ে গিয়ে আরও নতুন নতুন কমিটি হতো, আরও কতো কী?? আর মিডিয়া!!! থাক, বাদ দিলাম …।

ফেসবুকে মাফ চেয়ে আপনারা আপনাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলছেন। আর তাইতো কিছু হলেই দেশের আইনের কাছে বিচার না চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চায় মানুষ। মাঝে মধ্যে ভুলে যাই, তিনি কি দেশের প্রধানমন্ত্রী নাকি আইনের প্রধান বিচারপতি? যতদিন আইনের শাসন মানুষ না দেখবে, আস্থা ফেরত না আসবে ততদিন নুসরাতদের জীবন যেতেই থাকবে সাথে বাচ্চারা বাকি থাকবে না। সাথে হয়রানি এবং হুমকি ফ্রি।

ওহ হ্যাঁ, আমি তো শুধু ৯০% ভাগ এর কথা বলেছি, আরও ১০% ভাগ বাকি আছে। সেই ১০% ভাগ মানুষ গলা ফাটাচ্ছে সমাজ বদলানের প্রত্যয় নিয়ে। হতে পারে তার জন্য তাদের জীবন যেতে পারে, দেশ ত্যাগ করতে হতে পারে, গুম -হয়রানি আরও কতো কি হতে পারে। হতে পারে উনারা ক্ষমতাহীন, তারপরেও উনারা থেমে নেই।

এখন আবার আমাকে গালি দেয়ার জন্য ফেক একাউন্টসহ উঠে পড়ে লাগবেন জানি, কেন শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে শুধু নাম ধরেই ডেকেছি। কারণ আমি শিখেছি, আমরা মানুষ হিসাবে সবাই সমান। আর তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমরা ট্রাম্পই বলি, আর লিও ভারাদকারকে লিও।

শেয়ার করুন:
  • 418
  •  
  •  
  •  
  •  
    418
    Shares

লেখাটি ১,৯৪৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.