সিরাজদ্দৌলার এই হাসি রাষ্ট্রের প্রতিই আস্ফালন!

0

ইলা ফাহমি:

নুসরাত ভেসে বেড়াচ্ছে ফেসবুক জুড়ে, মগজ জুড়েও। আজও বিকেলে বাজে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গিয়েছে। মাঝে মাঝেই স্বপ্নে দেখি আমি অদৃশ্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না, মানুষের পাশে বসেই মানুষের আসল চেহারাটুকু দেখতে পাচ্ছি। তারপর হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে গেছি, আমার গায়ে কাপড় নেই, আমি দৌড়াচ্ছি, দৌড়াচ্ছি।

জীবনের প্রথম যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলাম যার দ্বারা, তিনি ছিলেন এলাকার মসজিদ কমিটির গণ্যমান্য ব্যক্তি, চাচা ডাকতাম। বারো বা তেরো বছর বয়সের একজন সদ্যকিশোরী সেদিন দৌড়াতে দৌড়াতে ছাদ থেকে ঘরে এসে পালিয়ে বেঁচেছিলো। আম্মাকে বলবার পর আম্মা প্রতিবাদ করতে পারেনি, পাছে এলাকা ছাড়তে হয়!
চাচা পরপর তিনবার হজ্ব করে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছেন, আমি আজো ভুলতে পারি না সেই ঘটনা। সেদিন মনে হয়েছিলো-‘মানুষ যদি এতো ধার্মিক হয় তাহলে এই কাজ করে কীভাবে?’ ‘আল্লার কাছে ক্ষমা চাইলেই ক্ষমা করে দেয় বলেই কি এরা এসব করে?’ শিশু মনের সরল প্রশ্ন, সেদিন উত্তর পাইনি, আপনাদেরও আজ আর দেবার প্রয়োজন নেই।

ছবিটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

নুসরাত বাঁচার আগ পর্যন্ত বিচার চেয়েছে, আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে! একজন কিশোরী সারা শরীরে ব্যান্ডেজ চেপে পোড়া ক্ষতের ব্যথায় শুয়ে প্রতিবাদ করছে, বিচার চাইছে! অন্যদিকে ধর্ষক সিরাজ ধরা পড়ার পর হাসছে। এই হাসি পুরো রাষ্ট্রকে কটাক্ষ করে হাসি, এই হাসি পিতৃতন্ত্রের প্রবল শক্তিমত্তার হাসি, এই হাসি এক তওবায় বেকসুর খালাসের হাসি, এই হাসি সেই হাসি যে হাসি আমি প্রতিদিন স্কুলে যাবার সময় রাস্তার পাশে দাঁড়ানো চাচাকে হাসতে দেখতাম। দেশটাকে বিবস্ত্র করে আগুনের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, আমরা অদৃশ্যের মতন চুপ করে চেয়ে দেখছি, আমাদের কিছু করবার নেই।

ধর্মে নাকি বলেছে মাকে সম্মান করতে, কন্যাকে ভালোবাসতে। নুসরাতের বাবা তো নুসরাতকে ভালোবাসতো। ধর্ষক সিরাজের যদি নুসরাতের বয়সী কন্যা সন্তান থাকে, সে তার কন্যাকেও ভালোবাসে। নুসরাত তো তার কন্যা নয়, তাই তার নারী শরীরে হামলে পড়া যায়, প্রতিবাদ করলে আগুনে ঝলসে দেয়া যায়।
সিরাজকে আপনাদের স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ মনে হয়? আমার মনে হয় না। ধর্মের আফিমে বুঁদ হয়ে থাকা হিংস্র জানোয়ার মনে হয়, যার যৌনক্ষুধার শিকার একজন নারী শরীর নিয়ে জন্ম নেয়া কন্যাশিশু।

এক একটা ঘটনা শুধুই ঘটনা না। এক একটা ঘটনা রাষ্ট্রের অক্ষমতার চিহ্ন, পুরুষের শক্তির ছাপ, বিচারহীনতার চেহারা। নুসরাত মরে গিয়ে বেঁচে গেছে, বেঁচে থাকলে প্রতিদিন একবার করে মরতো। নুসরাতের ধর্মীয় পোশাক, ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কৃত্রিম নিরাপত্তা কিছুই তাকে বাঁচাতে পারেনি, পারে না কখনো।

আপনারা হা-রে-রে-রে করে চিৎকার করে উঠবেন না দয়া করে এই বলে যে ‘এ ঘটনার সাথে ধর্মের যুক্ততা নেই’। যে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধার্মিক শিক্ষকের হাতে ধর্মীয় পোশাক পরা কিশোরী মেয়েটি যৌনলালসার শিকার হলো, সেই দায়িত্ব ধর্মেরই নিতে হবে। শক্তি সততা আর সাহস থাকলে ওখানে গিয়ে চিৎকার করুন।

শেয়ার করুন:

লেখাটি ২৮৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.