নুসরাতের রেখে যাওয়া দাবি, রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

0

সামিনা আখতার:

ভাবছিলাম একটা খোলা চিঠি লিখি প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু সে চিন্তা বাদ দিলাম। কারণ, কী লাভ এতে!
বরং আপনাদের কাছেই লিখি চিঠিটা। অন্ততঃপক্ষে কয়দিন থেকে খারাপ হওয়া মনটা যদি একটু হালকা হয়! পুরো শরীর ব্যান্ডেজ করা নুসরাত আর নিথর শিশু মনিরকে ভুলতে পারছি না।
আচ্ছা আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি জানেন, একটা মাদ্রাসায় একজন ছয়-সাত বছরের শিশুর দৈনন্দিন রুটিন কী? একজন শিশুর দিন শুরু হয় কয়টায়? কীভাবে সে বড় হয়?

বাংলাদেশের একটি মাদ্রাসায় যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। তিন/চার তলা একটা পুরো বাড়ি, যার তিনদিকেই বিল্ডিং। বিভিন্ন সেশনে অসংখ্য ছাত্র আছে সেখানে। খাওয়া-দাওয়া এবং থাকার ব্যবস্থাও আছে। আমি হলরুমের মতো যে রুমটায় গিয়েছিলাম, চারতলার উপরে বড় একটি রুম, ৩০-৪০ ফিট লম্বা এবং ১৫/২০ ফিট চওড়া, যেখানে শিক্ষা চলছে। রুমের ভিতরে কোন আসবাবপত্র নেই, শুধু এক মাথায় শিক্ষকের জন্য একটি চৌকি ছাড়া।
মেঝেতে লম্বালম্বিভাবে রুমের দুপাশে সার করে বসেছে ছাত্ররা, এতোটুকুও এদিক সেদিক নেই। যারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছে এবং এখানে থেকে পড়ে। প্রত্যেকের সামনে একটি করে রেহেল এবং ধর্মগ্রন্থ। ওদের প্রত্যেকের পিছনে দেয়ালের কাছে রাখা আছে একটি ট্রাঙ্ক, আর ভাঁজ করে রাখা শোবার কাঁথা বালিশ। রাতে ঐ কাঁথা বালিশ এই মেঝেতে বিছিয়েই ওরা সারিবদ্ধভাবে ঘুমায়। সেখানে ছয়-সাত বছরের শিশু থেকে চব্বিশ-পঁচিশ বছরের যুবক পর্যন্ত আছে।

শিশুসহ এদের সবারই দিন শুরু হয় রাত তিনটায়। সারাদিন শিক্ষা কার্যক্রম চলতে থাকে রাত দশটা- এগারটা পর্যন্ত। আচ্ছা, বলুন তো একটা ছয়-সাত বছরের শিশুকে কেন রাত তিনটায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে হবে? কী শেখে সে? সে তার জিহবা, তালু, কন্ঠ ব্যবহার করে আরবী ভাষার অসংখ্য শব্দ এবং বাক্য মুখস্ত করে চলে। এই শিক্ষাটা দেয়া হয় পুরোপুরি রসকসহীনভাবে। শিশুবান্ধব শিক্ষার কোন পদ্ধতি সেখানে নেই।

আমি রুমের মাঝ বরাবর, দুইদিকে দুই সারি ছাত্রের মাঝখান দিয়ে হেঁটে অনেকটা দূর গেলাম। একজন তরুণ (বোধ করি সবেমাত্র কৈশোর পার করেছে) আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ওর সামনে গিয়ে বসে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, এই প্রথম কোন নারীর কি এখানে প্রবেশ?” সে মুচকি হেসে বললো, হ্যাঁ।

এরপর একটি শিশুর কাছে গিয়ে তার সারাদিনের কার্য্ক্রম শুনলাম। দীর্ঘ সময় ধরে মুখস্ত এই বিদ্যাচর্চা চলতে থাকলেও দিনের কোন সময়ই ইনডোর বা আউটডোর খেলার কোন সুযোগ সেখানে নেই। শুধু দিনের কোন এক অবসরে সে তার সমবয়সীদের সাথে গল্প করে; খেলা বা বিনোদন বলতে সেটাই।

বিশ্বাস ক্রুন আর নাই করুন আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মাকে দেখেছো কতদিন আগে?শিশুটি এতোক্ষণ যে উত্তর দিচ্ছিল, তা থেমে গেল, ওর চোখের ভাষা ছিল স্পষ্ট। আমি তাড়াতাড়ি ওখান থেকে সরে গেলাম। কারণ আমি জানি, আর একটা কথা বললেই ওর ভিতরের সমস্ত কষ্ট অঝোর ধারায় নেমে আসবে। আর সেটা হলে ওকে এর মাশুল দিতে হবে কড়ায় গণ্ডায়।

আরও কয়েকজন ছাত্রের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, এখানে মা এসে তার সন্তানকে দেখার নিয়ম নেই। বরং ছাত্রটিই ছয় মাস বা এক বছরে বাড়ি গিয়ে দেখা করে। আমি ঐ মাদ্রাসার শিক্ষক অর্থাৎ হুজুরকে বললাম, শিশুর বিকাশের জন্য ওদের তো খেলাধুলা প্রয়োজন। তার উত্তর ছিল, খেলাধুলা করলে মন অন্যদিকে যায়, শিক্ষা হয় না।

বাংলাদেশের নারী মাদ্রাসাগুলো সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। শুধু প্রশ্ন জাগছে, যে পদ্ধতি সহশিক্ষায় বিশ্বাসী নয়, সেখানে নুসরাতের শিক্ষক কীভাবে এই লম্পট সিরাজুদ্দৌলা?

আমি জানি সাম্প্রতিক ফেসবুকের যুগে মাঝে মাঝেই উঠে আসা ভিডিওচিত্র, যেগুলোতে শিশুদের প্রতি চরম অত্যাচারের সরাসরি প্রমাণ মেলে, সেগুলো আমরা মোটামুটি সবাই দেখেছি। এই বিষয়গুলোকে আমরা মানতে পারি না, শিউরে উঠি। কিন্তু যে বিষয়গুলোকে আমরা নীরবে সমর্থন দিয়ে যাই, এবং আপনি আমিই নয়, বরং একটি শিশুর পিতামাতাও সমর্থন দিচ্ছে, রাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে, সেইসবের প্রকৃত চিত্র এবং হাজার হাজার শিশুর উপর এর প্রভাব দেখবার দায়িত্ব আসলে কে পালন করছে এবং কতটুকু করছে?

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ, অথচ এই দেশটারই শিশুদের কী মারাত্মক অবস্থা!

ইংল্যান্ডে আমার ছেলের স্কুলে “রিলিজিয়ন” বলে একটি বিষয় পড়ানো হয়, এবং সেটি এই স্কুলে বাধ্যতামূলক একটি বিষয়। ইংল্যান্ডের শিক্ষা পদ্ধতি হলো স্কুলে অংক, বিজ্ঞান আর ইংলিশ সবার জন্য বাধ্যতামূলক। আর এর বাইরে ঐ স্কুল আরও ২/৩টা বিষয়কে নিতে পারে বাধ্যতামূলক হিসাবে।

স্কুলে কিছুদিন আগে অভিভাবক মিটিং এ গিয়েছিলাম। ধর্ম শিক্ষক ব্রিটিশ অথবা পূর্ব ইউরোপের। কোন ধর্মের সেটি বোঝার উপায় নেই। কারণ তার দাড়ি, টুপি বা এরকম কোন সিম্বল নেই। সেটার দরকারও নেই। কারণ এই ধর্ম শিক্ষা কিন্তু নিজের প্রার্থনা আর ধর্মীয় কার্যক্রমের জন্য যে শিক্ষা, সেটি নয়, বরং ধর্ম বিষয়ক শিক্ষা। তার মানে সব ধর্ম সম্পর্কে জানানো। স্কুলে কী কী পড়ানো হচ্ছে, কীভাবে পড়ানো হচ্ছে এ বিষয়ে প্রায়ই কথা হয় ছেলের সাথে। একদিন ধর্ম ক্লাস ছিল এরকম, শিক্ষক ক্লাসে এসে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যে মৃত্যদণ্ড পদ্ধতি আছে তা বর্ণনা করলেন বিস্তারিতভাবে। এরপর ছাত্রছাত্রীদেরকে বললেন, তুমি মৃত্যুদণ্ডের (Capital Punishment) পক্ষে না বিপক্ষে সেই মতামত লিখো, আর এর পক্ষে আর বিপক্ষে দুটি করে পয়েন্ট লিখো।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রের যে শিক্ষা, তা সকল ধর্মের সাথেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। সেইসাথে প্রত্যেকের নিজস্ব চিন্তা, যৌক্তিকতা তৈরির চেষ্টা করছে। এবং সেটাই তো উচিত তাই না? রাষ্ট্র তৈরি করবে মানুষ, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নয়। আর মানুষ হওয়ার পাশাপাশি কেউ যদি তা হতে চায়, তার সুযোগ এবং অধিকার রাষ্ট্র দিবে।

নুসরাত বিষয়ক ফেসবুক পোস্টগুলোর একটা ছিল এরকম-
“একজন মুমিন অন্য একজন মুমিনের দোষ ঢেকে রাখবে। তাহলে পরকালে আল্লাহও তার দোষ ঢেকে রাখবে।“ তো, তাহলে এরকম কত শত মুমিন সিরাজুদ্দোউলার দোষ ঢেকে রাখা হয়েছে? আর কতজন নুসরাত আছে, যারা বেঁচে আছে, কিন্তু মুমিন থাকবে বলে নির্যাতনের কথা ফাঁস করে না?

মুখ খুলেছিল নুসরাত আর তাই তাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আপোষহীন এক প্রতিবাদের নাম নুসরাত।
কোন রাজনৈতিক কর্মীকে কি দেখেছেন তার নিজের দলটি মারাত্মক কোন খারাপ কাজ করলেও প্রতিবাদ করতে? কোন ধর্ম অনুসারী মানুষকে কি দেখেছেন ঐ ধর্মের খারাপ কোন কিছুর প্রতিবাদ করতে? দেখেন নাই।

আপনারা যারা ধর্ষক রক্ষার জন্য মিছিল দেখে অবাক হচ্ছেন, আমি কিন্তু হচ্ছি না। কারণ এইভাবে মানুষ হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ রেখে আমরা কীভাবে বিবেক আর বুদ্ধিসম্পন্ন কাজ আশা করি? আপনারা কেউ কেউ ঐ মিছিলকারিদের ফাঁসির দাবি করলেও আমি করবো না। আমার বর্ণিত কাহিনী, ভিডিও আপনাদের নিজের অভিজ্ঞতা এইসবকিছু থেকেও কি মনে হয় না যে, একটি শিশুকে তার সমস্ত বুদ্ধি বিবেক যৌক্তিকতাকে বিনাশ করে দিয়ে বড় করা হচ্ছে?

আর এও কি মনে হয় না যে মাকে দেখতে না দেয়া এবং নারীর প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষ নিয়ে বড় হওয়া একটি শিশু বড় হয়ে নারীর দোষ খুঁজে পাবে পদে পদে, নারী নির্যাতনকারীর পক্ষে দাঁড়াবে?

তাই বলবো, আসুন, নুসরাতের মতো প্রতিবাদী হই। একত্রিত হয়ে বরং শাস্তি দাবি করি সরকারের, পরিবর্তনের দাবি তুলি এই রাষ্ট্র এবং শিক্ষা ব্যবস্থার; যা বিবেকহীনতা তৈরির এই প্রক্রিয়াকে জিইয়ে রাখে।
এই ব্যবস্থাতেই আপনার আমার সন্তানই হয় হত্যাকারী, ধর্ষক রক্ষাকারী,ফেসবুকে নারীদের বিরুদ্ধে অকথ্য ভাষায় গালমন্দকারী!

শেয়ার করুন:

লেখাটি ২৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.