থেমে গেলো নুসরাতের জীবন, প্রতিবাদ থেমে না যাক

0

শাহরিয়া খান দিনা:

মারা গেছে অগ্নিদগ্ধ নুসরাত! তথাকথিত সমাজ-ধর্মের কঠিনতম শাসনের ভেতর থেকে চলা মেয়েটি যৌন হয়রানির শিকার হয়, নিজের আত্মসম্মানবোধ নিয়ে গর্জে উঠে। সেই গর্জে উঠা প্রতিবাদের আগুনকে নৃশংসভাবে নিভিয়ে দেয়ার চেষ্টায় তারা মেয়েটির শরীরে আগুন লাগিয়ে দেয়।

আর কত এমন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া মেয়েকে নিয়ে লেখা হবে? নিউজ হবে? প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজের পাতায় আসছে নারী নিপিড়ন আর নির্যাতনের এমন সব খবর। এই শতাব্দীতে এসে মেয়েরা প্রতিবাদ করবে তাতেও দোষ!

মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং পোশাকের মাপকাঠি ঠিক করে বয়ান দেওয়া কিছু পুরুষ এবং দুর্ভাগ্যজনক কিছু নারীও আছে যাদের ধারনা মেয়েদের চরিত্র আর পোশাকই দায়ী সবকিছুর জন্য।

‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা দেখলেও তেরে আসেন। মেয়েদের পোশাকের ব্যাপারে বিড়ালে গলায় শুটকি মাছ অথবা খাবার খোলা রাখলে মাছি বসবে- এইসব উদাহরণ দেন। যারা এমন উদাহরণ দেয় তাহলে তারা আসলে মানুষ হয়ে জন্মেছেন কেন? ইতর প্রানীর বিচার, বিবেক, বুদ্ধি থাকে না, তার খিদা লাগলেই সে শিকার করবে। অন্যের দুঃখকষ্ট, ব্যাথা-বেদনা, মান-অপমান বুঝবেনা। মানুষের ব্যাপার তো সম্পুর্ন আলাদা। মানুষ সেই যার সংবেদনশীল মন থাকবে, অন্যের প্রতি সহানুভূতি থাকবে।

সবকিছুতে নারী চরিত্র এবং পোশাক নিয়ে বাড়াবাড়ি করা মনুষ্যবর্জিত একদল ইতরের ইতরামিতে সয়লাব অনলাইন। নুসরাত আধুনিক পোশাক পড়া কোন নারী নয়। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী না। ইসলামী অনুশাসনে সুরক্ষিত পর্দায় মোড়ানো মাদ্রাসায় পড়ুয়া মেয়ে। সে আক্রান্ত হয়েছে তার স্বীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ দ্বারা। যারা তার গায়ে আগুন দিয়েছে তারাও সহীহ পর্দা করা! বোরখা, হাতমোজা, সানগ্লাস সবই ছিল।

এই সেই নরপিশাচ অধ্যক্ষ সিরাজউদৌলা

কোন মানুষ নিজস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কী করে এতোটা উম্মাদ হয়; যার জন্য একটা জীবন্ত মানুষকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়েই জ্বালিয়ে দেয়া যায়? দেশের আইনের শাসনকে এতটা বৃদ্ধাংগুলি দেখানোর সাহস তারা কোথায় পায়? কোথায় তাদের এতো সাহসের উৎস?

কোন সমাজে আছি আমরা? ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা মাদ্রাসায় যাদের ধর্মীয় এবং নৈতিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হবার কথা সেখানে এতিম ছেলেশিশু থেকে মেয়ে কেউ রেহাই পাচ্ছেনা যৌন নির্যাতন থেকে। আবার এই হুজুরেরা যখন ওয়াজ-মাহফিল করেন তখন বেশিরভাগ শুধু নারী নিয়েই কথা বলেন। যেন পৃথিবীর একমাত্র সমস্যা নারীর শরীর!

সামান্য একটু আগুনের আঁচ সহ্য করতে পারি না আমরা, সেখানে শরীরের ৮৭% পোড়া নিয়ে কী অসহ্য নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছে মেয়েটা ভাবা যায়? যারা দোজখের আগুনের ভয় দেখান, তারাই আগুন ঢেলে দিলেন একটা জীবন্ত মনুষ্য শরীরে!

নুসরাত প্রতিবাদ করেছে। বলেছে, “এই স্যার আমার গায়ে হাত দিছে। যতক্ষন আমার নিঃশ্বাস আছে আমি প্রতিবাদ করবো”। এখন তো তার নিঃশ্বাস চলে গেল, তবে প্রতিবাদ কি থেমে যাবে? আগুনে পোড়া শরীর নিয়ে এম্বুলেন্সে আসার সময়ও দৃপ্তকন্ঠে বিচার চেয়েছে। ন্যায় বিচার পাওয়ার লড়াইয়ে নামা মেয়েটা এভাবে হেরে যাবে?

ওদিকে, কুলাঙ্গার ধর্ষক সিরাজের পক্ষে মিছিলে নেমেছে কিছু অপদার্থ জানোয়ার। একটা সমাজ কতটা পঁচে গেলে এমনটা সম্ভব! যারা ধর্ষকের পক্ষে ইনিয়েবিনিয়ে সাফাই গাইতে চেস্টা করে এরাও ধর্ষক শুধুমাত্র সুযোগ অথবা সাহসের অভাবে ভদ্রতার লেবাসধারী। এদের প্রতিহত করা জরুরী নাহয় আক্রান্ত হবে আরো অনেক নুসরাত।

দুইদিন আগেও নুসরাতের বাবা’র আহাজারী “আমার মা না বাঁচলে,আমি বাঁচমু না” ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের আফসোস – “সকালে বোনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তখন তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক দেওয়া ছিল। সে পানি খেতে চেয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসকের নিষেধ থাকায় পানি দেওয়া যায়নি”। ধর্ষকরা ইতর প্রজাতির। এরা মনে হয় কখনো মানুষ হয়না। মনে হয় না, এরা কারো আব্বু হয়! কারো ভাই হয়! সভ্য জগতের কোন সভ্যতার অংশ এরা না।

যার হারায় সেই বুঝে হারানোর বেদনা। যাদের এখনো হারায়নি বলে, ‘আমার কী বলে’ চুপ করে আছেন জেনে রাখেন কেউ নিরাপদ না। আমাদের কন্যা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে নয়তো কোন একদিন নুসরাতের বাবা’র মতো আপনিও কাঁদতে কাঁদতে বলবেন –
আমি আমার মা’রে বলছি, মা! চোখ খোলা রাখো” চোখটা বন্ধ করলে যদি আমার মেয়েটা আর চোখ না খোলে? মায় আমার মইরা যায়”…!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪৫৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.