কবে আপনাদের বোধোদয় হবে?

0

নাসরিন শাপলা:

আমার ইদানিং ‘লিখে আর কী হবে? কিছুই বদলাবে না!” টাইপ একটা হতাশাজনক ফেইজ চলছে। তাই ইস্যু আসে, ইস্যু যায়- আমি প্রোফাইল পিকচার বদলাই, ভ্রমণ কাহিনী লিখি, দুই এক লাইনে বিশাল ভাবের স্ট্যাটাস দেই।

‘হাল না ছাড়া’ টাইপ আমার একদল বন্ধু আছে। তারা লেখেন, প্রতিবাদ করেন, আর আমি তাদের লেখায় লাভ ইমো দিয়ে পার পেয়ে যাই। নিজেকে প্রবোধ দেই এই বলে, “ওরাই তো বলছে, আমি বললেও তো একই কথাই বলতাম শুধু ভাষাটাই যা একটু অন্য হতো, এই যা”। কিন্তু কথা তো সেই একই। যদি বদলায় কিছু, এতেই বদলাবে।

আর সত্যি কথা বলতে কী, লেখালেখি করা আমার জন্য খুব একটা শ্রমসাধ্য ব্যাপার না। কঠিন হলো লেখা পরবর্তী পাঠক প্রতিক্রিয়া সামাল দেয়া। যারা আমার মানসিকতা জানেন বা বোঝেন, সেরকম পাঠক আমার জীবনে আশীর্বাদের মতো। কিন্তু যারা বোঝেন না, বা বোঝার চেয়ে অযৌক্তিক তর্ক আর অন্যায় আক্রমণ করতেই বেশি পছন্দ করেন, এইসব পাঠক আমার জীবনকে বিভীষণের মতো বিষিয়ে দেয়।

সুধীজনেরা বলেন লিখতে গেলে সইতে হবে। আমি সেখানে একেবারেই অপারগ। না পারি কথার পিঠে কথা সাজিয়ে শক্ত সমুচিত জবাব দিতে, না পারি কুযুক্তি সইতে।

তবুও মাঝে মাঝে নিজেকে স্থির রাখাটা কঠিন হয়ে যায়। গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা টি-শার্ট পরা কিছু মেয়ের ছবি নিয়ে ধুন্দুমার কাণ্ড চলছে। শুধু দেখছি আর ভাবছি। ভাবছি কীভাবে একটা যৌক্তিক দাবিকে খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পূর্ণ অন্যভাবে ডাইভার্ট করে ফেলা হলো বা হচ্ছে।

পরিস্থিতি বিচারে এটি আমার চোখে খুবই যৌক্তিক দাবি। তার আগে বলে নেই, আমার ১২ এবং ১৬ বছরের দুটো মেয়ে আছে যারা প্রতিদিন কানাডার টরন্টো শহরে এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় ধরে বন্ধুদের সাথে পাবলিক বাসে যাতায়াত করে। এই দেশের পরিস্থিতি বিচারে এই দাবি ওরা তুললে আমার কাছে সেটা মনে হতো চরম অযৌক্তিক। অফিস এবং স্কুলের সময়টাতে এখানে বাসের অবস্থা বাংলাদেশের মুড়ির টিনের মতোই হয়। অনেক সময় বাস ড্রাইভার ভীড়ের কারণে দরজা বন্ধ করতে পারে না। তখন সবাই চেপেচুপে কোন রকমে ভিতরে ঢুকে তারপর দরজা বন্ধ করতে হয়।

এই ভীড়ে আমিও অনেক যাতায়াত করেছি। কিন্তু কোন অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা শয়তানির মুখোমুখি কখনও হতে হয়নি। উপরোন্ত মানুষের মুখে ‘সরি’ আর ‘এক্সকিউজ মি’ লেগেই আছে। উল্টো মেয়েদের বলি ভীড়ের বাসে চেষ্টা করবে পিঠের বিশাল ব্যাগপ্যাকটি নামিয়ে পায়ের উপর রাখতে, যাতে সেখানে আরেকজন যাত্রী দাঁড়াতে পারেন।

নাসরিন শাপলা

কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি তো একেবারেই ভিন্ন। গা ঘেষে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, কোন মেয়ে নোংরা কিছু পুরুষের দৃষ্টিসীমার মাঝে আসলেই তো কেল্লাফতে। মেয়েগুলোর তো টি-শার্টে লেখা উচিত ছিলো’, আপনার দৃষ্টি ভদ্রজনোচিত না হলে সেটিকে মাটির দিকে নিবদ্ধ রাখুন’।

মেয়েগুলো আসলে কি বলতে চেয়েছে বা কেন বলতে চেয়েছে, সেটা বোঝার চেষ্টা না করে এক দল পড়লো তাদের টি-শার্ট নিয়ে, তো আরেক দল পড়লো তাদের সোশ্যাল ক্লাস নিয়ে। আর আরেকদল ব্যস্ত হয়ে পড়লো তাদের ব্রাদারহুড রক্ষার্থে। শুধু ব্রাদারহুড বললে ভুল হবে, এই দলে সিস্টার এবং মাদাররাও আছেন।

আমি আবার এই জাতীয় ‘হুড’ বড় ভয় পাই। এই ‘হুডে’র অসিলায় যে সমাজের কতো অপরাধী পার পেয়ে যায়, তার ইয়ত্তা নাই। ‘সব পুরুষ এক না’, ‘আমার ভাই এমন করতেই পারে না’, ‘আহা! আমার সোনার টুকরো ছেলে’। এই ব্রাদার, সিস্টার আর মাদারহুডের বাইরে এসে কেউ তাদের প্রিয়জনের অন্যায়ের দায় স্বীকার করে না। কেউ অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তি পেতে দেয় না বলেই অপরাধ আজ মহামারীর আকার ধারণ করেছে।

বুঝলাম মেয়েদের টি-শার্টের কথাগুলো আপনাদের কারো কারো ভালো লাগেনি। তাহলে একটু বলবেন কী ঠিক কীভাবে বললে কথাগুলো আপনাদের কাছে সহনীয় হতো? এই কথাগুলিই তো লাখো বার বলা হয়েছে লাখো ভাবে। কখনো কেঁদে, কখনো হাত জোড় করে, কখনো গলায় দড়ি দিয়ে, কখনো বিষ খেয়ে, কখনো লাশ হয়ে রাস্তার কিনারে পড়ে থেকে, কখনো অগ্নিদগ্ধ হয়ে। মূক ও বধির জাতির তাতে কিছুই আসে যায় না। অথচ এক সামান্য টি-শার্টের লেখাতেই কী অসামান্য প্রতিক্রিয়া!

মানলাম আপনি ভদ্র পুরুষদের একজন। জীবনে কখনো জ্ঞানত কোন নারীর সাথে অসদাচরণ করেননি। তাই এই কথাগুলো আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলছে। খুবই স্বাভাবিক। এবার তবে আসুন আরেকটু গভীরে ভাবতে চেষ্টা করি। ভেবে বলুন, জীবনে কখনো কোন পুরুষের দ্বারা কোন নারীকে শারীরিক বা মানসিকভাবে নিগৃহীত হতে দেখেছেন কিনা? দেখে থাকলে সেখানে আপনার ভূমিকা কী ছিলো?

যদি প্রতিবাদ করে থাকেন, তবে আমার চোখে আপনি সম্মানিত মানুষদের একজন। আমি নিশ্চিত এই টি-শার্টে লেখা কথাগুলো সেক্ষেত্রে কোনভাবেই আপনারা অস্বস্তির কারণ হবার কথা নয়।

আর যদি না করে থাকেন, তবে নিচের পয়েন্টগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখুন তো ঠিক কোনটা আপনার প্রতিবাদ না করার কারণ ছিলো?

১) মেয়েটার পোশাক ভালো ছিলো না?
২) মেয়েটি পর্দা করছিলো না?
৩) মেয়েটির এই ভীড়ে আসাটাই ঠিক হয়নি?
৪) মেয়েদের একা একা চলাফেরা করা ঠিক না?
৫) মেয়েটার বয়সটাই খারাপ?
৬) মেয়েদের এতো বাইরে বের হবার দরকার কী?
৭) কী দরকার এইসব ঝামেলায় নিজেকে জড়িয়ে?

উত্তরটা জনসমক্ষে বলবার দরকার নেই। ভাবুন! শুধু নিজের মনে ভাবুন! আপনাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। আপনারা ভাববেন, নিজেদের চিন্তার ভুলটুকু বুঝতে পারবেন, নিজেকে শুধরাবেন, এটাই আমার লেখার উদ্দেশ্য। আপনাদের বোধোদয় হোক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 45
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    45
    Shares

লেখাটি ২৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.