বীর পুঙ্গবগণ, নিজের পুরুষ পরিচয় নিয়ে লজ্জিত হতে শিখুন

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)
বীথি সপ্তর্ষির ফেসবুক আইডি বন্ধ। জেনেছি যে লোকজন দলবেঁধে রিপোর্ট করে আইডিটা বন্ধ করিয়েছে। আপনি কি অবাক হয়েছেন? আমি হইনি।

পরশুদিন বীথি ওর ফেসবুকে ফটো পোস্ট করেছিল যেখানে দেখা যাচ্ছে একটা বাসে এক বুড়ো ধরনের লোক বসে থাকা একটা মেয়ের কাঁধে অন্যায় ও অশ্লীলভাবে ওর অঙ্গ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে ও একটা ফটো পোস্ট করেছিল সেটাতে লোকটার চেহারা দেখা যাচ্ছিল না, পরে আরেকটা ফটো পোস্ট করেছে যেখান শুভ্র সফেদ শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধের নুরানি চেহারা মুবারক দৃশ্যমান। ঐ পোস্ট কিছুক্ষণের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মতো। আমি শেষবার যখন সেই পোস্টটি দেখেছি তখন সেখানে সতের শ’র বেশি কমেন্ট ছিল। কয়েকটা পড়েছি- বেশিরভাগই বীথিকে গালাগালি, নারীবাদীদের গালাগালি, নারীদের গালাগালি। কিছু আছে ‘সব পুরুষ খারাপ না’ ধরনের কমেন্ট।

আমাদের বীর পুঙ্গবরা একজন পুরুষের ‘স্বাভাবিক’ আচরণের ছবি সহ্য করতে পারেননি। ছবিটিকে ওরা বেশিক্ষণ ঐ প্রোফাইলে থাকতে দেয়নি। সম্ভবত চব্বিশ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই রিপোর্টে রিপোর্টে আইডি হাওয়া। এটাতে অবাক হওয়ার কী আছে? নারীকে চুপ করিয়ে দেওয়া কি আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতা নয়? নারীর কণ্ঠ রুদ্ধ করা কি আমাদের সমাজে অভিনব কিছু?

আমরা তো সবসময়ই নারীকে চুপ থাকতে বলি, চুপ করিয়ে দিই। ছোট প্রায় শিশু বাচ্চা মেয়েটা যখন ওর মায়ের কাছে গিয়ে কোন নিকট আত্মীয়ের কথা বলে, ঐ কাকা আমাকে ঐখানে ছুঁয়েছে, শিশুটিকে আমরা কি বলি? চুপ কর চুপ কর, এইসব কথা বলতে হয় না। বাসে ট্রেনে টেম্পুতে একটি মেয়ে যখন চিৎকার করে ওঠে তখন চারপাশের লোকজন কী করে? থাক আপা চুপ করেন, ইজ্জৎ তো আপনারই যাবে। এমনকি ধর্ষণের অভিযোগও যখন কেউ করে, সেরকম পরিস্থিতিতেও লোকজনকে বলতে শুনবেন ‘কী দরকার আছে এইসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করে’। নারীকে আমরা চুপ করিয়ে দিই। নারীকে আমরা বলি, প্রতিবাদ করবি না, চিৎকার করবি না। নারীর টুঁটি চেপে ধরতে আমরা কেউই দ্বিধা করি না।

(২)
গত বছরের কথা। দুইটি আদিবাসী মেয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। একটু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সেই ঘটনাটা চাপা দিতে চাইছে। এই নিয়ে কথা হচ্ছিল একজন বয়োজ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সাথে। আমি বলছিলাম, ‘কিন্তু বিচার তো হওয়া দরকার’। তিনি পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত, আইন তো জানেনই, ইতিহাস দর্শন সমাজবিদ্যা সাহিত্য সব বিষয়েই অপরিসীম জ্ঞানী। তিনি বললেন, কিন্তু ঐ মেয়ে দুটিকে বিয়ে দিতে হবে না? এই ঘটনা যদি প্রকাশিত হয় তাইলে ওদের বিয়ে হবে? তাইলে কি ঐ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়াই উত্তম!

আপনারা যারা নারী অধিকার নিয়ে কথা বলেন, আপনাদেরকে প্রায়ই কি শুনতে হয় না এই কথা? চুপ করেন, চুপ থাকেন। নারীবাদ, নারীবাদ করে বেহসি ফাল পাইরেন না। নারীদেরকে অনেক অধিকার দেওয়া হইছে। এইরকম কথা শোনেননি এরকম নারীবাদী কি আছেন কেউ? আসল কথা হচ্ছে নারী কেন কমপ্লেইন করবে? নারী চুপ থাকবে। আর যেসব নারী অধিকারের কথা বলবে, ওদেরকে আমরা চিহ্নিত করবো বেয়াদব হিসাবে, পাগল হিসাবে, ফেইমসিকার হিসাবে- এবং আরও খারাপভাবে তাঁদেরকে শেইম করার চেষ্টা করি আমরা। আসল মতলব ঐটাই- নারী যেন চুপ থাকে। মাইয়া মানুষ কেন কথা বলবে!

নারীকে চুপ করানোর আরেকটা হাতিয়ার হচ্ছে ‘স্লাট শেইমিং’। একটি মেয়ে ধরেন নির্যাতনের অভিযোগ করলো। তখন ওদেরকে বলতে শুনবেন, আপা আপনার ওড়না কই? আপা আপনি এরকম পোশাক পরেছেন কেন? এইটা তো পুরনো হাতিয়ার। এইরকম ঘটনা প্রতিদিনই দেখবেন। মেয়েটার পোশাক যদি আমাদের সমাজের পুরুষের বেঁধে দেওয়া স্ট্যান্ডার্ড মতো না হয়, তাইলে লোকে কী বলে? ফেসবুকে যারা বিচরণ করেন তারা এইসব জানেন। ‘চরিত্র খারাপ’। বহুবার দেখেছি যে নির্যাতিতার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বা নির্যাতকের পক্ষে দাঁড়িয়ে লোকে বলছে, ওর তো পোশাক ঠিক ছিল না, ওর তো স্বভাব ভালো না ইত্যাদি।

(৩)
সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে মিটিং হচ্ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর প্রেসের নেতাদের মধ্যে। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না, আমার মনে আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে উঠলেন, ওদের যে লাইফস্টাইল ছিল…। মানে কী? রুনি ও সাগরের চালচলন ভালো না হলে ওদের হত্যার বিচার হবে না? এই যে এখন মেয়েটা ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ধুঁকছে, ওকে থামিয়ে দেওয়ার জন্যে যখন ধমক নির্যাতনকারী প্রিন্সিপালের লোকেরা, ওরা কী বলছিল? মেয়েটিকে ওরা হুমকি দিচ্ছিল ওর প্রেমের কথা ফাঁস করে দিবে।

বীথির সেই পোস্টের নীচেও আমি কমেন্ট দেখেছি, ‘ওড়না কই’, ‘এই মেয়ে তো নারীবাদী’ ‘এই মেয়ে তো নাস্তিক’ ইত্যাদি আরও কতো কিছু।

লেখক: ইমতিয়াজ মাহমুদ

আশার কথা হচ্ছে যে মেয়েরা আপনাদের এইসব ভয় ভীতি বা শেমিং ফেমিং কোন কিছুতেই এখন আর ভয় পাচ্ছে না। ফেনীর ঐ মেয়েটা এম্বুলেন্সে শুয়ে ওর ভাইকে বলছে, আমি দশটা ছেলের সাথে কথা বলি তাতে কার কী? ওরা যতকিছুই করুক আমি প্রতিবাদ করবো। প্রিন্সিপাল আমার গায়ে হাত দিয়েছে আমি সবাইকে বলবো।

আপনি স্লাট শেইমিং করে থামাবেন আমাদের মেয়েদেরকে? গায়ে আগুন লাগিয়ে থামাতে পারেনি ঐ প্রিন্সিপালের লোকেরা। কথা আমাদের মেয়েরা বলবেই। সেই দিন গেছে বাঘের পেটে।

(৪)
ঐ মেয়েটার রেকর্ড করা স্টেটমেন্টটা আমি শুনেছি। আবেগে আক্রান্ত হয়ে যাই। সে তার নিজের মতো করে নোয়াখালীর ভাষায় নোয়াখালীর উচ্চারণেই কথাগুলি বলেছে। কী যে মিষ্টি লেগেছে কথাগুলি! শরীর পুড়ে গেছে, পুড়ে যাওয়ার যে কি যন্ত্রণা সে কি আপনি বুঝেন? জ্বলন্ত ম্যাচে আঙ্গুল লাগিয়ে সামান্য পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। সারা শরীরে সেই দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যেই সে প্রতিবাদের কথা বলছে।

আমার বুক কেঁপে ওঠে। ওরে, এ তো নিজেই একটা বহ্নিশিখা, ওকে তোরা কি পোড়াবি সামান্য আগুনে! শারীরিকভাবে ওকে আপনারা মেরে ফেলতে পারেন- কিন্তু এই বহ্নিশিখা নিভাতে পারবেন? পারবেন না।

বীর পুঙ্গবগণ, শোনেন, বরং এই বেলা নিজের পুরুষ পরিচয় নিয়ে লজ্জিত হতে শিখুন, তাতে যদি মানুষের কাতারে আসতে পারেন।

শেয়ার করুন:
  • 327
  •  
  •  
  •  
  •  
    327
    Shares

লেখাটি ৭২৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.