তারপরও হার মেনো না নারী!

0

মনজুরুল হক:

অফিসপাড়া। চেয়ার একজন নারী। ভদ্রলোক কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়ানো। ‘ম্যাডামের দেশের বাড়ি যানি কোথায়?’ কর্মকর্তা এধরনের প্রশ্নে বিরক্তবোধ করলেও বললেন- অমুক জেলা। ‘আরে বলেন কী আপা! আমার বেয়াই বাড়ি তো ওই জেলায়!’…. ফাইলে সই হওয়ার পর রাস্তায় বেরিয়ে লোকটি ফুটপাথে দাঁড়ালো। রাস্তা বন্ধ। নারী শ্রমিকরা মিছিল করছে। লোকটির মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো- ‘মাগিগুলার আর কাম নাই। এল্লিগাই এগোরে ঘরে আটকাইয়া রাখা দরকার.. শালার খা- মাগী!’

মোটামুটি এমন দৃশ্য এই শহরে, এই দেশের যে কোনো শহরে-গ্রামে দেখা যাবে।
সেই সমাজে, শহরে যখন ন্যায়সঙ্গতভাবেই টি-শার্টে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ স্লোগান লেখা হয়, তখন সেই স্লোগান আর শুধুই স্লোগান বা সচেতনামূলক বার্তা হিসেবে টিকে থাকে না। কারণ এই সমাজে পুরুষ জন্ম থেকেই শিখেছে নারী মানে শস্যক্ষেত। নারী মানে ভোগের বস্তু। নারী মানেই কমজোরি অবলা। নারী মানেই মেয়ে মানুষ। নারী মানেই পুরুষের খিদমতকারী, মনোরঞ্জনকারী। সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত পুরুষও যখন ‘ফ্রেইল্টি দাই নেম ইজ উয়্যোম্যান’ প্রবাদে বিশ্বাস রেখে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দেয়, তখন এই সমাজটাকে ঝরঝরে লক্কড়ঝক্কড় হয়ে যাওয়া লোকাল বাসের সঙ্গেই কেবল তুলনা করা যায়।

ফটো ক্রেডিট: নীল নীলাঞ্জনা

সেই সমাজে, যেখানে রাজনৈতিক কারণে চরম রেসিস্ট মন্তব্যকারী মাওলানা পুরস্কৃত হোন। যেখানে নারীদের নিয়ে চরম ঘৃণিত এবং অপমানজনক বক্তব্য দেওয়ার পরও জাতীয়ভাবে তাকে সম্মানিত করা হয়, তখন সেই সমাজটা যে পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে সেটা বুঝতে মহাকাশ বিজ্ঞানী হতে হয় না। নারী নিয়ে এই আধাখ্যাচড়া বর্বর সমাজে কী কী ট্যাবু আছে তা কম-বেশি সকলেই জানেন, তাই বলা বাহুল্য।

সেখানে যখন কয়েকজন সাহসী নারী টি-শার্টে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লিখে বাসে ওঠে, তখন মুহূর্তে তাদের কাউন্টার করার স্যাডিজম পয়দা হয়। সেটা হওয়াটাই এই বর্বর সমাজের প্রচলন, যে সমাজটাকে যুগ যুগ ধরে শিক্ষিত এবং আর্বানাইজড এলিট এবং পাওয়ারফুলরা লালন করে আসছে। টি-সার্টের যেখানটিতে বক্তব্য লেখা হয়েছে, সেই জায়গাটি কামাতুর বিকৃত মানুষকে আরও বেশি আকৃষ্ট করছে। করেছে। মুহূর্তেই তার ভেতরকার বিকৃতি চেগিয়ে উঠছে। যার সামর্থ আছে সে বিকৃত স্লোগান বানিয়ে ডেলিভারিও দিয়ে দিচ্ছে।

তাহলে কি প্রতিবাদ করা যাবে না? তাহলে কি নারী টি-শার্টে প্রতিবাদী স্লোগান লিখতে পারবে না? তাহলে কি নারী সরাসরি তার বিরুদ্ধে করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না?
আলবত পারবে। তবে ভেবে নিতে হবে তিনি বা তারা কোন সমাজে কোন পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন? এই দেশের যে কোনো শহরের দেওয়ালে ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না’ লিখে রাখলে রাতারাতি ‘না’টাকে মুছে দেয়া হয়। দেয় কারা? শিক্ষিত মানুষরা, যারা বাংলা-ইংরেজি-আরবী পড়েছে।

এই শহরে অন্তত ২০ থেকে ৩০ রকম পদ্ধতি ও কায়দায় পথে-ঘাটে, বাসে-রিকসায়, ট্রেনে-লঞ্চে, ফুটপাথ থেকে শুরু করে সর্বত্র নারীকে অপদস্থ করা হয়। হিউমিলিয়েট করা হয়। বিকৃতি যৌন রুচির ভিকটিম বানানো হয়। হরেক রকমভাবে মলেস্ট করা হয়। শুধুমাত্র ফুটপাথে একটা মেয়ের ঘাড়ে একটু ছোঁয়া দিতে পারলেও অর্গাজমের স্বাদ পায় কেউ কেউ।

সেখানে বিকল্প উপায় কী? এই ছবির বিষয়টা বিকল্প হতে পারে। আরও বেশ কিছু বিকল্প আছে। সেগুলো প্রয়োগ করা যেতে পারে। এবং তা প্রয়োগ করতে হবে সম্মানের সাথে চলাফেরা করতে গেলে। সরকার, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন কেউ করে দেবে না। যে পুলিশ সবাইকে রক্ষা করার ব্রত নিয়ে চাকরিতে যোগ দেয়, সেই পুলিশ থানার দায়িত্ব পাওয়ার পর একজন নারী বিচারপ্রাথী হলে তার সাখে কী আচরণ করা হয় তা বলতে একটা উপন্যাস লিখতে হবে!

তাই স্যাডিস্টদের আরও উসকে দিতে পারে, তাদের বিকৃতি দেখানোর সুযোগ দিতে পারে এরকম পদ্ধতি বাদ দিয়ে সেল্ফ প্রোটেকশন পদ্ধতি ব্যবহার করুন।

১। চেষ্টা করুন দলগত চলাফেরা করতে।
২। বাসের সিটে বসে থাকার সময় পুরুষাঙ্গ ঠেকানোর ‘কমন’ প্রাকটিসকারীদের সবার সামনে চার্জ করুন।
৩। প্রয়োজনে টেস্টিকল বরাবর লাথি মারুন।
৪। হাতে ভোমর জাতীয় ফুটিয়ে দেবার যন্ত্র রাখুন।
৫। বাসের হেল্পারকে নেমে দাঁড়াতে বলুন।
৬। ফুটপাথে গায়ে ঘষা দিলে তার জামা টান দিয়ে ধরুন। থাপ্পড় মারুন।
৭। মনে রাখবেন আপনি যে ভয় পেয়ে মারছেন না, অন্যায় মেনে নিচ্ছেন তার জন্য আপনাকে কেউ মেডেল দিচ্ছে না। ‘খুব ভালো মেয়ে’ বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছে না। সুতরাং চার্জ করুন। যে কোনো অবস্থায় একজন পুরুষ আপনাকে উল্টে মারতে আসার আগে ভাববে, ভয় পাবে, কারণ সে অন্যায় করেছে।
৮। সব সময় মনে রাখুন, স্যাডিজম কেবলমাত্র বাসযাত্রীর মধ্যে নেই। তা প্রায় সর্বত্র আছে। ফুটপাথের ভবঘুরে থেকে উচ্চ শিক্ষিত স্যারেরও আছে! তাই কাউকে বিশ্বাস করবেন না।
৯। আবার এই সমাজের এইসব আবর্জনার মধ্যেই আপনি আপনাকে সাহায্য করার লোক পেয়ে যাবেন।
১০। অন্য সকল উপায় হলো সেকেন্ডারি। আপনার প্রাইমারি টুলস হলো আপনার প্রখর ব্যক্তিত্ব। সেটার প্রয়োগ ঘটান। নিরাপদ থাকুন। সুস্থ্য থাকুন।

অতএব, “হে পুরুষ নারীর কোথাও মর্যাদাহানী হতে দেখলে সম্মিলিতভাবে তার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করে নিজেকে ‘বর্বর পুরুষ প্রজাতির’ প্রতিনিধি হওয়া থেকে রক্ষা করুন।”

শেয়ার করুন:
  • 34
  •  
  •  
  •  
  •  
    34
    Shares

লেখাটি ১৩৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.