একজন নুসরাত আর চেতনাধারীরা

0

ফাহমিদা খানম:

কিছুদিন আগে এক খবরে দলমত নির্বিশেষে অনেক পুরুষ একমতে এসে এক মেয়ের মুণ্ডুপাত করেছিলো, যারা মেয়েটার প্রতি সামান্য সদয় হতে বলেছিলো দেশের সব চেতনাবাজরা তাদেরকে প্রকাশ্যে গালি দিতেও বাঁধেনি, সেই গালি এতোই ভদ্র যে লিখতেও রুচিতে বাঁধছে!

নৈতিকতা, পরকীয়া ইস্যু নিয়ে উত্তাল ছিলো দেশ। দেশের মেয়ে দেশের ছেলে ফেলে বিদেশীর সাথে পরকীয়ায় মজেছে – বিরাট অপরাধ সবার কাছেই, ব্যাপারটা এমন সেই মেয়েই প্রথম পরকীয়া করেছে! প্রতিদিন স্বামীদের পরকীয়ার বলি হয়ে কতো মেয়ে মরছে, সেসব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই, কারণ এদেশে মেয়েরা বড়ো সস্তাদর কিনা তাই! কথাই তো আছে –“অভাগার গরু মরে, আর সুভাগার বউ মরে” – এই কথার মাঝেই মেয়েদের কতোটা তাচ্ছিল্য করা হয়েছে সেটাই কয়জন বুঝে?

কিছুদিন আগে আরও একটা খবর শুনে স্তব্ধ হয়েছিলাম – বারবার মনে হয়েছে এটা কীভাবে সম্ভবপর? বাবা কর্তৃক কন্যা ধর্ষণ, এতো নিচুতে যে কেউ নামতে পারে ভাবতে পারিনি। এক সৎ বাবার খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম —আর এখানে আপন বাবা?
তখন থেকেই চেতনাধারীদের খুঁজতে লাগলাম যারা মিতুর ব্যাপারে একমত হয়েছিল, এবার নিশ্চয়ই চেতনাবাজরা আবার রুখে দাঁড়াবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে! কী বোকা আমি? কোথাও কাউকে পাইনি বরং মায়ের চরিত্র নিয়েই কথা উঠেছে।

আমাদের দেশের পুরুষেরা দুই নৌকায় পা দিয়ে রাখেন— মুখে যতই বলুক না কেনো তারা আসলে মনের দিক থেকে এখনো আধুনিক হতেই পারেননি, তাই যেকোনো মেয়ের সাথে অন্যায় দেখলে পাশে দাঁড়ানো দূরে থাক কিছু হলেই আগে মেয়েটার পোশাক নিয়েই হামলে পড়েন, মেয়েটা কেনো একা বের হয়েছে সেটা নিয়ে জ্ঞান ঝাড়েন। আশ্চর্য ব্যাপার যে দেশে সত্তর থেকে দুই বছরের বাচ্চাও ধর্ষিতা হয় – সেখানে পোশাক কি অজুহাত নয়?

নিজেদের চোখ, মন যারা সংযত করতে পারে না, তারা অজুহাত খুঁজবেই। সবসময় মেয়েদের ভিক্টিম বানিয়ে ছেলেদের ধোয়া তুলসীপাতা বানানোর চেষ্টা যুগ, যুগ ধরেই চলে আসছে, এই ব্যাপারে পুরুষদের সাথে কিছু নারীদের সাপোর্ট আছে সেজন্যই আজও সমাজে পরিবর্তন আসে না।

এক টি–শার্ট নিয়েই আমাদের চেতনাবাজদের বিবেক আবার জাগ্রত হলো। কতোবড় সাহস মেয়েরা টি-শার্টে লিখে – ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’! মেয়েটি অন্য ধর্মের বা অযাচিত অনেক স্পর্শ পেয়েই কষ্টেই লিখেছে, যারা এই ব্যাপারটা সাপোর্ট করলো তাদের নামের পাশে আবারও বিশেষ বিশেষণ দিয়ে ফেললো চেতনাবাজরা, এটাই সহজ কাজ এদেশে – যেকোনো মেয়েকে চরিত্রহীন বানানো! সবাই লুফেই নেয় তাই একটা মেয়ে অযাচিত স্পর্শ পেয়ে চুপ থাকে, মদ্যপ, জুয়াড়ি, পরকীয়া স্বামীর মার খেয়েও চুপ থাকে –তাও চরিত্রে দাগ লাগানোকে ভয় পায়।

লেখক: ফাহমিদা খানম

একজন নুসরাত বোরকা পরেও রক্ষা কেনো পায় না? অশ্লীলতা যদি পোশাকেই হতো তবে তো তনু মরতো না, নুসরাত জীবন্ত জ্বলতো না৷। অশ্লীলতা তো পুরুষের মন ও মননে, সেটা কে দূর করবে? পুরুষের অভিধানে ভালবাসা বলতে ঐ একটাই শব্দ আছে, তাই রাস্তাঘাটে, ঘরে বাইরে নিজেকে নর্দমার কীট বানিয়ে আনন্দ নেয়। ভালো মেয়ে, ভালো স্ত্রীর সংজ্ঞা নিয়ে না ভেবে নিজেদের ভেতরবাড়ি উন্নত করার কথা ভাবে না কেনো? কতোটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হলে ইচ্ছে করেই একজনের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়? চকবাজার, বনানীর মানুষের আর্তনাদ কি ভুলেছি আমরা?

পৃথিবীতে পুড়ে মরার চেয়ে এতো কষ্ট আর নেই। মা- বাবার পর যে শিক্ষকের স্থান – সেই শিক্ষক নিজের প্রতিহিংসা মেটাতে মেয়েটির শরীরে আগুন লাগিয়ে দিলো? ছাত্রী তার কাছে এক তাল মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয় বলেই হয়তো পেরেছে। এই শিক্ষক কি জানে শিক্ষকতার মহান পেশাকেই সে নষ্ট করেছে? কোথায় নিরাপদ আমাদের দেশের মেয়েরা? রাস্তাঘাট ,স্কুল –কলেজ – কোথায়? আমরা কি মেয়েদের ঘরেই রাখবো, জগতের সব আলো থেকে বঞ্চিত করে? আমরা কি মেয়েদের পড়ালেখা করে স্বাবলম্বী করতে পারবো না? এইসব কুলাঙ্গার, অসভ্য, দাঁতাল শুয়োরের জন্য মেয়েরা আর কতো নিজেদের বলি দিলে আমাদের চেতনা জাগবে?

পোশাক যদি দায়ী হয় এক্ষেত্রে কী বলবেন? যদি বলেন দুই একটা ক্ষেত্রে এমন হতেই পারে, তবে বলি আমাদের মেয়েরাও দুই একটা ঘটনা ঘটাক! আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারুক, এসিডে ঝলসে দিক, দা দিয়ে কুপিয়ে আহত করুক। একজন অমানুষ কেনো বিয়ে করে? বাবা হয়? শিক্ষক হয়? যেখানে তারা মানুষের সংজ্ঞার ভেতরেই পড়ে না।

এই শিক্ষকের পাশেও অনেকেই দাঁড়িয়েছেন –যেখানে মেয়েটি স্পষ্ট করে শিক্ষকের নাম বলেছে – তবুও অনেক মানুষই এটাকে অন্য খাতে নেবার চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। এখন কী বলবেন চেতনাবাজরা? এই মেয়ে বোরকা পরেও কেনো নিস্তার পায়নি? আপনাদের মগজে মেয়েমানুষ মানে মেয়েমানুষ, একতাল মাংস —যাদেরকে দেখলেই আপনাদের শরীরে সুড়সুড়ি জাগে – তাদেরকে মানুষ আপনারা ভাবেননি কখনোই, তাইতো এখনো পড়েই আছেন টি –শার্ট নিয়ে, নুসরাতের আর্তনাদ, আকুলতা, অসহ্য যন্ত্রণা আপনাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না! এ কোন যুগ, এ কোন সভ্যতা?

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে পচন ধরেছে বুঝেও চুপ কেনো সবাই? আর কতো দেখবো, সহ্য করবো?
মিতুর ফাঁসি চাওয়া, টি-শার্ট পরা মেয়েদের যারা খুব সুন্দর, সুন্দর গালি উপহার দিয়েছেন আমি তাদের হন্যে হয়েই খুঁজছি, নুসরাত মেয়েটির পাশে এবার নিশ্চয় আপনারা আবারো এক জোট হবেন। নিজেকে শালীনতায় ঢেকেও যে কিনা রক্ষা পায়নি, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে, লড়তে বলেছে –“আমি সবার কাছে বিচার চাইবো”। সত্যি বলছি আমি চেতনাবাজদের হারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজছি, কই আপনারা? যারা মেয়েদের ভুল বের করেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন, তারা কই?

এই শিক্ষকের ফাঁসি চাই না, যে কষ্ট মেয়েটা পাচ্ছে — উনাকেও একই কষ্ট দিতে হবে তাও প্রকাশ্যেই। আমাদের মেয়েরা ধর্ষিতা হবে, আগুনে পুড়বে আমরা মায়েরা আর কতো সহ্য করবো? পুরুষেরা পুরুষ না হয়ে যদি একটু মানুষ হতো আমাদের মেয়েরা অন্তত নি:শ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারতো!

# “মানুষ নেই কোথায়? তবু তো মানুষেরই জন্যে মানুষের এতো হাহাকার!”
—-বুদ্ধদেব বসু

৯/৪/১৯

শেয়ার করুন:
  • 213
  •  
  •  
  •  
  •  
    213
    Shares

লেখাটি ৬৬৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.