আমার পোশাক নিয়ে আপনি সিদ্ধান্ত নেবার কে!

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

আমি ছোটতে একটু মোটা ছিলাম তাই বেশিদিন স্কার্ট পরতে পারিনি। স্কুল থেকেই পায়জামা আর ওড়না নিয়ে চলতে হতো। আমার জামাগুলি হতো অনেক ঢিলা। সবাই যা পরতো, আমি তা পরতে পারতাম না। কারণ একটাই, আমি মোটা! আমি স্কার্ট পরলে মোটা পা বের হয়ে যাবে! ওড়না না পরলে বুকগুলি উঁচু হয়ে থাকবে! সুতরাং পেট পর্যন্ত টেনে লম্বাভাবে ওড়না পরো! এভাবে কাপড় পরতে পরতে একটা সময় এটাই আমার অভ্যাস হয়ে গেলো। আমিও এই কাপড়ে খুশিই ছিলাম!

আমি যখন কলেজে উঠলাম তখন পড়লাম বিপদে। বাসে উঠে ওড়না সামলাতে পারতাম না, খুব সমস্যা হতো। তখন মিরপুর থেকে বকশিবাজার শুধু একটা বাসই যেত; ৯ নাম্বার, ভাড়া ছিল ৩ টাকা! ঐ বাসে থাকতো প্রচণ্ড ভিড়। প্রতিদিন মিরপুর ১২ নাম্বারে গিয়ে বাসে উঠতাম। কারণ এতো ভিড়ে বাসে অন্যত্র ওঠা যেত না।

লেখক: ফারজানা আকসা জহুরা

তা যাই হোক, বাসে উঠে টের পেলাম পুরুষ মানুষ কত খারাপ! তা ঐ বয়সে খারাপ মানুষদের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে করে কোনো লাভ হতো না। আর এতো বড় ওড়না সামলানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই সহজ আর স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বোরখা পরা শুরু করলাম। এবং বুঝতে পারলাম কেন আশপাশের বেশির ভাগ মেয়ে শুধু বাইরে গেলে বোরখা পরে!

আমার বোরখায় সবচেয়ে বেশি আপত্তি জানিয়ে ছিলেন আমার মা। তিনি বোরখা খুব অপছন্দ করতেন। আমাদের বংশে মানে, মায়ের দিকে, বাবার দিকে লোকজন কেউ তখন বোরখা পরতো না। তবে সবাই পর্দা করতেন, এবং বাড়তি চাদর ব্যবহার করতো। আমাকেও স্কুল ড্রেসের উপরে চাদর লাগিয়ে ঘুরতে হয়েছে। আমার মা সেই হুকুম দিয়েছিলেন। তাই যখন বোরখা পরা শুরু করলাম, তখন আমাকে সবাই বকাঝকা করলেন! কেন বোরখা পরতে হবে? চওড়া করে ওড়না পরলেই তো হয়। ব্লা ব্লা ব্লা!

কিন্তু এই চাদর বা ওড়না আমার সবসময় একটু ঝামেলার বলে মনে হয়েছে। আমার পছন্দ হতো না। আমার কাছে ওড়না সামলানো হলো সবচেয়ে বেশি বিরক্তিকর। আমি দেখতাম আমার আশপাশের বেশিরভাগ মেয়ে বুকের ওপরেই ওড়না পরতো। কিন্তু আমাকে বুক ঢেকে পেট পর্যন্ত নামিয়ে ওড়না পরতে হতো। কারণ এভাবে ওড়না পরতে হয়। বুক ঢেকে! এটা শালীন! তাতে আমাকে তো খালাম্মা লাগতোই, আর আশপাশের সবাই হাসতো!

আমার জীবনে পোশাক নিয়ে নাজেহাল, হাসাহাসি বহু পুরাতন একটি বিষয়। এখন এনিয়ে লেখার সুযোগ পেয়েছি বলেই লিখি। কিন্তু এই সমস্যা বহু আগে থেকেই শুরু আমার জীবনে। কখনো গায়ের রং এর জন্য, কখনো মোটা বলে, কখনো শালীন অশালীন বলে, পোশাক নিয়ে কথা শুনতে হয়েছে।

তা যাই হোক, বোরখা পরতে পরতে বোরখা আমার প্রিয় পোশাক হয়ে গেলো। কারণ বোরখা সহজে পরা যায়। সাজসজ্জা করতে হয় না। জামা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। আর সবচেয়ে বড় বিষয়, বোরখা পরলে ওড়না নিয়ে ঝামেলা করতে হয় না!

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন শুরু হলো আরেক অভিজ্ঞতা। বোরখার জন্য বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী আমাকে গ্রামের ক্ষেত মনে করতো এবং হাসাহাসি করতো। বোরখা নিয়ে শুধু ছাত্রছাত্রীদের না, শিক্ষকদেরও প্রচণ্ড সমস্যা ছিল। একবার এক ছাত্রীকে প্রথম বর্ষের ভাইবা পরীক্ষার সময় মাথার কাপড় খুলতে বাধ্য করেন কয়েকজন শিক্ষক। সেদিন মেয়েটা খুব কান্নাকাটি করেছিল। কিন্তু কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি! অবশ্য বোরখা খুব খারাপ পোশাক, তা নিয়ে এমনটা করা যেতে পারে, কী বলেন আপনারা?

এখন যখন কেউ খোলামেলা পোশাক পরার জন্য ঝগড়াঝাঁটি করে, বা যারা তাকে কটূক্তি করে, এসবের বিরুদ্ধে যখন কোনো কথা হয়, তখন বেশ ভালো লাগে। স্বাধীনভাবে পোশাক পরার অধিকার সবার থাকা উচিৎ। আমি পোশাকের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কে কী পোশাক পরবে তা ব্যক্তিগত ব্যাপার। তা সে ধর্ম পালনের জন্য হিজাব বোরখা হোক, আর স্বামীর মঙ্গল কামনায় শাঁখা সিন্দুর হোক। সেখানে অন্যের মতামত দৃষ্টিকটু। তবে কেউ যদি নিজে শাঁখা সিন্দুর পরে, আমার মাথায় কাপড় বা হিজাব নিয়ে কথা বলতে আসে, তাতে আমি বিরক্ত হবো।

যাই হোক, পরে অবশ্য সবসময় বোরখা পরতাম না, কিংবা পরার দরকার ছিল না। কিন্তু যখন চাকরি করতে শুরু করলাম, তখন আবার মাঝে মাঝে বোরখা পরতাম। তবে সবসময় না। খেয়াল করে দেখেছি, বোরখা পরে গ্রামে গেলে বেশ সুবিধা হতো। কেউ বিরক্ত করতো না। আবার যখন তখন লোকাল বাসে ওঠা, দূরে যাত্রা করতেও আরো অনেক সুবিধা হতো। এছাড়াও বোরখার জন্য আশপাশের লোকজনের সহযোগিতা পেতাম। সবচেয়ে বড় কথা, বোরখাতে আমি সবসময় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম।

পোশাক নিয়ে ৩২ বছর বাংলাদেশে কাটিয়ে বিদেশে এসে ভাবলাম; যাক বাবা বেঁচে গেছি, পোশাক নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই। কী পোশাক পরলাম তা নিয়ে আর ভাবতে হবে না। আসলেই কিন্তু বিদেশে পোশাক নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। আপনি সব ধরনের পোশাক পরে বাইরে ঘুরতে পারবেন। রাষ্ট্র আপনার নিরাপত্তা দিবে।

কিন্তু না, সমস্যা আছে! মানুষ আপনার পিছন ছাড়বে না!

সেদিন এক ভাবি খুব দুঃখ করলেন, বললেন তার ১৭ বছরের মেয়ে হিজাব পরে না, তাই যাদের সাথে তিনি মেলামেশা করেন, তারা নাকি এ নিয়ে কথা বলে। সবার সাথে মিশতে গেলে তো সবার কথা শুনতে হবে। তাই তিনি দুঃখী!

মেয়েটার জন্য দুঃখ হলো। নিশ্চয় এমন পরিবার এদেশে অনেক আছে, যারা আল্লাহর ভয়ে না, সমাজের ভয়ে হিজাব পরে! এই চাপিয়ে দেওয়া জিনিসটা খারাপ। পোশাকের ব্যাপারে কেন নিজের পছন্দ থাকবে না?

সেদিন এক ভাবি বললেন, আমি পিঠ খুলে রাখি! মানে মাথায় বুকে কাপড় দেই, কিন্তু পিঠে আমার ওড়না থাকে না, সুতরাং আমার পর্দা হয় না! আমার স্বামীকে প্রশ্ন করলাম, সে শুনে বলে, তোমার কি পিছনে দুটো আছে নাকি, যে পিছনে ওড়না দিতে হবে?
আরেকজন শোনালেন, পালাজো মানে ঢিলা পায়জামা পরে পায়ের গোঁড়ালি বের করে রাখলে পর্দা হয় না। আরেকজন জানালেন, চেহারা বের করে রাখলে পর্দা হয় না। প্যান্ট পরলে পর্দা হয় না! ব্লা ব্লা ব্লা!

অন্যদিকে ফেসবুকেও হিজাব নিয়ে চলে নানা তর্ক বিতর্ক! কেন হিজাব পরবে? কী দরকার হিজাব পরার? হিজাব না পরলে কী হয়? বাস্তবেও তারা হিজাব, বোরখা, নানা পোশাকে নানা আলোচনা। ভাবটা এমন পোশাক পরতে হলে তাদের অনুমতি পত্র লাগবে। এদের অনুমতি ছাড়া আপনি যাই পরবেন তাই ক্ষত। আপনি পরাধীন। আপনি অন্ধকার যুগের মানুষ! অথচ কত মানুষ দেখেছি আধুনিক পোশাক পরেও বর্বর চিন্তা করে! অন্যের স্বাধীনতায় হতক্ষেপ করে, অধিকার হরণ করে কীভাবে আধুনিক হওয়া যায়!

আসলে বাংলাদেশের পরিবেশ এমন যে যেখানে এক শ্রেণির মানুষ বোরখা নিয়ে মশকরা করে। আবার আরেক শ্রেণির মানুষ বোরখা বা পর্দা না করলে গালাগালি করে।

বাংলাদেশী মেয়েরা তাহলে কী পরবে? তারা বোরখা পরলে সমস্যা। স্কার্ট পরলে সমস্যা। প্যান্ট পরলে সমস্যা। শাড়ি পরলেও সমস্যা, যদি পেট দেখা যায়? আর সালোয়ার কামিজ? সবচেয়ে বিরক্তিকর পোশাক! সারাক্ষণ ওড়না সামলাও। সব পোশাকে কারোর না কারোর সমস্যা!

স্বাধীন দেশে আমার সামান্য পোশাক পরার স্বাধীনতা নেই! আমার ভালো লাগা বলে কিছু থাকবে না! সমাজ ও লোকেরা আমাকে ঠিক করে দিবে আমি কী পোশাক পরবো?

কেন ভাই? আমার পোশাক নিয়ে আপনাদের এতো গবেষণা কেন? আমার শরীর, আমার পছন্দ, আমার স্বাধীনতা। আমাকে ঠিক করতে দিন, আমি কী পরবো। আমার শরীর, আমি ঠিক করবো কতটুকু ঢাকবো আর কতটুকু বের করবো, কী ধরনের পোশাক পরবো, কী রং এর পোশাক পরবো!

ইচ্ছে হলে বোরখা পরবো, ইচ্ছে হলে প্যান্ট পরবো। ক্ষেত লাগলে আমাকে লাগবে, চলতে সমস্যা হলে আমার হবে। দোজখে গেলেও আমি যাবো। কৈফিয়ৎ দিতে হলে আল্লাহকে দিবো। আমার পোশাকের চিন্তা আমার, আমার চিন্তা আমাকে করতে দিন। আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা, আমার পছন্দের ব্যাপারে নাক গলানো আপনাদের কতটুকু উচিৎ?

ফ্রান্স ২৪ ০৮ ২০১৮

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 484
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    484
    Shares

লেখাটি ১,২৪৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.