টি-শার্টের ভাষা এবং পুরুষ পুঙ্গবদের বিকৃতি

0

প্রবীর কুমার:

কোন বিষয়ে দ্বিমত হলেই গালাগাল-ব্যক্তি আক্রমণ অনুচিত; এবং ওই বিষয়ে কাউকে হুটহাট করে ভিলেইন হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

১. যিনি টি-শার্টে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লিখেছেন, তিনি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে কিংবা ভিড়ের মধ্যে মেয়েদের নিয়মিত যৌন হেনস্থার কথা মাথায় রেখেই ওটা লিখেছেন। বিকৃত-যৌন কাতর যে পুরুষগুলো সুযোগ পেলেই মেয়েদের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, বিভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে তাদের থেকে নিরাপদ থাকতে লিখেছেন, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের ভাবনা থেকে লিখেছেন।

ঘর থেকে মেয়েরা বের হলেই মনের মধ্যে একটা আতঙ্ক নিয়ে বের হয়, কখন যে পুরুষের বাজে কথা-ইঙ্গিত শুনতে হয়, কখন যে নষ্ট পুরুষগুলো শরীরে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে! প্রায় প্রতিটি মেয়ের জীবনেই এমন ঘৃণ্য-কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা আছে। অসভ্য পুরুষে ভরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও দেশের ক্ষেত্রে টি-শার্টের ওই লেখাটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সঠিক এবং সমর্থনযোগ্য।

২. আবার এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর বিষয় আছে। আমরা যখন পুরুষের মতো নারীর অবাধ স্বাধীনতা এবং নারীর শরীরের মুক্তি চাচ্ছি, নারীর শরীরকে যেন মোল্লাতান্ত্রিক ভাবনার মতো ট্যাবু করে না রাখা হয় সে ইচ্ছে পোষণ করছি, তখন টি-শার্টে লেখা কথাগুলো নারীর শরীর নিয়ে প্রচলিত ট্যাবুকে মনে করিয়ে দ্যায়, নারীর শরীর ভিন্ন আগ্রহের তা মনে করিয়ে দ্যায়।

মূলত, উপরের ১ এবং ২ নাম্বার পয়েন্টের সবাই-ই নারীদের নির্বিঘ্ন চলাফেরার বা নারী অধিকারের পক্ষে। এখানে কেউ কারো শত্রু নয়, শুধু ভাবনার ধরন ভিন্ন। ২ নাম্বার পয়েন্টে কেউ বিশ্বাস করলেই সে নারীবাদের বিরুদ্ধে, কিংবা তার মুখোশ খুলে গ্যালো- এমন নয়। আবারও এখানে খুব স্পষ্ট করেই মনে রাখা উচিত— এই ১ এবং ২ নাম্বার পয়েন্টের মধ্যে কেউই নারীর অধিকার-সম্মানের বিরুদ্ধে নয়, সুযোগ সন্ধানী নয়।

আসলে বিপত্তিটা হচ্ছে নিচের ৩ নাম্বার পয়েন্টে। এখানের মানুষগুলো উপরে উল্লিখিত মানুষগুলো থেকে একদম ভিন্ন। এদের সাথে তাদের মেলানো একদম উচিত হবে না।

৩. সমাজে এমন মানুষগুলোর সংখ্যাই বেশি, যারা চায় না নারী স্বাধীনভাবে চলুক। নারী ও তাদের শরীরের প্রতি জঘন্য-বিকৃত ধারণা নিয়ে এরা জীবন পার করে। এরা সুযোগ পেলেই নারীকে ছোট করবে; জঘন্য কথা বলে, বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করে তাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করবে।

টি-শার্টে লেখা কথাটার বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষগুলোর মন্তব্য এবং লেখা পড়ে, ফটোশপড ছবি দেখে স্রেফ একটা অসুস্থ, অশিক্ষিত, অসভ্য, যৌনকাতর জাতি চোখের সামনে ভেসেছে। তাদের জ্বলুনি স্পষ্ট করে দিয়েছে তাদের ভিতরের মানসিক বিকৃতি-লালসা।

সবশেষে একটা বিষয় এবং পার্থক্য আমাদের ভালো করে বোঝা উচিত— যাদের কাছে শুধু টি-শার্টের লেখাটা যৌক্তিক মনে হয়নি এবং যারা লেখাটাকে নারীর শরীর নিয়ে ট্যাবু মুক্তির অন্তরায় ভেবেছে, তারা বিকৃত মনোভাবের নয়, তাদের মুখোশ খুলে গ্যালো এমনও নয়। তারাও নারীর অবাধ-নির্বিঘ্ন চলাচল চায়।

তবে তারাই বিকৃত-লালায়িত মনোভাবের, যারা টি-শার্টের লেখা নিয়ে জঘন্য ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছে, বিভিন্ন প্রকার নোংরা ইচ্ছে পোষণ করেছে, টি শার্টের লেখাটিকে নোংরা ভাষায় ফটোশপড করেছে, লেখাটাকে ব্যবহার করে নারীর প্রতি লালিত বিদ্বেষ প্রকাশ করেছে।

শেয়ার করুন:
  • 164
  •  
  •  
  •  
  •  
    164
    Shares

লেখাটি ৫৫৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.