পোড়াকপালী মেয়েটা স্লাট শেইমিং থেকে রক্ষা পাবে তো!

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

পোড়া কপালী মেয়েটার কথা বলতে চাচ্ছি, হতভাগীটা এখন আগুনে পুড়ে হাসপাতালে শুয়ে আছে, আক্ষরিক অর্থেই পোড়া কপালী। কী করেছিল মেয়েটা? একটা মাদ্রাসায় পড়ে সে, কলেজের সমমানের মাদ্রাসা, প্রিন্সিপাল হুজুর ওকে ডেকে নিয়ে ওর সাথে জবরদস্তি করতে চেয়েছে। প্রিন্সিপালের অশোভন প্রপোজিশন মেয়েটা প্রত্যাখ্যান করেছে আর যৌন হয়রানির জন্যে পুলিশের কাছে মামলা করেছে। এইটাই ওর অপরাধ।

প্রিন্সিপাল হুজুরের পক্ষের লোকজন যারা রয়েছে, ওরা প্রিন্সিপাল হুজুরের মুক্তি দাবি করে মিছিল টিছিল করেছে। গতকাল রাতে একাত্তর টেলিভিশনে থাকার ওসি সাহেবের কথা শুনেছি, তিনি বলেছেন যে সেখানে ছাত্রলীগের কিছু নেতাও সংশ্লিষ্ট ছিল। ওদের দাবী প্রিন্সিপাল হুজুরের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে হবে। এগুলি কয়েকদিন আগের ঘটনা। গতকাল মেয়েটি যখন পরীক্ষার হলে গেছে, সেখান থেকে ওকে পাশের এক বিল্ডিংএর ছাদে বোরকা দস্তানা পরা কয়েকটা মেয়ে ওকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্যে চাপ দেয়। মেয়েটা ওদের চাপে নতি স্বীকার করেনি বলে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লগিয়ে দেয়।

আপনারা প্যাটার্নটা জানেন। এরপর মেয়েটার ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে টান মারবে প্রিন্সিপাল হুজুরের পক্ষের লোকেরা। ওর প্রেম সম্পর্ক এইসব যদি থাকে সেগুলি নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হবে কিছুসংখ্যক লোক। আর দেশের সিংহভাগ মানুষ চিৎকার করে বলবে, মেয়েটার চরিত্র খারাপ ছিল ইত্যাদি। না, এইরকম ভদ্র ভাষায় বলবে না- কিরম ভাষা ওরা ব্যবহার করবে আর কীসব শব্দ ব্যবহার করবে সেগুলিও আপনারা জানেন।

শরীরের শতকরা পঁচাত্তর ভাগের বেশি পুড়ে গেছে হতভাগীর। এইরকম পোড়া নিয়ে মানুষের পক্ষে বাঁচা কঠিন। এই মেয়েটি সংগ্রামী আছে, লড়াকু আছে- ও যদি এই যাত্রায় বেঁচে যায় মনে করবেন ওর এই লড়াকু চেতনার জন্যেই সে বাঁচবে। কিন্তু এই বাঁচাটা ওর কেবল শারীরিক অস্তিত্ব বজায় রাখাই হবে। আমরা এই সমাজের পুরুষরা, এবং আমাদের দাসী প্রকৃতির নারীরা, আমরা ওকে বাঁচতে দিব না। শারীরিকভাবে যদি সে বেঁচেও যায়, নানাপ্রকার শেমিং করে ওকে আমরা মেরেই ফেলবো ইনশাল্লাহ।

শোনেন, আপনারা যারা ‘ফেমিনিস্ট’ নন বা কোন না কোনোভাবে ফেমিনিজম ব্যাপারটাকে একটু বাড়াবাড়ি মনে করেন, আপনারা কি মনে করেন যে, এই মেয়েটার সাথে যা ঘটেছে এটা একটা ব্যতিক্রম ধরনের ঘটনা? বা আপনারা কি মনে করেন যে নারী প্রতি এই অপরাধগুলি- ধর্ষণ হোক বা যৌন নিপীড়ন হোক- এগুলি কেবল একজন দুইজন মানুষের মানসিক অসুস্থতার ফল? একটু ভেবে দেখেন। এই যে এই মেয়েটার সাথে এখানে যেটা হয়েছে সেটা কি ব্যতিক্রমী একটা অস্বাভাবিক ঘটনা? নাকি নারীকে আমরা সমাজে যে স্ট্যাটাসে রেখেছি তার সাথে এইসব ঘটনা পুরোটাই সঙ্গতিপূর্ণ এবং অনিবার্য?

আমাদের সমাজে নারীর স্ট্যাটাসটা কী? মেয়েমানুষ বা মেয়েছেলে বলি আমরা- আসলে নারীকে কী মনে করি? না, ধর্মগুলি নারীকে পুরুষের অধিনস্ত করেছে, সেইসব কথা বাদ দেন- সেগুলি তো এক্সট্রিম কথা আরকি। এমনিতে আধুনিক দেখতে যারা এবং নারীকে সম্মান করার কথা যারা বলেন এদের চোখেই নারীর অবস্থানটা কি? এইসব আধুনিক এবং সংবেদনশীল পুরুষ এরাও কি নারীকে ওদের সমান মানুষ মনে করেন? নাকি নারীকে পুরুষের চেয়ে একটু কম মানুষ মনে করেন? নাকি নারীকে নিতান্ত পুরুষের ভোগের বস্তু মনে করেন? ভেবে বলেন।

আপনার নিজের পরিবার এবং আশেপাশের পরিবারের দিকে তাকান। আধুনিক ধরনের শিক্ষিত পরিবারগুলির দিকেই তাকান। কন্যা সন্তান ও পুত্র সন্তানকে কি আপনারা এক নজরে দেখেন? না, দেখেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলগুলিতে মেয়েদের চলাচলের জন্যে সময়সীমা আছে না? ছেলেদের হলগুলিতে আছে? নাই। কেন নাই? মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আপনারা চিন্তিত। ছেলেদের নিরাপত্তা নিয়ে কেন চিন্তিত নন আপনারা? মেয়েরা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ছেলেরা নষ্ট হবে না? না, ছেলেরা নষ্ট হবে না। কিভাবে?

একটা মেয়ে যদি বিবাহের আগে এক বা একাধিক ছেলের সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হয় তাইলে সে নষ্ট হয়ে যায়। আর যে ছেলেটির সাথে বা ছেলেগুলির সাথে সে এই কাজগুলি করেছে ওরা? ওরা নষ্ট হবে না। এইটাই নারীর স্ট্যাটাস। ঘরেও এই একই ঘটনা। পুত্র যদি বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্ক করে- ও তো বেটাছেলে। আর মেয়েটা যদি করে? পরিবারের মাথা কাটা যায়।

তাইলে স্ট্যাটাসটা কী দাঁড়ায়? নারী হচ্ছে একটি রসগোল্লা অথবা এক বাটি পায়েস। এই তো?

এটার ফলাফল কি? এটার অনিবার্য ফলাফল হচ্ছে একজন পুরুষ যখন একটি নারীর দিকে তাকায় সে আসলে একটি রসালো খাবার জিনিসের দিকে তাকায়। পরনারী বলে একটা কথা আছে আমাদের ভাষায়- এটার অর্থ হচ্ছে ঐ পণ্যটা তোমার নয়, অপরের। পরনারীর দিকে হাত দেওয়া মানে? খুব বেশী ভয়াবহ কোন অপরাধ সেটা নয়, অন্যের মাল চুরি করে খেয়ে ফেলার যতটুকু দোষ, তার চেয়ে একটু বেশী আরকি। তো এই যদি হয় আপনার সমাজে নারীর স্ট্যাটাস, তাইলে মাঝে মাঝেই যে লোকে একটু অন্যের রসগোল্লা খেয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে সেটাকে ব্যতিক্রমী ঘটনা কি করে বলবেন? বরং এইটাই স্বাভাবিক।

আপনি যদি নারীকে পুরোপুরি আপনার মতোই একজন মানুষ মনে করেন তাইলে সে না হয় তার কনসেন্ট বা সম্মতিটা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতো। নারীকে তো আপনার পূর্ণাঙ্গ মানুষ বলছেন না, সুতরাং তার সম্মতির আর গুরুত্ব কী? ঐ যে দেখেন যে ফেসবুকে একদল লোক বলে যে, মেয়েটা ওড়না না পরলে ছেলেরা তো তার বুকে হাত দেবেই। ওদের এই কথার পেছনে দর্শনটা কী? দর্শনটা তো হচ্ছে এইটাই- নারী তো মানুষ না, ওর আবার সম্মতির দরকার কী, ওর বুকের আভাস দেখে ইচ্ছে হয়েছে, ছুঁয়ে তো দিতেই পারি।

লেখক: ইমতিয়াজ মাহমুদ

আর এইটার একটা বড় অভিঘাত হচ্ছে সার্বিকভাবে নারীর জীবনযাপন বিঘ্নিত হয়। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের ভয়ে নারীর চলাচল সীমিত হয়ে যায়। নারীর কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে যায়- ফিগারেটিভলিও আর মেটাফরিক্যালিও। নারীকে তখন ‘মডেস্ট’ হতে হয় বাধ্য হয়ে। অর্থাৎ নারীকে বাধ্য হয়েই আপনাদের পছন্দমতো মেয়েমানুষ হতে হয়, মানুষ হবার সাহস আর পায়না।

এই যে কথায় কথায় মেয়েদেরকে স্লাট শেইমিং করা হয়- কোন মেয়ে যদি পুরুষের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করে তাইলে তো কথাই নাই- এইটা হচ্ছে আমাদের অর্থাৎ পুরুষদেরই একটা টুল বা যন্ত্র বা আওয়ার। এই যে আমাদের পোড়াকপালী মাদ্রাসা ছাত্রীটি, হতভাগী বাঁচবে কিনা কে জানে- ওকেও দেখবেন এখন স্লাট শেইমিং করা হবে। ওর যদি একটা প্রেম থাকে বা প্রেম না হলেও এমনিই যদি ওর দুই একটা ছেলের সাথে একটু ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থাকে, সেগুলি ওরা খুঁজে বের করবে আর সেগুলি দেখিয়ে দেখিয়ে বলবে, এই যে দেখো, ও তো একটা নষ্ট মাল, প্রিন্সিপাল হুজুরের কোন দোষ নাই।

ভালো লাগে না আর এইসব বলতে। তবুও বলি। কেন বলি জানেন? বলি ছোটদের জন্যে, তরুণদের জন্যে। আমরা বুড়ো হাবড়ারা তো আর পাল্টাবো না, সমাজকে পাল্টানোর লড়াইয়ে আমরা আর যাবো না। কিন্তু তরুণরা পাল্টাবে, ওদের উপর ভরসা রাখি। একজন দুইজন ছেলেমেয়েও যদি স্পষ্ট কণ্ঠে বলে যে না, নারীও মানুষ এবং পুরুষের চেয়ে কম মানুষ নয়, তাইলেও তো কিছু কাজ হলো আরকি!

(লেখাটা লেখকের টাইমলাইন থেকে নেয়া, ঈষৎ সংক্ষেপিত)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 857
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    857
    Shares

লেখাটি ৩,৫৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.