যুগে যুগে নির্ভয়ারা মরে গেলেও হেরে যায় না

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

আশা করি ইতোমধ্যে নুসরাতের চরিত্র, চালচলন, পোশাকের শালীনতা, প্রেমিক থাকা না থাকা এসবের চুলচেরা বিশ্লেষণে নেমে পড়েছে বিশিষ্ট পুরুষতন্ত্র।
নুসরাত নামের মেয়েটির কথা বলছি, প্রকাশ্য দিবালোকে যার শরীর আগুনে ঝলসে দেয়া হয়েছে। শরীরের ৭৫ ভাগ পুড়ে গেছে মেয়েটির। এ অবস্থায় বাঁচার আশা ক্ষীণ।

ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে নুসরাত। তার আগে থেকেই পাঞ্জা লড়াই শুরু হয়েছে বৈরী সমাজের সাথে। একজন ছাত্রের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হওয়া উচিৎ তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঠিক সেখানেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছিলো নুসরাত, সেখানেই তার জন্য ওঁৎ পেতে বসেছিলো মরণফাঁদ।

শরীরে শতকরা ৭৫ ভাগ পোড়াক্ষত নিয়েও বাঁচার আকুতি জানিয়েছে নুসরাত

গত ২৭ মার্চ আলীম পরীক্ষার্থী নুসরাত যৌন হয়রানির শিকার হয় সোনাগাজী ইসলামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলা দ্বারা। এ অন্যায়ের প্রতিবাদে নুসরাতের পরিবার থানায় মামলা করে। অভিযোগ তুলে নেবার জন্য প্রথমে শুরু হয় হুমকি ধমকি।

ফেনীর সোনাগাজীতে সেই মাদ্রাসাতেই আলীম পরীক্ষা দিচ্ছিলো নুসরাত। বোনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভাই তাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে বসিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতো। পরীক্ষা শেষে ভাইয়ের সাথে বাড়ি ফিরতো মেয়েটি। পরীক্ষার হল থেকে মিথ্যে বলে ছাদে ডেকে নিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মেয়েটিকে। বোনকে কারা যেন মারধর করছে জানতে পেরে ভাই সেখানে ছুটে গেলে তার চোখের সামনেই নুসরাতকে অগ্নিদগ্ধ হতে দেখে। সেখানে উপিস্থিত চারজন অপরাধীর প্রত্যেকেই ছিলো বোরকা, হাত মোজা এবং কালো চশমা পরিহিত। হুজুরের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেবার জন্য নানাভাবে শাসিয়ে, পিটিয়ে ক্ষান্ত হয়নি তারা। শেষ পর্যন্ত তারা নুসরাতের শরীরে কেরোসিন বা পেট্রোল জাতীয় কিছু ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

পৈশাচিক এ ঘটনা কোনো বর্বর যুগের নয়, এ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে একবিংশ শতাব্দীতে, এই বাংলাদেশে। অপরাধীর আস্পর্ধা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে সেটি যেমন ভেবে দেখার বিষয়, সেই সাথে ভিকটিম ব্লেমিং আর ধর্ষক, খুনি তথা অপরাধীর পক্ষে প্রকাশ্যে সাফাই গাইবার মতো লোকে ক্রমশ লোকারণ্য এ সমাজ।
বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণ পরিবহন, কর্মস্থল – কোথায় একটু স্বস্তিতে, নিরাপদে থাকতে পারবে মেয়েগুলো – জানতে ইচ্ছে করে। ধর্ষণের মতো অপরাধকে ঢাকতে শুরু হয়ে যায়, মেয়ের পোশাক কী ছিলো, সে ধর্ম-কর্ম – পর্দা করতো কিনা!

টিশার্টে এই লেখা নিয়ে চলছে তুমুল সমালোচনা

গণ পরিবহনে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে “গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না” লেখা সম্বলিত টি শার্ট গায়ে দিয়ে দুজন মেয়ে রাস্তায় নামাতে এক বিশেষ শ্রেণী জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে খিস্তিখেউড় কিছু বাদ রাখলেন না। প্রশ্ন জাগে, প্রতিবাদ জোরালো হলে এতো ভয় লাগে কেন, গায়ে এতো জ্বালা ধরে কেন? যদি আপনি/ আপনারা পথেঘাটে অন্যতম যৌন নিপীড়ক বা তাদের সমর্থক না হয়ে থাকেন তাহলে এ প্রতিবাদে আপনার/আপনাদের এতো জাত যায় কেন?

টিশার্ট পরে প্রতিবাদ জানানো অশ্লীল মনে হলো, টিশার্টের লেখা পড়ে লজ্জায় মাথাকাটা গেল।
যে অন্যায়ের প্রতিবাদে কথাগুলো লেখা হলো তার বেলা তো লজ্জিত হতে দেখি না! গলা উঁচিয়ে কিছু বলতে শুনি না কোনোদিন!

আমাদের মেয়েরা নাকি পোশাক পরে আমেরিকার মতো, আর বিচার চায় সৌদি আরবের কায়দায় – তাই তাদের ছবি ফটোশপ করে নোংরা কথা লিখে ছড়ানো হলো, যত গালিগালাজে জন্ম ও বংশের পরিচয় দেয়া যায় তার কিছুই বাদ থাকলো না। অথচ মেয়েদের শরীরের আনাচে-কানাচে হাত দিয়ে বিকৃত আনন্দলাভের জন্য এই গণপরিবহনেই যখন অভিনব কায়দায় ব্লেড দিয়ে কামিজ, পায়জামা কাটা হয়, বাসের মধ্যে প্যান্টের জিপার খুলে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করা হয়, ভিড়ের মধ্যে শরীরে চাপ দিয়ে কানের কাছে অশ্লীল শব্দ বিড়বিড় করা হয় তখন কোন গর্তে বাস করেন আপনারা?

চাকরির পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে রূপাকে বাসের ড্রাইভার -হেল্পার মিলে ধর্ষণের পর হত্যা করে ফেলে গেলো। সেটা কোনো অপরাধ মনে হলো না, মনে উঠলো, “কোনো সভ্য মেয়ে কী রাতে একা বাসে চড়ে?” অমুকের চরিত্র ভালো ছিলো না, তমুকের পোশাক ঠিক ছিলো না, অমুকের তমুক প্রেমিকের সাথে রাতে বাইরে বের হয়েছিলো – এবারে তাহলে প্রশ্ন রেখে যাই, নুসরাত তো মাদ্রাসায় পড়তো, পর্দা মেনে চলতো, প্রেমিকের সাথে না সে ভাইয়ের হাত ধরে দিনের আলোতে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়েছিলো, তবে তাকে কোন দোষে মদ্রাসার অধ্যক্ষের হাতে যৌন হেনস্থার শিকার হতে হলো, প্রতিবাদ করায় কেন তাকে অগ্নিদগ্ধ হতে হলো? নুসরাত তো আপনাদের কথা অনুযায়ী সৌদি আরবের মতোই ”সভ্য” ভাবে চলাফেরা করেছিলো, তাহলে তো সৌদি আরবের কায়দায় হলেও বিচার চাইতে বাধা থাকার কথা না। তাহলে কোথাও কোনো “শালীন” প্রতিবাদ নেই কেন?

লেখক: ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী

যৌন হয়রানি, নিপীড়ন, ধর্ষণের প্রতিবাদে সোচ্চার হলে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয় যে সমাজ, তারাই এখন মুখে কুলুপ এঁটে দেহের ৭৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নুসরাতের মৃত্যুযন্ত্রণা প্রত্যক্ষ করে চলেছে। এও বোধহয় এক বিকৃত বিনোদন।
ধর্ম, পোশাক আর চরিত্রের দোহাই দিতে দিতে আদতে বিবেকের শতভাগ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে !

শুনেছি শ্বাসনালি অবধি পুড়ে যাওয়া নুসরাত অপরাধীর বিচার চেয়েছে। নুসরাত, তুমি জেগে থাকো, জাগিয়ে রাখো। বিচার চাই আমরাও।
নুসরাতরা যুগে যুগে আমাদের নির্ভয়া। নির্ভয়ারা মরে গেলেও হেরে যায় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 340
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
    340
    Shares

লেখাটি ৮৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.