সমকাম, ব্রুনেই ও মুসলিম বিশ্বের ভবিতব্য

0

সরিতা আহমেদ:

ব্রুনেই – বোর্নিও দ্বীপের একটি ছবির মত সুন্দর দ্বীপ রাষ্ট্র। মালয়শিয়ার সাথে বেশিরভাগ সীমানা ভাগাভাগি করা সমুদ্রের ফেনিল জলরাশি বেষ্টিত এই দ্বীপটি বোর্নিও-র প্রথম এবং একমাত্র সার্বভৌম দ্বীপ-রাষ্ট্র ।
মালয়শিয়া সহ বাকি মুসলিম দেশেগুলোর মতোই এই দেশেও সুন্নি-ইসলামি শাসন কায়েম, আরব সভ্যতার দেশগুলোর মতো এখানেও আছে সুলতানি শাসনও।
এর মধ্যে দোষের কিছু নেই। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক , পাকিস্তান, আফগানিস্থান, বাংলাদেশ ইত্যাদির মতো মুসলিম দেশগুলির সংখ্যা সারাবিশ্বের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ। ব্রুনেইও সেই রকমই ছিল।

হ্যাঁ ছিল। চলতি মাসের প্রথম দিন থেকে বদলে গেল এর চরিত্র। অষ্টম – নবম শতাব্দীতে চালু মানবসভ্যতার সবচেয়ে নৃশংস এবং অমানবিক শরিয়ত আইন কঠোরভাবে বলবৎ হলো ব্রুনেই দ্বীপে। এর সূত্রপাত ২০১৩ সালেই। তখন থেকেই শরিয়তি দণ্ডবিধি একটু একটু করে লাগু হচ্ছিল নানাভাবে – নামাজে না গেলে জরিমানা, পরকীয়াতে জেল ইত্যাদি ছোটখাট পন্থায়। আর বিশ্বজোড়া প্রতিবাদও শুরু হয় তবে থেকেই। আর এবার সুলতান হাসানল, যিনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে অন্যতম, তিনি চেয়েছিলেন ১লা এপ্রিল ২০১৯ থেকে মধ্যযুগীয় কট্টর শরিয়তি আইনবিধি পূর্ণ রূপে চালু হবে ব্রুনেইতে। গত ১ তারিখ থেকে চালু করেওছেন।

সরিতা আহমেদ

মূলত সমকামিতার শাস্তি হিসেবে (পাথর ছুঁড়ে হত্যা) এই কঠোরতা চালু হলেও ধীরে ধীরে এই কট্টর শরিয়ত আইন যে গোটা দেশের অন্যান্য সমস্ত কাজে নিজের বর্বর থাবা বসাবে – এ তো সহজবোধ্য।
এই আইনে যেকোনো অপ্রচলিত (যেটাকে আন-ন্যাচারাল বলে সভ্যতা দাগিয়ে দেয় অসভ্যের মত) যৌন সঙ্গম (পায়ুকাম, সমকাম) এবং পরকীয়ার শাস্তি হবে পাথর ছুঁড়ে হত্যা। চুরি-ডাকাতির শাস্তি- হাত কেটে নেওয়া ইত্যাদি।
আপাত ভাবে এই অপ্রচলিত সেক্সের বিপক্ষে যারা আছে তারা এই আইন চালু হওয়ায় হাততালি দিলেও তাঁদের অগোচরেই এই কট্টর মধ্যযুগীয় আইন যে আরো নানা বিধিনিষেধ আনতে চলেছে – তা তারা ভুলে যাচ্ছে ।

সমকামিতা ও পরকীয়ার জন্য শাস্তি হিসেবে লাগু এসব নৃশংতার বাইরেও শরিয়ত শাসনে মেয়েদের জন্য জীবন হবে অভিশপ্ত । তারা বঞ্চিত হবে বাবার সম্পত্তির সমানাধিকার ( কোনও কোনও ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার ) থেকে । পদে পদে শৃঙ্খলিত হবে তাঁদের চলাফেরা তীক্ষ্ণ তালিবানি শাসনে । শিক্ষা হবে মোক্তব মোতাবেক, বিজ্ঞান চর্চা হবে নিষিদ্ধ । নবজাগরণ অথবা মুক্তচিন্তার রসদ হবে নিষিদ্ধ , মানবাধিকার হবে লঙ্ঘিত , লিঙ্গবৈষম্য হবে বিকট । নাগরিকরা ছোট থেকেই পড়বে কেবলমাত্র কোরাণ এবং হাদিসের মত ধর্মীয় কেতাব। যুক্তিবুদ্ধির দ্বার রূদ্ধ করে শুধুমাত্র বিশ্বাসের দ্বার হবে উন্মুক্ত । বিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্ত এই নব্য ব্রুনেই বাসীরা মনে প্রাণে হবে কট্টর সুন্নি । তারা জানবে ও মানবে আখেরাত- পুলসেরাতের কথা , চ্যপ্টা পৃথিবী অথবা সাত আসমানের কথা, চার বছরের শিশু থেকে চৌষট্টি বছরের ১১- ১২টা বৌ রাখা বৈধ হবে , পলিগ্যামি বলবৎ হলে তার পেছন পেছন আসবে কিছু জিনবাহিত রোগ এবং তার ফল হবে প্রাণঘাতী ,পুরুষদের জন্য যেমন ইচ্ছা তিন তালাক দেওয়া বৈধ হবে । এছাড়া শাস্তি হিসেবে হিংসা, নৃশংসতা ইত্যাদি তো আইন সিদ্ধ হলই , মৌলবাদীদের ওয়াজে মেয়েদের পায়ের তলায় পিষে ফেলা আর জান্নাত -হুর- অক্ষতযোনীদের প্রতি অদম্য লালসা পুরুষের মোক্ষলাভের হবে একমাত্র লক্ষ্য, বিধর্মিদের নির্বিচারে হত্যা করে কিভাবে নিজের জান্নাতের টিকিট ছিনিয়ে নিতে হয় জেহাদের নামে – শিখবে তারা শৈশব থেকেই ।

আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রাষ্ট্রপুঞ্জ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক মানবাধিকার দল থেকে নানাভাবে প্রতিবাদ এবং শরিয়ত আইনের বিরোধিতা করে চাপ দেওয়া হলেও ব্রুনেই সুলতান এসব বড়বড় সংস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মর্জিমাফিক বলবৎ করেছেন মধ্যযুগীয় শরিয়ত আইন আর তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলছেন – “ব্রুনেই প্রথম সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র, যেখানে আজ থেকে শক্তিশালী শরিয়ত আইন চালু হলো। মানুষকে ইসলামি কর্তব্য স্মরণ করাতে এবং দেশের ইসলামিক আদব কায়দা সুষ্ঠুভাবে মোতায়েন করতে, মানুষকে আনন্দ ও শান্তি দিতেই এই আইন কার্যকরি হলো।”

ব্রুনেই – অর্থাৎ শান্তির রাজ্য (abode of peace)
আর ইসলাম – অর্থাৎ শান্তির ধর্ম।
যে শান্তির বার্তা সারা দুনিয়ায় জোরেশোরে প্রচার করতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে দলে দলে মুসলিম যুবক যুবতীরা শরীরে বেঁধে নেয় মারণবোমা, বিশ্বজুড়ে মানব ইতিহাস রচিত হয় তাঁদের ধর্মীয় হিংসা আর রক্তপাতের ভাষায়। গোটা মুসলিম জাতিকে যারা অপমান আর অশান্তির কালীমা লেপে দেয় – সেই ‘শান্তিকামী’ সংস্কৃতিতে নবতম কালো পালক জুড়লো ব্রুনেই – শরিয়তি আইন।
আচ্ছা খুব জানতে ইচ্ছে করে আল্লাহ যদি সত্যিই শান্তির প্রতিনিধি হোন, তবে এত এত হিংসা – ধ্বংস কাণ্ডে কেন দলে দলে যোগ দেয় তাঁর অনুসারীগণ? নাকি তারা আল্লাহর বিচার অবধি ধৈর্য্য রাখতে পারে না, নিজেরাই তুলে নেয় বিধর্মীদের চরম বিচারের ভার! কোনও শান্তিকামী (!) শিষ্য কি তার শান্তিবান (!) উপাস্যর বাণীকে এইভাবে মানুষের প্রাণের বিনিময়ে কার্যকর করতে পারে? বর্বরতা অধর্ম অন্যায় কি এইভাবেই আল্লার বাগানে স্বর্গসুখ দেয় তাও আবার ধর্মযুদ্ধের নামে?

যখন সারা বিশ্বের সমস্ত ছোট বড় দেশ নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী প্রগতির দিকে এগোচ্ছে (দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া), যখন ইরানসহ নানা মুসলিম দেশে হিজাব- তালাক ইত্যাদি কট্টরতা নিষিদ্ধ হয়ে প্রগতির ধ্বজা কিছুটা হলেও উড্ডীয়মান হয়েছে, তখন এই ২০১৯ সালে একটি সুন্দর স্বাধীন দেশের এমন ভয়াবহ পরিনতি একনায়ক শাসনতন্ত্রের দ্বারা – বিষয়টি চিন্তা করলেই অসুস্থ লাগে।

শিক্ষিত সমাজ যারা জাতীয়তাবাদ ও ভিন্নভিন্ন দেশপ্রেমের ধ্বজাধারী তারা মুখ ফিরিয়ে থাকবে এসব বিষয় থেকে – ” এসব ওদের ব্যাপার। ওরা ওরকমই। ওদের দ্বারা ভাল কিছু হয় নাকি? ওদের গোড়াতেই গলদ …।” ইত্যাদি ক্লিশে বাক্যবন্ধের আড়াল নিয়ে নিজেদের বিচার বুদ্ধি, চিন্তা চেতনা প্রয়োগ করবে অন্যত্র ‘কম-তিক্ত বিষয়ে’।
এবং তারা ঠিকই করবে।

সত্যিই তো যে জাতি ধর্মের নামে কাফের হত্যাকে জায়জ মনে করে, বেছে বেছে অমুসলিমদের কোতল করে নিজেদের মুক্তির ঠিকানা খোঁজে – তাদের নিজস্ব সমস্যা বা ভিন দেশের ভিন জাতির স্বেচ্ছা পরাধীনতা থেকে মুক্তির উপায় কেন অন্য জাতি বাতলে দেব ?
এ তো নিতান্তই মুসলিমদের ব্যাপার।

আর তাই এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষিত, সচেতন মুসলিমদেরই। যে কোরাণ পড়ে একটা সাধারণ মুসলিম পরিবার নিজের পরিবারের কল্যাণে ইবাদতে বসে, আধ্যাত্মিক শান্তি খোঁজে এবং বাস্তবে খেটে খায় – সেই একই কোরাণ পড়ে অন্যরা কেন বন্দুক তুলে নেয় হাতে – সেই প্রশ্ন করতে হবে মুসলিমদেরই।
অন্যরা আসবে না এর মধ্যে। আসাও উচিত না।

যারা তথাকথিত আলোকপ্রাপ্ত মুসলিম (শিক্ষিত, প্রভাবশালী, উচ্চবিত্ত) তাঁরাই যদি মুখ ফিরিয়ে থাকে বা এসব সমস্যাকে সমস্যা বলে ভাবতেই না পারেন তবে তো বলতেই হয় ” মুসলিমরাই মুসলিমদের শত্রু।”
শুধু নামাজ পড়াকালীন, জামাতে দাঁড়িয়ে, কবরে মাটি দেওয়ার সময় অথবা মিলাদে -মাজারে-খুতবায় “নাস্তিক নিপাত যাক” দাবী তোলার সময় সাচ্চা ‘ইসলামিক ব্রাদারহুড’ দেখাব আর সেই ব্রাদারহুড যখন অন্য কোথাও বা নিজদেশের কোনও প্রদেশে, কোনও অখ্যাত স্থানে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবিষ্ট হবে বা সুস্থ চেতনার দ্বার রুদ্ধ করে ফিরে যাবে মধ্যযগীয় বর্বরতার দিকে – তখন চুপ থাকব বা নিজের আলোকিত হাত বাড়াব না, সেটা কেমন ভাইচারা? কেমন ইউনিটি?

ইসলামিক জঙ্গিবাদ যেমন ছড়ায় ভিনদেশে ঘটা (বা ফটোশপ করা অত্যাচারের) স্বজাতির উপর নানা নির্যাতনের খবর শুনিয়ে/দেখিয়ে, মগজধোলাই করা হয় অত্যাচারী (এক্ষেত্রে অমুসলিম/কাফের) জাতিকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে – এবং তাতে একাট্টা হয়ে মুসলিম যুবকেরা তুলে নেয় অস্ত্র;
ঠিক সেরকমই যদি এই সমাজের পিছিয়ে পড়া, অন্ধকারে নিমজ্জিত খবরগুলোর বিরুদ্ধে প্রগতিশীল মুসলিমরা একাট্টা না হয়, প্রতিবাদ না তোলে, শুরু না করে অন্য জেহাদ – মুক্তি তবে আসবে কীভাবে?
মুসলিমরাই যদি প্রগতির পথে, আলোর পথে, বিজ্ঞানের পথে, সুস্থ সমাজ গঠনের পথে তাঁদের মগজ না খাটায়, না চেষ্টা করে তবে কারা আলোয় আনবে মুসলিম সমাজকে?

আত্মবিশ্বাস যেমন বলিষ্ঠ করে মানুষকে, উন্মুক্ত করে সুস্থ চেতনার পথ; সেরকম অন্ধ ধর্মবিশ্বাস রূদ্ধ করে মস্তিষ্কের বিকাশ।

আমাদের বুঝতে হবে মুক্তমনা, নাস্তিক অথবা অবিশ্বাসীদের হত্যায় অথবা ধর্মস্থান নির্মাণ অথবা মূর্তি ধ্বংসে কোনও সমাজের উন্নতি হয় না –
উন্নতি হয় শিক্ষিত (হোক না পুঁথিগত) মগজ খাটানোয়, বিদ্যালয় ও হাসপাতালের মতো ইমারত গঠনে।

এই সার কথা সভ্য মুসলিমদের বুঝতে হবে, কাজ করে দেখাতে হবে, নইলে বিধর্মীদের ঘৃণা বর্ষণ-অপবাদ-অপমান ইত্যাদি নিয়ে যুঝতে হবে আমৃত্যু!

শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares

লেখাটি ৬৩৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.