নাঈমকে নিয়ে খেলার আপনি কে জয়?

0

শামীমা জামান:

বনানী অগ্নিকাণ্ডে পানির পাইপ চেপে ধরে বসে থাকা শিশুর উদ্বিগ্ন মুখের ছবি। মুখের মালিক নাঈমের ভাইরাল হওয়া এই ছবি সকলের হৃৎপিণ্ড ছুয়ে যায় শোকার্ত সময়ে। পানির পাইপ চেপে ধরে ঠিক কতজনকে বাঁচানো গেছে সে হিসাব এখানে মুখ্য নয়, নাঈমের উদ্বিগ্ন চেহারার মাঝে সবাই ঘুমন্ত বিবেক, মানবতাকে খুঁজে পেয়েছে আপন করে। মুহূর্তে নিউজফিড ছেয়ে যায় এই ছবিতে। কেউ বা ঝুলিয়ে রাখেন প্রপিক কভার পিকে। সংবাদে শিরোনাম হয়ে যায় নাঈম। প্রবাসী এক সহৃদয় পাঁচ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেন নাঈমের জন্য।

এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। এরকম পুরস্কার ভালো কাজে যেমন সকলকে উৎসাহিত করে, তেমনি অভাবী নাঈমের উপকারেও আসে। নাঈম ছাড়াও আরও কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন থেকে উদ্ধার করতে মানুষের জন্য মানবতার হাত-পা বাড়িয়ে দিয়েছিল। জসিম নামের এক ব্যক্তিকে দেখা যায় স্পাইডারম্যানের মতো দালান বেয়ে উঠে একজন নারীকে উদ্ধার করতে। তিনি অবশ্য নাঈমের মতো ভাইরাল হননি বলে কোন সাহায্যের কথা বা বীরত্বগাঁথা তাকে নিয়ে শোনা যায়নি।

যুগটাই যে ভাইরাল এর। ফায়ার সার্ভিসের অনেক কর্মীই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছেন, তারাও ভাইরাল হননি বলে তাদের কাজটি নাঈমের তুল্য হয়নি। নাঈমের সৎকর্ম পরোপকারী মন অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। কিন্তু বাঙ্গালী কোথায় থামতে হবে সেটা না জানলেও স্টার বানিয়ে ফন্দিফিকির ধান্ধাবাজি বেশ জানে।

দলে দলে মাইক্রোফোন হাতে সাক্ষাৎকার নেয়ার কী আছে হে মহান সাংবাদিক ভাইয়েরা? সেটাও না হয় নিলেন। কিন্তু শাহরিয়ার নাজিম জয় এটা আপনি কী করলেন ভাইসাহেব?

শাহরিয়ার নাজিম জয়: তোমার এই নাম করার সাথে যে টাকা পাচ্ছো, এই যে চার লক্ষ টাকা আরও সাহায্য সহযোগিতা আসতে পারে, সেগুলো কি তুমি নেবে?
নাঈম: (তোতলানো চাপা কন্ঠে) সেগুলো আমি এতিমখানায় দিয়ে দেবো!
শাহরিয়ার নাজিম জয়: কেন দিতে চাও এতিমখানায়?
নাঈম: মানে এই টাকাডা কয়েক বছর আগে খালেদা জিয়া লুট কইরা খায়া ফেলছে তাই!
শাহরিয়ার নাজিম জয়: কৌতূহল উদ্দীপক আঁতেল কন্ঠে (যেন ঊনি কানে কম শোনেন, প্রথমবারে শুনতে পারেন নাই) কী বলছো আবার বলতো?
নাঈম: (মুখস্ত পড়া) মানে লুট কইরা চুরি করে খেয়ে ফেলছে।
শাহরিয়ার নাজিম জয়: কে? (ঊনি নামটা ভিউয়ার্সদের স্পষ্ট করে শোনাতে চান)
নাঈম: খালেদা জিয়া…

বাহ! বাহ! জয় ভায়া। কী চমৎকার দেখা গেল!

এ ঘটনার পর উক্ত প্রবাসী তার ঘোষণাকৃত অর্থ না দেওয়ার ঘোষণা করেন। খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রবাসীর কষ্টার্জিত অর্থ কেন তিনি অন্ধকারে ফেলবেন! শিশুটি অর্থ না নেওয়ার সপক্ষে এও বললো, ‘আল্লাহ আমাদের অনেক দিয়েছেন! (এখানে ওয়াও ইমো হবে)। এই পর্যায়ে নাঈমের বাবা-মায়ের নত হয়ে থাকা মুখ ছিল দেখার মতো। গরীব ছেলেটিকে আশাহত করে আপনার কী লাভ হলো জয়? বেশ তো সেলিব্রেটিদের অপদস্থ করে দারুণ নাম ব্যক্তিত্ব ভিউয়ার্স কামাচ্ছিলেন। বেশ একটা তুলসী পাতা বিচারক সেজে!
আপনার অনুষ্ঠানের সেলিব্রেটিদের জাস্ট আসামী মনে হয় আপনার মতো মহামান্য বিচারক এর ভাবভঙ্গি দেখে। যদিও শামীম ওসমান, আসিফ আকবরদের সাথে আপনি সে ভঙ্গিতে যাননি, বা পেরে ওঠেননি। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।

কিন্তু এইখানে আপনার উদ্দেশ্যটা কী ছিল? একটা বাচ্চা ছেলের মুখে এমন কঠিন রাজনৈতিক বুলি এগুলো কার শেখানো? নাঈম যদিও অপর এক সাংবাদিক ভাইয়ের (সম্ভবত আমিরুল মোমেনিন মানিক) কালো লাঠির সামনে তাকে যে ঐ কথা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ করেছে। নাঈমকে জয়ের এই অদ্ভুত প্রশ্নটাই কেন করতে হলো? একটা গরীব বাচ্চাকে বলা হচ্ছে, তুমি কি এই টাকা নেবে? কেন জয়, ওর জায়গায় আপনি হলে কি নিতেন না? যদিও উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ নেত্রীর কাছে আপনার চাওয়া একটা ভিক্ষাপত্র এখন নিউজফিডে ভাসছে। যেখানে আপনি তার প্রাণপ্রিয় সন্তানের নামটি নিয়ে তাকে ইমোশোনাল ব্ল্যাকমেইল করে লিখেছেন, আপনার পুত্রের নামের আরেক পুত্রের সালাম গ্রহণ করুন…।

লেখক: শামীমা জামান

সে আপনি পূর্বাচলে প্লট চাইতেই পারেন দুই যুগের জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে। এতোদিন অভিনয় করে টাকা কামিয়ে প্লটের লোভ ছাড়তে পারেন না একটা না খেতে পাওয়া পথশিশুকে কী করে চার লক্ষ টাকা এতিমখানায় দান করে মহান হতে বলেন? ভণ্ড কি গাছে ধরে?

আর এই যে ভাইরাল জাতি, যার যেটুকু প্রাপ্য তাকে সেইটুকু সিঁড়িতে উঠান। ছোটবেলার প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় সেই কাঠের সিঁড়ির কথা মনে নেই? বেশি মাথায় উঠাবেন না। তাতে হয় সে আছাড় খেয়ে পড়ে যাবে, নয়তো মাথা নষ্ট হবে হিরো আলমের মত। এই যে এখনই দেখুন না নাঈমের মানবতার সেই উদ্বিগ্ন বাঁকানো ভ্রু, কেবলই হয়ে গেল সেলফি নুরু।

জয়কে বলবো কসম কেটে লাইভে না এসে নাঈমের টাকা নিজ দায়িত্বে আপনারই কি এখন দেয়া উচিৎ নয়? তাতে যদি কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হয়। মানবতার জয় হোক, কী বলেন?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 542
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    542
    Shares

লেখাটি ২,২৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.