বাতায়ন উপাখ্যান: ভালোবাসা আমার বাতায়ন

0

প্রমা ইসরাত:

আমি একটা খারাপ বিষাক্ত সম্পর্কে ছিলাম। এবং আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, এই পুরো ব্যাপারটির কথা যখন আমি প্রকাশ করলাম, এটা নিয়ে লিখলাম। হাতে গোণা কিছু মানুষ ছাড়া আমাকে কেউ সমর্থন দেয়নি। আমার জন্য খুব কম মানুষ ভালোবাসা প্রকাশ করেছে।

প্রত্যেকের কিছু সিলেবাস থাকে। সেই সিলেবাস অনুযায়ী তারা নানান কাজ করে। বেশ কিছু মানুষের কাছে আমি সমর্থন আশা করেছিলাম, সমর্থন দূরের কথা, আমার জন্য কোন শুভকামনাও তাদের চোখে মুখে দেখিনি।

অনেকে বলেছে, এইসব কোন ব্যাপার না। কিন্তু কীসব আসলে ব্যাপার, এবং আমার কষ্ট কতটুকু তীব্র হলে তারা আমার পাশে থাকতো, সেই সিলেবাস আমাকে তারা জানায়নি। অনেকের অবস্থা দেখে আমার মনে হয়েছিলো, তারা আসলে ওই স্কুলের ছাত্রদের মতো, যারা পড়ালেখায় ভালোই, কিন্তু পরীক্ষার খাতায় সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন আসাতে খুব একটা ভালো লিখতে পারেনি। তাদের প্রশ্ন কমন পড়েনি।

প্রমা ইসরাত

আমাকে যারা ভালোবাসেন, অনেকেই বারবার করে বলেছেন, সবকিছুই যেহেতু বুঝতে পারছি তবে কেন সেই বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না!

একটা বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসাটা কষ্টের। আমি নিজেও এমন বহু কেইস দেখেছি, যেখানে দিনের পর দিন একজন আটকে থাকে, কারণ তার মধ্যে সব কিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে এমন আশা কাজ করে। এবং সঙ্গীর নানান অত্যাচার, অন্যায় সহ্য করেও তার কাছে মনে হয়, সব ঠিক হয়ে যাবে, এবং দিনশেষে তাদের মনে হয় তাদের এই নীপিড়ক সঙ্গী টি আসলে ভালো একজন মানুষ, তারা নিজের ভেতরে সেই সম্পর্কে “এতো কিছুর পরও তাকে ছেড়ে যাইনি” এই ভ্রমের গর্বে গর্ববোধ করতে ভালোবাসে।

আসলে কেন এতো কঠিন হয় একজন নিপীড়ককে ছেড়ে আসা!
Dr. Patrick Carnes , এই ট্রমা বন্ডিং কে বিশ্বাসঘাতক বন্ধন নামে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
Trauma Bonding:
Patrick Carnes বলেছেন ট্রমা বন্ডিং হলো “the misuse of fear, excitement, sexual feelings, and sexual physiology to entangle another person,
কিংবা ” A strong emotional attachment between an abused person and his or her abuser, formed as a result of the cycle of violence”.

ভায়োলেন্স, এবিউজ এই শব্দগুলো শুনলেই আপনারা হয়তো কল্পনা করতে পারেন যে, কোন ছেলে হয়তো তার প্রেমিকা বা স্ত্রীকে বেধড়ক পিটাচ্ছে, সাইকোপ্যাথ শুনলে হয়তো মাথায় আসে কোন সিরিয়াল কিলার, যার চোখের নিচে কালি, এবং সে চাকু হাতে নিয়ে মারতে আসছে।
আসলে ব্যাপারগুলো এমন ফিল্মি না। সাইকোপ্যাথ, সোশিওপ্যাথ, নার্সিসিস্ট সিন্ড্রোমগুলোতে আক্রান্ত মানুষগুলো আমাদের মধ্যেই সাধারণ মানুষের মতো ঘুরে ফিরে, চলে, এবং নিপীড়ন করার জন্যও তারা রক্তারক্তি, বেধড়ক পেটানো এইসবও করে না। একজন মানুষকে নিপীড়ন করতে তার আত্মাকে কব্জা করা জরুরি। একজন নিপীড়ক সেই কাজটাই করে। সে মানুষের মনকে বন্দী করে রাখে।

বন্ধন, সেই বন্ধন ভালোবাসার হোক কিংবা ট্রমা’র, সেটা বন্ধন। ভালোবাসার বন্ধন এর চাইতেও ট্রমা বন্ড শক্তিশালী।
কেন ট্রমা বন্ড শক্তিশালী?

– বহু মানুষ যারা তাদের নিপীড়ক সঙ্গীর কথা শেয়ার করে ছিলো, তাদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, তারা কি আসলেই ওই ব্যক্তিকে ভালোবাসে? নানান পরীক্ষা, বাস্তব সম্মত আলোচনা এবং নিজের মনের সত্য অনুভূতি খোলাসা করার পর তারা উপলব্ধি করেছে তারা তাদের নিপীড়ক সঙ্গীকে শ্রদ্ধা করে না, বিশ্বাস করে না। এবং যাকে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করা যায় না, তাকে ভালোও বাসা যায় না।

সঙ্গীটি খারাপ ব্যবহার করে, মিথ্যে বলে, প্রতারণা করে, এবং প্রতিনিয়ত করে অথচ সেই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে পারে না, সব কিছু জেনেও, বুঝেও। উলটো “তোমায় নতুন করে পাবো বলে” মার্কা রাবীন্দ্রিক লাইনে আশায় বুক বাঁধে। এর কারণ একটা সম্পর্কে একজন নিপীড়ক অজস্র ভালোবাসার ডোজ দেয়, যাকে ইংরেজিতে বলে লাভ বোম্বিং (love bombing)।

যিনি ভিক্টিম, তাকে অজস্র ভালোবাসা মন্ডিত কথা বলে বলে, তার ইগোকে স্যাটিসফায়েড করে। ভালোবাসার কথা, সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত মানুষের শরীরে ডোপামিন নামক এক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়, আবার সেই ভালোবাসা থেকে নিপীড়ক যখন তার আসল রূপে ফিরে যায়, রিলেশনে একটা টেনশন তৈরি করে এবং সে অনুযায়ী ভিক্টিমকে আঘাত করে, মানসিক কিংবা শারীরিক, কিংবা দুটোই, তখন করটিসোল (cortisol) হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো এমন এক টক্সিক কেমিক্যালের ককটেল তৈরি করে, যা সাধারণত ড্রাগ এডিক্টেড মানুষের মতোই, নিপীড়ক মানুষেটির প্রতি আসক্তি তৈরি করে। এবং সেই নিপীড়ন, নিপীড়নের পর ভালোবাসার বোমা পেতে ভিক্টিমের ভালো লাগে। এবং এতে ভিক্টিম এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে যায় যে নিপীড়ন ছাড়া ভালোবাসা হতে পারে এটা তার মনেই হয় না। এবং এই শক্তিশালী কেমিক্যাল লোচার আসক্তিতে তার আত্মা হোস্টেজ হয়ে থাকে নিপীড়কের কাছে।

একজন নিপীড়কের সবচেয়ে ভালো লাগে তখন, যখন তার ভিক্টিম তার হাতের পুতুল হয়ে থাকে। যখন সেই মানুষটিকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই সম্পর্ক শুধু প্রেমের বা বিয়ের ক্ষেত্রে না, যিনি বন্ধু হয়ে পাশে থাকেন, অফিসের বস বা কলিগ হয়ে পাশে থাকেন, তিনিও হতে পারেন।

প্রেমের বা বিয়ের ক্ষেত্রে নিপীড়িত হওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি সহজ থাকে। কারণ এই সম্পর্কগুলো যৌনতা নির্ভর হয়, এবং আবেগপূর্ণ থাকে। ভালোবাসার সুন্দর মুহূর্তগুলো থাকে, এরপর বেশ কিছু দুঃখের এবং অসহনীয় কষ্ট, নিপীড়কের এর মধ্য দিয়ে কিছু সুবিধা আদায় করে যেমন, অর্থনৈতিক সুবিধা, যৌন সুবিধা, বা এমন কোন কাজ করার ক্ষেত্রে সমর্থন বা সাহায্য যা সে আদায় করতে চেয়েছিলো, এবং পর মূহুর্তে আবারো ভালোবাসা এবং সবকিছু ভেঙে চুড়ে ভালোবাসা, তারপর বেশ কিছুদিন হানিমুন পিরিয়ড এবং হঠাৎ আপনি যখন ভাবছেন সুখের সংসার একান্ত তোমার আর আমার তখন ঘুম ভেঙে দেখলেন, আবার কোন এক দুঃখ আপনার বাসর রাতের পালংক হওয়ার জন্য দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। এই হচ্ছে নিপীড়নের দুষ্টচক্র।

ট্রমা বন্ডিং, শক্তিশালী। সম্পর্ক থেকে বের হলেও এর থেকে বের হয়ে আসা কষ্টকর। কারণ আপনি বের হয়ে আসলেও আপনার আত্মা হোস্টেজ হয়ে থাকে। মনে করুণ, আপনার আত্মা কব্জা করে আছে সেই দানব যার প্রাণ ভ্রমরা পুকুরের গভীরে কৌটায় রাখা আছে। আপনাকে এক ডুবে সেই ভ্রমরা টা মারতে হবে, তবেই তবেই আপনি ঘুম থেকে জাগাতে পারবেন রাজকুমারীকে যার আত্মা বন্দি করে রেখেছে সেই দানব। যে কিনা জাদুর কাঠি রূপার কাঠি ব্যবহার করে ঘুম পাড়িয়ে রাখতো রাজকন্যা কে।

সোনা রূপার জাদুর কাঠি যদি হয় ডোপামিন আর করটিসোল, ট্রমা বন্ডিং সেই দানবের প্রাণ ভ্রমরা।

এই অশুভ শক্তিকে জিততে দেয়া যাবে না।
কারণ ভালোবাসা একটা মুক্ত আকাশ, ভালোবাসা মায়াময়, ভালোবাসা বাতায়ন।
ভালোবাসা নিপীড়ন নয়।

শেয়ার করুন:

লেখাটি ৯৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.