পিতৃত্ব, পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা না হোক!

0

সুচিত্রা সরকার:

ডিম্বানু- শুক্রাণু। মিথষ্ক্রিয়া। অতঃপর জানা কথা- ডিম্বানুর মালিক ‘মা’ হবে। শুক্রাণুর জন ‘বাবা’।
ভালো কথা। সুখবর। সাজ সাজ রব চারদিকে।

কংগ্রাচুলেশন অ্যান্ড সেলিব্রেশন… গান-টান বাজবে চারদিকে।

দুজন মানুষ, একটা সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছে।

অথচ প্রকৃতির কী আশ্চর্য কারিশমা…।

সুচিত্রা সরকার

শুধু ডিম্বানু বহন করার দায়ে নারীর শুরু হয় দীর্ঘ অসহ্য যাত্রা।

সকালে উঠে গা গোলানো। দিনভর ক্ষণে ক্ষণে পিঠ ঘেমে যাওয়া- অথবা চেয়ার খামচে ধরে কোনমতে বমি ঠেকানো।

মাছের গন্ধে, ডিমের গন্ধে, ফলের গন্ধে, পাতার গন্ধে, তেলের গন্ধে- পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইলেও, দাঁতে দাঁত চেপে খেতে হবে। বাচ্চার সুস্থতার জন্য, বেড়ে ওঠার জন্য।

নিয়মিত ঘুম প্রয়োজন। অথচ ঘুমের দেখা নেই। বা কাত হয়ে শুতে হবে, ডাক্তারের কড়া হুকুম। অথচ বাঁ হাতেই টিটেনাস ইনজেক্ট! তিনদিন গায়ে গায়ে জ্বর। তবু চেষ্টা করতে হবে ঘুমের। প্রবল অসুস্থতায়ও ওষুধের কাছে যাওয়া যাবে না। বাচ্চার ক্ষতি তাতে!

শরীরের অবয়ব পালটে যাবে। মুখচোরা হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। নিজেকে লুকানো শিখতে হবে। কিছু অভ্যাসের রদ। আর কিছুটা বদল।

একটা মানুষ, একা। স্বাধীন। সেই ‘একটা মানুষ’ হঠাৎ করে ‘দুজন’ বনে যাবে! শরীরের ভেতর দু’ দুটো হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন। তাই দুটো হৃদয়ের ভার সামলে নেয়া, শিখতেই হবে!

ভিড় বাসে চড়া? সাবধান! হাঁটা? সাবধান! খাওয়া? সাবধান! সিঁড়ি বাওয়া? সাবধান! নিঃশ্বাস নেওয়া? সাবধান! উলটোপালটা চিন্তা? সাবধান!

এ সময় শুধু ভালো ভালো চিন্তা!

ছয় মাস ধরে সেন্ট মার্টিনের ‘নীল’ ডাকবে! তিন মাস ধরে হই হই করে দৌড়ে বেড়ানোর শখ জাগবে! দুদিন ধরে শাহবাগে চক্কর দেবার ইচ্ছেটাও মাথাচাড়া দেবে!

এতো এতো ইচ্ছেকে দমন করতে হবে, শক্ত হাতেই। দৃঢ়তার সঙ্গে।

কারণ প্রকৃতি ‘ডিম্বাণু’র মালিককে দিয়েছে এক মহার্ঘ দায়িত্ব। স্বর্গীয় অনুভূতি। মহান পেশা। যা তাকে অন্যদের চে আলাদা করেছে। শুধু, এই একটা পরিচয়ের জন্য সে আছে পৃথিবীতে। ‘মা’- ‘জননী’ তার নাম।

এ অভিধা সকলে পায় না।

যে শুক্রাণুর মিথষ্ক্রিয়ায় বা অবদানে ডিম্বানুটি পরিপূর্ণ আকার পায়, বেচারা শুক্রাণুর ভাগ্যেও এ ‘অভিধা’ জোটে না।
তাই কি শুক্রাণুর আফসোস? দুর্ঘটনাবশত কখনো সখনো, শুক্রাণুর মালিককে, নয় মাসের গর্ভযন্ত্রণা দিলে সে কি ‘বর্তে’ যেত! ‘রত্নগর্ভা’ স্বীকৃতি পায় না বলে কি তার বিরাট ক্ষতি হচ্ছে? শুক্রাণুর মালিক কি প্রবলভাবে কামনা করে, তিল তিল করে একটা মানুষ বেড়ে উঠুক তার ভেতরে?

যদি তাই হয়, প্রকৃতির এবার একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।

সাম্যবাদী সিদ্ধান্ত। নয় মাসের কোনো যন্ত্রণা ছাড়াই, কেউ সন্তানের দাবি করতে পারবে না। শুধু ‘দাতা’ হবার কারণে ‘বাবা’ হওয়াটা বন্ধ হোক! নারী- শরীরে ‘মাতৃত্বে’র দায় যতটা, পুরুষ শরীরে ‘পিতৃত্বে’র দায় ততটুকুই হোক! পিতৃত্ব, যেন, পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা না হয়! প্রকৃতি এবার সাম্যবাদী হোক!

‘রত্নগর্ভ’, ‘জনক’ আর ‘পিতৃত্বকালীন ছয় মাস’ ছুটি টার্মগুলো সমাজে প্রচলিত হোক!

৩০.০৩.২০১৯

শেয়ার করুন:
  • 140
  •  
  •  
  •  
  •  
    140
    Shares

লেখাটি ৬৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.