যে শহরে সবই হয় স্বার্থ মেপে

0

সাকি ফারজানা:

আমার বাসাটা ঢাকার আদাবরে, এর আগে থাকতাম শেখেরটেকে একটা ছোট বাসায়। ছিমছাম নতুন ফ্ল্যাট ছিল ওটা। সেখানেও দুই বেড রুম এখানেও তাই, পার্থক্য হলো- আগের বাসায় ছেলেটা একটু ছুটতেও পারতো না, এখন এই বাসায় ইচ্ছেমতো ছুটতে পারে সে। দুই বারান্দা, ঘর, ড্রইং-ডাইনিং স্পেস মিলিয়ে ১৩০০/১৪০০ স্কয়ার ফুট হবে। শুধুমাত্র এই সুবিধাটুকু পাবো এই ভেবেই এই পুরোনো ধরনের বাসাটা নেয়া।

দুইদিন পর পর রান্না ঘরের পাইপটা জ্যাম হয়ে যায়, বাড়িওয়ালা কানে তোলে না, মেনে নিই। বাসাটায় আগে একপাশ একদম খোলা ছিল, বেডরুমের সাথে লাগোয়া বারান্দাটায় রোদ আসতো, বাতাস পেতাম দুই ঘরেই। আর সবচেয়ে সুখের হলো মন চাইলেই আকাশ দেখা যেতো। বারান্দায় কিছু শখের গাছও রেখেছিলাম। এখন সেই খোলা পাশটায় বিল্ডিং উঠে গেছে- উপরে উঠছে তো উঠছেই, কত তলা হবে জানি না। এর মধ্যে আমাদের বেডরুমগুলোতে, বারান্দায় রোদ আর আসে না। দিনের অনেকটা সময়ই আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এই বাসার ছাদে কোন ভারাটিয়া যেতে পারে না, অন্তত কাপড় শুকাতেও নয়।

সাকি ফারজানা

আর বাড়ির গেট? একজন বয়স্ক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ওয়াচম্যান হিসেবে রেখেছে বাড়িওয়ালা। সারাদিন গেটের সামনে বসে ঝিমায় আর ওয়াজ শোনে। প্রবলেম হলো এই ওয়াচম্যানের সাথে কোন কমিউনিকেট করা যায় না। সে বেশিরভাগ কথাই বোঝে না, বুঝলেও ঠিকঠাক বোঝে না।

সবচেয়ে মুশকিল হয় শুক্রবার নামাজের সময়। তিনি দুপুর একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত সময় মসজিদে কাটান, এই সময় মেইন গেটে তালা লাগিয়ে চলে যান। এই এক ঘন্টায় যদি জীবন মরণ দশাও হয় কোন ভাড়াটিয়ার, পড়ে পড়ে মরতে হবে তবু গেইট খোলা হবে না। একবার ছেলের বাপ ছেলেকে নিয়ে বাইরে গিয়েছে এবং কোন এক প্রবলেমের কারনে একটার আগে ফিরতে পারে নি। ছেলে তখন বেশ ছোট, বাইরের খাবার তেমন দেয়া হয় না ওকে, ছেলে ক্ষুধায় কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে গেটের বাইরে আর সমানে মাম্মা যাব মাম্মা যাব করেছে। বাড়িওয়ালা তবুও গেট খোলেননি। বলেছিলেন-আর একটু ওয়েট করেন। আপনাকে এখন চাবি দিলে এটা প্র্যাকটিসে পরিণত হবে। এটা হতে দেয়া যাবে না। আমার ছেলে সেদিন একঘন্টা গেটের বাইরে কেঁদে তবেই ঘরে এসে খেতে পেরেছিল। তবুও এই বাসায় আছি, বিকজ ছেলে এই বাসায় ছুটতে পারে।

বাড়িওয়ালার সাথে বাসাভাড়া দেয়া ছাড়া পারতপক্ষে কোন কথায় যাই না। কয়েক মাস আগে তাদের গৃহকর্মীটি রান্নাঘরে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে, তারপর অনেক খরচপাতি করে পুরো কিচেন সেটআপ বদলে তারা সেই স্মৃতিকে মুছেও ফেলেছেন। ইদানিং প্রায় দমবন্ধ লাগে এই বাসায়- একটু আকাশ দেখতে পাই না, বারান্দার গাছগুলোর অনেকই মরে গেছে রোদ না পেয়ে। চারদিকে শুধু ইট-সুরকীর দেয়াল, হাঁপ ধরে যায়। আবারও অনেক হ্যাপার ভয়ে মু রাজিও হচ্ছে না বাসা বদলাতে, সাধ্যের মধ্যে এত বড় বাসা কই পাবো?

আমি খুব জরুরি কিছু, বা করতেই হবে এমন কিছু না হলে বাসা থেকে বেরোই না। রাস্তায় বেরোলে আমার ইরিটেশন হয়-গাড়ির হর্ণে, বেপরোয়া গাড়ি চালানোতে, আর এক বছর আগের বাইক এ্যাক্সিডেন্টের সেই ট্রমা তো আছেই। অনেক ট্রাই করেও ট্রমা কাটাতে পারছি না। এখন পাঠাও ছেড়ে উবার বাইকে চলি, বেশিরভাগ বাইকার স্মুদলিই ড্রাইভ করেন, মাঝে মাঝে কেউ একটু রাফ চললেই আমি নিজের অজান্তে চিৎকার দিই বোকার মতো, পরে সরি সরি করি।

এই শহরে বন্ধুত্বও হয় স্বার্থ মেপে, তাই অল্পকিছু বন্ধুতেই থাকি, যাদের সাথে আরাম পাই কথা বলে, হেসে, আড্ডা দিয়ে।
এর সাথে যুক্ত হলো পুড়ে মরার ভয়। আমি মরতে খুব ভয় পাই, দিব্বি আর দশটা দিনের মতোই একটা দিন শুরু করবো আর কোন প্রিপারেশন ছাড়া হুট করে আমি রক্তাক্ত বা কয়লা হয়ে টেঁসে যাব, এমন মরাকে আমার খুব ভয়। এই যান্ত্রিক শহরে যন্ত্র হয়ে বেঁচে থাকাতে আমার খুব ভয়, মিথ্যে কথার এই শহরে মিথ্যের ঝুলি ভরাতে আমার খুব ভয়, বেঁচে থেকেও থেমে থাকাতে আমার খুব ভয়।

থাকবো না আর, চলেই যাবো শালা!!

শেয়ার করুন:
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares

লেখাটি ১৯৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.