জননেত্রী, জেগে উঠুন, আগুনে পোড়া লাশের গন্ধ ভাসে

0

রেহানা আক্তার:

মাননীয় জননেত্রী শেখ হাসিনা। আজ আপনার বরাবরে কিছু লিখছি। নিতান্তই কথাগুলো আমার মনের মাঝে ঘুরপাক খায়। আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আপনার কাছে এই বাংলার হতভাগ্য মানুষদের রয়েছে অনেক আবদার। সেই আবদারটি কখনো হয় ভালবাসার মন নিয়ে, কখনো বা রাগে দুঃখে। আপনি এ পর্যন্ত যা যা করেছেন তা এক অর্থে অনেক। ১৯৭১ টু ২০১৯, আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় একবার এবং আপনি চারবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ পরিচালনা করছেন। আজ বাংলাদেশের যে উন্নয়ন আমরা দেখতে পাচ্ছি তা আপনারই অবদান। অবকাঠামোগত উন্নয়নে আমরা তা সুফলও পেতে শুরু করেছি। এতোকিছুর পরও এই ঢাকা শহরের অনেক অনিয়ম আজ নিয়মে রুপ নিচ্ছে। আমাদের অনিয়মগুলো রয়েছে আমাদের চারপাশেই।

* গ্রামীণ অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে আজও ঢাকা বিমুখ করানো যায়নি।
* অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা।
* মশার উপদ্রব কমার চাইতে বেড়েই চলেছে।
* একই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলে সারা বছর ধরে। রাস্তার কাজ শেষ হলে কার্পেটিং করা হয়। আবার কিছুদিন পর দেখা যায় ঐ রাস্তায় পানির লাইন বা গ্যাসের লাইনের কাজের জন্য দ্বিতীয়বার কাটাকাটি চলে। ধূলাবালির প্রকোপে নাকাল হয় রাজধানীবাসী।
* যানজট নিরসনে জন্য যত ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, বাস্তবে তা খুব একটা কাজে আসে নাই!
* সড়ক দুর্ঘটনা তো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিয়মতান্ত্রিকভাবে চলে গাড়ী। মানুষের চাইতে যে শহরে গাড়ী বেশি থাকে, সেই শহর তো মৃত্যুর ফাঁদ। আর অযাচিতভাবে হর্নের শব্দে আমাদের বধির হবার উপক্রম।
* ফুটপাত হকারদের দখলে। মেয়র সাহেবদের উদ্যোগ নেই। কিছুদিন নিয়মে চলে। আবার যা তাই হয়ে যায়।
* নোংরা আর্বজনার স্তুপ এর পাশাপাশি প্রায়শই রাস্তায় মলমূত্রের গন্ধে নাকে রুমাল চেপে পথ চলতে হয়। মনে হয় আমি কোন ঝোপ জঙ্গলে বসবাস করছি।
* সড়ক দুর্ঘটনার এক চরম চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। আইনের মারপ্যাঁচের কারণে ঘাতক ড্রাইভার বা মালিকরা ছাড়া পেয়ে যায়। ফিটনেস বিহীন গাড়ী কোন সাহসে মালিকপক্ষ রাস্তায় নামায় তা আমাদের সত্যিই বোধগম্য নয়। ড্রাইভারদের না আছে শিক্ষা। না আছে প্রশিক্ষণ।
* এবার আসি “আগুন” নামক এক ঘাতকের আলোচনায়।
আমার জ্ঞান হবার পর নিমতলী ট্রাজেডি দেখলাম। এর বহু বছর পর দেখতে পেলাম চকবাজারের আগুন। ২৮ মার্চে আবার আগুনে আক্রান্ত বনানীর আরএফ টাওয়ার।
অতি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলতে হচ্ছে , চকবাজারের আগুনে পোড়া লাশের গন্ধ আজও আমাদের নাকে এসে লাগছে। চোখের সামনে এতগুলো তাজা প্রাণ দগ্ধ হয়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেল। ঢাকাবাসী তথা সারা বাংলাদেশ সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে আবারও আগুনের লেলিহান শিখায় প্রাণ দিল বনানীর আরএফ টাওয়ারের অনেকগুলো মানুষ। বৃহস্পতিবার ছিল সপ্তাহের শেষ কাজের দিন।
আবারো আগুন, আবারো পোড়া লাশের গন্ধ। ঢাকার আকাশ বাতাসকে জানান দিয়ে গেল। কেন আগুন লাগে? সূত্রপাত কোথায়? কী কী অনিয়ম ছিল, এসব নানা ধরনের প্রশ্ন আমার মত হাজারো মানুষদের।

মাননীয় দেশনেত্রী, আপনি তো সন্তানের মা। আপনি তো পুরো পরিবারকে হারিয়েছেন। আপনার চাইতে স্বজন হারানোর কষ্ট এই বাংলাদেশের আর কোন মানুষ বুঝবে কিনা, আমার তা জানা নেই। আজ দিনাজপুরের বালুয়াডাঙ্গাতে বনানীর আগুনে মৃত মামুনের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। মা জেগে বসে আছে নির্লিপ্ত নয়নে। মামুন আসবে, মা বলে ডাকবে সেই আশায়। মামুনের সন্তানেরা বাবার চকলেটের অপেক্ষায় আছে। কখন বাবা চকলেট নিয়ে বাসায় ফিরবে আর স্ত্রী? সে তো আর কখনই পাবে না স্বামীর আদরের পরশ।
মামুন বাঁচতে পারতো, কীভাবে পারতো বাংলাদেশের মানুষ মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছে। তিনি তো জানালা দিয়ে নেমে ঝুলন্ত তার ধরে বের হয়েই এসেছিলের, কিন্তু সুস্থভাবে তার আর নামা হলো না। আট-দশ তলা হতে হাত ফসকে নিচে পড়ে গেলেন। হাসপাতালে নিতে নিতেই প্রাণ প্রদীপ শেষ।

মাননীয় জননেত্রী, আজ যদি ঐ বিল্ডিং এর নিচে সেপটি নেট ধরা হতো তাহলে বহু মানুষকে আমরা জীবিত ফেরৎ পেতাম। বাইশ তলা ভবনে আগুন নিভানোর যন্ত্রপাতি যেহেতু আমাদের দেশে নেই, তাই দয়া করে ওসব বিল্ডিং বানানোর পারমিশন যেন না পায়, তা সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং মন্ত্রণালয়কে সজাগ থাকার কঠিন শর্ত জুড়ে দিবেন। তাছাড়াও অগ্নিনির্বাপকের জন্য আধুনিক যত ব্যবস্থা আছে বিদেশ হতে তা আমদানী করতে হবে।

আমরা মনে করি, আপনি আপনার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই দেশের যত অনিয়ম আছে তা ঢেলে সাজাবেন। আইনের নিয়মগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারলেই বাকি সব কাজ সহজেই করা সম্ভব হবে। সব মানুষ যে আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দেশ ও দেশের মানুষ কীসে ভাল থাকবে তা আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা সতের কোটি জনগণ বিশ্বাস করি আপনি আপনার সিদ্ধান্তে অটল, অনড় থাকলে এদেশের প্রতিটি সেক্টরকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হবে। আর দুর্নীতি বন্ধ হলেই আইনেরও বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে উঠে।

টেকনাফ হতে তেঁতুলিয়া এই বাংলার সবকিছুই আপনার নখদর্পণে। আমরা আশায় বুক বাঁধি। আপনি জেগে আছেন আমরা জানি। তবে রাষ্ট্রের প্রতিটি কাজের জন্য দায়বদ্ধতার জায়গাটা শক্ত থাকতে হবে। অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। আপনি আরো শত বছর বেঁচে থাকুন এবং এই বাংলাকে মনের মত করে ঢেলে সাজান। আমরা পোড়া লাশের গন্ধে যে ঘুমাতে পারছি না। বিশ্বাস করি আপনিও মিডিয়ায় এসব দেখে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। তাই কঠোর হস্তে সব দমন করুন। আমরা আছি আপনার পাশে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে। আর কোন পোড়া লাশ চাই না। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।

স্টুডেন্ট এডভাইজর
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:
  • 352
  •  
  •  
  •  
  •  
    352
    Shares

লেখাটি ৮৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.