লোভ মানুষকে গিলে গিলে খাচ্ছে

0

সুপ্রীতি ধর:

কিচ্ছু বলবো না, আজ আমি কিছুই বলবো না। কোন এক সর্বনাশা মুহূর্তে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে পারিনি, দেখছিলাম ওপর থেকে টুপ টুপ করে কিছু বস্তু গোলাকৃতি হয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে। আছড়ে-পিছড়ে পড়ছে। পরে শুনেছি, ওরাও মানুষ ছিল। একেকটা মানুষ, একেকটা গল্প, একেকটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে রইলো।

কিছুই বলার নেই আজ। বিমর্ষ, বিক্ষুব্ধ, রাগ, দু:খ কোনটাই আর কাজ করছে না। একের পর এক হত্যা, খুন আমাদের জীবনের অংশ। গত কয়েকদিন ধরে সড়কে মানুষ খুন হয়ে যাচ্ছে মুড়ি-মুড়কির মতোন। সড়কে হত্যা এখন আমাদের প্রতিদিনকার আলু-পটলের মতোন। আমি জানি না যেসব পরিবার তাদের স্বজন হারায়, তারা কীভাবে বেঁচে থাকে! কেনই বা বেঁচে থাকে! আমার তো মনে হয়, তাদের আসলে মরে যেতেই ইচ্ছে করে।

আমার করে যে কারও মৃত্যুতে। যেমন আজ করছে। আমার কাকাতো বোন চন্দনা সেনগুপ্তা ওই ভবনেই চাকরি করে। জানতাম না আগে। বেঁচে ফিরে এসে যখন সে স্ট্যাটাস লিখলো যে ‘ভালো আছি’, তখন জানলাম। এরপর থেকেই ওর কোনো সাড়া নেই। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে সে। লিখেছে, চোখ বন্ধ করতে পারছে না, চোখের সামনে কয়েকজনকে লাফিয়ে পড়তে দেখেছে ও। বোনটা আমার নিজেই একটা গল্প। ছেলেকে নিয়ে তুমুলভাবে বাঁচে। ছেলে ছাড়া ওর আর কোনো জীবন নেই, ও যদি আজ নাই হয়ে যেতো?

নাহ, আমি ভাবতে পারছি না। সাকি ফারজানার এক বোন আগুনে শেষ হয়ে গেছে। ওর ছবি দেখলাম, বাচ্চা কোলে, স্বামীর সাথে। কী সুন্দর পরিপাটি জীবন! শেষ হয়ে গেল। সহকর্মি কারও কারও পোস্ট দেখলাম, তাদের বন্ধু রাতুল লাফিয়ে পড়েছিল। এবং শেষ। পর্শিয়ার টাইমলাইনে সেই রাতুলের ছবি দেখলাম, বন্ধুত্বের আনন্দমাখা ছবি, হাসিময় ছবি। এখন স্মৃতি হয়ে গেল সব।

চকবাজারের আগুন এখনও জ্বলছে মনে। সেই যে দুটি মেয়েকে আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, একুশের প্রহরের আগে নাই হয়ে গিয়েছিল শিল্পকলা থেকে ফিরতি পথে। অনেকদিন পর সেই মেয়ে দুটিকে পাওয়া গেছে, ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে, তালিকায় থাকা নামের কাতারে। ওরা কবিতা পড়তো বেঁচে থাকতে। সাজতো সুন্দর পরিপাটি করে, শাড়ি পরতো ভালো লাগার মতোন করে।

চকবাজার, নিমতলীর ঘটনায় সবাই পুরান ঢাকার সরু গলি আর ঘনবসতিকে দায়ী করেছে। এখন তো খোদ অভিজাত এলাকায় ঘটলো। প্রশস্ত সড়কের ওপর। এখন কাকে দোষ দেবো আমরা? নাহ, সবাইকে দেখলাম উৎসুক জনতাকে দোষ দিচ্ছে। আসলে একটা রাষ্ট্রের সব ব্যবস্থা যখন ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ কোনকিছুর ওপরই ভরসা করতে পারে না। তবে বাঙালীর ওই ঔৎসুক্যও অনেক বিপত্তির সৃষ্টি করে, অতীতেও আমরা দেখেছি। সেইসাতে এইসব মানুষই যে হাতে হাত লাগিয়ে কাজে নেমে যায়, তাও দেখেছি। সব সম্ভবের দেশ আমাদের বাংলাদেশ।

ঢাকায় থাকতে প্রায়ই বহুতল ভবনের কাছ দিয়ে যাবার সময় নিচ থেকে ওপরে তাকিয়ে দেখতাম, কেমন লাগে দেখতে। মনে হতো, ভবনটি যদি কখনও কাত হয়ে পড়ে, তাহলে কী দুর্দশাই না ঘটবে? অথবা যদি ভূমিকম্প হয়! আমার মনের ভিতরে সবসময় কু ডাকে এসব নিয়ে। ছোটখাটো ভূমিকম্পগুলোতে আমি আমার ছয়তলা বাসা ছেড়ে কোথাও নামিনি। ছেলে ডাকাডাকি করলে বলতাম, পড়লে সবার ওপরেই পড়বো। কাজেই নামার দরকার নেই। সবসময় একটা আতংকের মাঝে বাস করতাম ওখানে। কম দামি বাসায় থাকতে গিয়ে ভবনে ফাটল থাকার পরও কোথাও সরিনি। আসলে বলা চলে সরার সামর্থ্য আমার ছিল না। বন্ধুদের বলতাম, মৃত্যুর এমন সুযোগ আমি হাতছাড়া করবো নাকি?

কিন্তু আজ চোখের সামনে যে দৃশ্যটা দেখলাম, তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। অমন করে মানুষকে পড়তে দেখেছিলাম এনটিভি ভবনে আগুন লাগার পর, আর দেখেছিলাম তাজরীন গার্মেন্টসে আগুন লাগার পর। টেলিভিশন লাইভে চোখের সামনে মানুষ লাফ দিয়ে দিয়ে এসে মরে যাচ্ছিল। ভাবা যায় আজকের এই যুগে এসেও?

আপনারা যারা দেশের উন্নয়নের কথা বলেন, তারা আসলে কীসের ভিত্তিতে এই উন্নয়নকে মাপেন? ব্রিজ, উড়াল সেতু, কালভার্ট দিয়ে? মানুষের জীবন সেখানে স্থান পায় না আপনাদের উন্নয়নের মাপকাঠিতে? আর কতো সহমতের অবস্থান আপনারা নেবেন? নিজের শরীর বা আপনাদের প্রিয়জনের শরীর আগুনে অঙ্গার না হওয়া পর্যন্ত? লোভটা কমান, মানুষ হোন, মানবিক হোন। ক্ষমতাপন্থী না হয়ে মানুষপন্থী হোন, নিজেও বাঁচবেন, প্রিয়জনও বাঁচবে। মানুষই যদি না বাঁচে, তবে এই ক্ষমতা বা উন্নয়ন দিয়ে কী করবেন আপনারা?

শেয়ার করুন:
  • 115
  •  
  •  
  •  
  •  
    115
    Shares

লেখাটি ৪৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.