ডিবি পুলিশের এ কেমন আচরণ!

0

শরীফা বুলবুল:

আমার মা খুব অসুস্থ। তাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। এ খবর পাওয়ার পর এক মিনিটের সিদ্ধান্তে গত শনিবার (২৩ মার্চ, ২০১৯) অফিস শেষ করে রাত ১২টার বাস ধরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম। রোববার (২৪ মার্চ) সারাদিন মায়ের সঙ্গে কাটিয়েছিলাম। তবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাত ১২টা ১০ মিনিটের হানিফ পরিবহনে (বাস নম্বর-৯৬৮৬, টিকিটে কোচ-৪৬৬ ডিএইচকে) চট্টগ্রামের দামপাড়ার এসি কাউন্টার থেকে ঢাকায় রওনা দিই।

ঠিক সময়ে বাস ছাড়লো। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের সিটি গেটে হঠাৎ বাসটা থামিয়ে দেয়া হয়। দেখলাম ডিবির পোশাক পরা দুজন বাসে উঠে তল্লাশি শুরু করলেন। তবে কেন যেন আমার দিকে তাকিয়ে তাদের একজন চেহারাটা শক্ত করে ফেললেন।

শরীফা বুলবুল

রুষ্টগলায় বললেন,
-আপনার পরিচয়? আপনি কি একা? সঙ্গে কেউ আছে? আপনার বাড়ি কোথায়?
এসব অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিব্রত বোধ করছিলাম। তারপরেও উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলাম।

এরপর আবারো প্রশ্নের ঝড়- অভদ্রভাবে বললেন,
– কী করেন? কোথায় যাচ্ছেন? বললাম,
– দৈনিক ভোরের কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার। যাচ্ছি ঢাকায়। এ কথা বলার পর- তার দাঁতমুখ যেন আরেকটু শক্ত হয়ে গেল। বললেন,
-সাংবাদিকতা করেন, তো কার্ড দেখান!
একথা শুনে আরো বিব্রতবোধ করছিলাম। চরম অস্বস্তিবোধ নিয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে কার্ড খুঁজতে থাকলাম। কিন্তু পাচ্ছিলাম না। শেষে ব্যাগে থাকা ভিজিটিং কার্ডগুলো বের করে একটা কার্ড তার হাতে দিলাম। কিন্তু এতে তাকে আরো বেশি অসহিষ্ণু মনে হলো।

কমান্ডের সুরে খানিকটা ধমক মিশিয়ে বললেন,
-কার্ড দেখাতে হবে। কার্ড বের করেন।
নিরূপায় হয়ে আমি বললাম,
– তড়িঘড়ি করে আসতে গিয়ে আমি ব্যাগ চেঞ্জ করেছি। সম্ভবত ছেড়ে আসা ব্যাগেই রয়ে গেছে আমার আইডি কার্ডটি। আর আমার কথা বিশ্বাস না করলে কিংবা আপনার সন্দেহ হলে আমার এডিটর শ্যামল দত্তকে ফোন দিতে পারেন।
এ কথা শুনে যেন তেলে বেগুনে জ্বলে গেলেন। আমার দিকে বিশ্রিভাবে তাকালেন। মনে হচ্ছিল, আমার কপালের বড় লাল টিপটি মনে হয় তার কাছে বড় সমস্যা! চরম অভদ্রভাবে বললেন,
– দেখেন যেন গণজাগরণ মঞ্চের অবস্থা না হয়!
আকস্মিকভাবে গণজাগরণ মঞ্চের প্রসঙ্গ আসতেই আমি খানিকটা রিঅ্যাক্ট করলাম।
– মানে কী? গণজাগরণ মঞ্চের কথা আসছে কেন এখানে? ঠিক সেই মুহূর্তে লোকটাকে আমার রাজাকারের বাচ্চার মতো মনে হলো। মাথা গরম হয়ে উঠলো। তবুও নিলর্জ্জের মতো কথা ঘুরিয়ে শাউট করে বললো,
-আপনার আর কোনো ব্যাগ আছে? এদিকে রাগে আমার গা জ্বলছে। বাধ্য হয়েই বললাম,
-আছে, নিচের ল্যাগেজ বক্সে। এ কথা শুনে সে বললো,
-আপনার ল্যাগেজ তল্লাশি করা হবে। নামেন।

আমি বিস্ময়ে হতবাক, চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে সবকিছু যেন গুলিয়ে ফেলছিলাম। কিছুটা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তখন রাত প্রায় সাড়ে বারটা। ঠাণ্ডা আর সর্দিতে ভুগছিলাম কয়েকদিন ধরেই। তার ওপর গত রাতের জার্নির ক্লান্তি- মায়ের অসহায় মুখ- সবমিলিয়ে কেমন অস্থির লাগছিল। তারপরেও মনে হলো দেখি না কী করে ওরা? সিট থেকে উঠে যখন নামতে যাচ্ছি, এমন সময় হেলপার এসে বললেন,
-ম্যাডাম আপনাকে আর নামতে হবে না। জানতে চাইলাম,
– কেন? হেলপার বললেন, ওদের বস আমাদের বাস ছাড়ার অনুমতি দিয়েছেন। আপনি গিয়ে বসে সিটে।
বাসভর্তি মানুষের মধ্যে আমার সামনে পেছনে কয়েকজন নারীও ছিলেন। তবে তাদের কাউকেই কোনোকিছু বলা হয়নি। সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে ঘটনা দেখছিল। একজন সাংবাদিকদের সঙ্গে ডিবি পুলিশের আচরণ দেখা সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছে। ড্রাইভার হেলপারও বলছিল, ম্যাডামের সঙ্গে ওরা অতিরিক্ত করে ফেলেছে। সামনে সিটে হিজাব
পরা এক নারী যাত্রী (তিনিও একা) এগিয়ে এসে বললেন, আপা ওরা জানতো আপনি কোনো পেশায় আছেন। তারপরও ইচ্ছে করেই এমন অন্যায় আচরণ করলো।

জীবনে এই প্রথম সাংবাদিকতা পেশার পরিচয়ে কেমন সংকোচ লাগছিল। বাস চলছিল আর আমি ভাবছিলাম, ওই ডিবি পুলিশ কেন অপ্রাসঙ্গিকভাবে গণজাগরণ মঞ্চকে টানলেন? সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ক্ষিপ্ত হলেন? কেনই বা আমার লালটিপের দিকে ওভাবে ঘৃণার দৃষ্টি ছুঁড়লেন? এমন প্রতিক্রিয়া তো একমাত্র প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যেই দেখা যায়। তারাই তো সাংবাদিক আর গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলেছে। তবে কি ডিবি পুলিশের মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের সহযোগিরা লুকিয়ে আছে? কেউ কি এই ‘ভয়ঙ্কর’ ডিবি পুলিশের পরিচয় দিতে পারবেন?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 142
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    142
    Shares

লেখাটি ৪৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.