আমিই কেন অনন্যা?

0

নাজমুন নাহার:

সকল অসম্ভবে আছে আলোর সম্ভবনা! আমরা সবাই স্বাধীন! আলোর মিছিলে বেরিয়ে আসুন!

অনন্যা পদকটি স্পর্শ করার সাথে সাথে জেগে উঠলো অপূর্ব আলোর ঝলকানি! যে আলোটা দেখার জন্য আমি পথ হাতড়ে পৃথিবীর অনেক অন্ধকার পথে খুব সাবধানি পায়ে পার হয়েছিলাম!

যেদিন আমি মৌরিতানিয়া থেকে আঠারো ঘন্টা জার্নি করে আসার পর রোসো বর্ডার ক্রস করে যখন
সেনেগালের সেন্ট লুই টাউনে পথ হারিয়ে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিলাম, ঘন্টা দুয়েক ওই টাউনে হাঁটার পর মনে হচ্ছিলো কখন আমি একটু আলো দেখতে পাবো, সেদিন আমি হতাশ হইনি সেই অচেনা পথে অচেনা টাউনে!

যেদিন আইসল্যান্ডের ভলকানিক সামিট থেকে নেমে আসার পর ল্যান্ডমাননা লুগাড় পাথরের ভ্যালিতে হারিয়ে একা একা পথ খুঁজে না পেয়ে অনেক উঁচু একটা পাথরের উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা উঁচু করে চিৎকার করে বলছিলাম, হেল্প মি! হেল্প মি বলে! অনেকক্ষণ পর দূর থেকে একটা ছেলে আমাকে দেখতে পেয়ে তার গায়ের সাদা টি-শার্ট উড়িয়ে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে ইশারায় আমাকে পথ দেখিয়েছে!

যেদিন গিনিতে হঠাৎ মধ্য রাত তিনটায় গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে অন্ধকারে আটকা পড়েছিলাম, সেদিন আকাশের তারার আলোতে পথ খুঁজে খুঁজে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে আড়াই ঘণ্টা পর শেষ রাতে এক আদিবাসীর বাসার সামনে আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেদিন ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমার আশেপাশে তাকিয়ে দেখি কোনো খাবার নেই, শুধু কাঁচা কমলালেবু দেখা যাচ্ছিলো গাছে, সেটাই খেয়ে বেঁচে থেকেছি দু’দিন!

আমি যখন লাল সবুজের পতাকা হাতে সাহারা মরুভূমিতে অভিযাত্রা করেছি কখনো ৫৬ ডিগ্রি কখনো ৪৬ ডিগ্রিতে ক্ষত শরীরের চামড়ার উপর ক্ষত হয়েছিল, রক্তাক্ত হয়েছিল প্রচণ্ড দাবদাহ আর ধুলো ঝড়ের আঘাতে, সেদিনও থামিনি মরুর উঁচু ভ্যালিতে যেতে! শুধু তাই নয়, নর্ডিক আল্পসে মাইনাস ৫৬ ডিগ্রিতে হাতের আঙ্গুল অবশ হয়ে গিয়েও কিছু দিনপর সেই কঠিন অবস্থা থেকেও আমি বেঁচে উঠেছি!

মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছি ১৪২০০ ফুট পেরুর রেইনবো মাউন্ট সামিটে উঠার সময়! কিন্তু হাল ছাড়িনি, মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করে পতাকা হাতে সেদিন উঠেছিলাম সর্বোচ্চ চূড়ায়!

আফ্ৰিকাতে তিন মাস ইয়াম আলু, সেদ্ধ কচুর ছড়া, কখনও গরুর কাঁচা মাংস, কিউবাতে দুর্গম এলাকায় আঠারো ঘন্টা পথে আটকে থেকে শুধু এক টুকরো আখের রস খেয়ে ছিলাম! আবার কখনও কখনও না খেয়ে বেঁচে থাকা, কোনো কিছুই আমাকে দুর্বল করেনি! আমি কখনো কখনো পর্বতের পুষ্টিকর বাতাসের নির্যাস খেয়ে বেঁচে ছিলাম!

আমি যখন কিরগিস্তানের আলা আর্চা মাউন্ট সামিট থেকে ফিরে আসছিলাম, পাহাড়গুলো এতোই খাড়া ছিল যে হঠাৎ আমি পা পিছলে যেয়ে পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটি বুনো গাছ ধরে বেঁচে ছিলাম! ঝুলে ছিলাম অনেকক্ষণ, সেদিন ফ্রান্সের দুটো ছেলে জুলিয়ান আর আইমেরিক ঝুলে থাকা আমাকে টেনে তুলেছিল!
পাহাড়ের পাথরের খোঁচা লেগে রক্তাক্ত, ব্যথাযুক্ত হাত নিয়ে হাসি মুখে বেঁচে ফিরেছি তারপরও!

আমি উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডা যাওয়ার পথে গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়ে জংলি গাছের নিচে, জোঁক আর সাপের খোপের জঙ্গলে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে দু’ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল মধ্যরাতে, সেদিন আমি দেখেছি প্রকৃতি আমাকে কীভাবে কায়দা করে বাঁচিয়ে রেখেছিল!
সড়ক পথে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মাইল পাড়ি দিয়েছি, কখনো অন্ধকার রাতে, কখন ভোরের আলোতে পৃথিবীর অনেক দেশের বর্ডার ক্রস করেছি, পথ হারিয়ে পথ খুঁজে নিয়েছি!

লাইবেরিয়া থেকে সড়ক পথে আইভরি কোস্টে যাওয়ার পথে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তেরোটি ভয়ঙ্কর কূপ পার হওয়ার সময় পোকার কামড় খেয়ে রক্তাক্ত হয়েও কঠিন সীমান্ত পার হয়েছি!

অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রীফের সমুদ্রের তলদেশ থেকেও লবণাক্ত পানি খেয়ে বেঁচে এসেছি!

সাউথ আফ্রিকার জোহান্স বার্গে বতসোয়ানার ইতুমেলেং আমার মুখে কালো কাপড় জড়িয়ে আমাকে গুলির হাত থেকে বাঁচিয়েছে!

আর জর্জিয়ার সোনেটি প্রদেশে যাওয়ার পথে পাহাড়ি গ্রামবাসী আর পুলিশের গুলির মুখোমুখি হয়ে প্রায় চার ঘন্টা পাহাড়ের মাটির সাথে বুক বিছিয়ে শুয়ে ছিলাম, পকেটে শুধু একটা চকলেট ছিলো সেটা খেয়ে পানির তৃষ্ণা মিটিয়েছি!

জীবনের এই জার্নি আমাকে কখনো শেষ করেনি, আমাকে শিখিয়েছে, আমার জীবনটাকে মূল্যবান করে তুলেছে!

বাসায় ফিরে মায়ের হাতে এনে যখন অ্যাওয়ার্ডটা তুলে দিলাম, মা হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলছে, তোমার এই অভিযাত্রা অনেক কঠিন, কিন্তু এই কঠিনের মধ্যে তুমি যে নিজেকে বাঁচাতে শিখে গেছো সেজন্যই তুমি আজকের অনন্যা!

১৯৯৩ থেকে এখন পর্যন্ত বিগত সাতাশ বছর অনন্যা শীর্ষ দশ সম্মাননা দিয়েছে ২৫০ জন কৃতি নারীকে! যে সন্মাননাটি পেয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, তারামন বিবি, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, রমা চৌধুরী, বিবি রাসেল, রুনা লায়লা সহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের কালের সেরা সংগ্রামী নারীরা। এইসব আলোকিত নারীদের তালিকায় একই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হলাম আমিও! এই সকল আলোকিত নারীদেরকে যিনি খুঁজে নিয়ে এসেছেন তিনি বাংলাদেশের আরেক মহিয়সী নারী তাসমিমা হোসেন! শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা এই মানুষটির জন্য!

যারা আমাকে আজকের একজন অনন্যা হয়ে উঠতে সহযোগিতা করেছেন তাদের তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, যারা আমার পথে ঢিল ছুঁড়েছেন, আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছেন তাদেরকেও স্যালুট! আমি জেনে গেছি কীভাবে ভয়হীনভাবে এই পৃথিবীতে প্রত্যয় নিয়ে বাঁচতে হয়!

আমি ছোটবেলা থেকেই প্রশস্ত চিন্তা নিয়ে বড় হয়েছি, নিজেকে বড় করে ভাবতে শিখেছি, সাহস মনোবল কখনো হারাইনি তাই আজ সকল বাধা ডিঙিয়ে বাংলাদেশের পতাকা হাতে পার হয়েছি পৃথিবীর ১২৫টি দেশ, হয়েছি বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares

লেখাটি ১৮০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.