‘যে জীবন মানুষের’ (১ম পর্ব)

0

ফাহ্‌মিদা বারী:

(১ম পর্ব)
শেষরাতের দিকে ঘুমটা সবেমাত্র জমে এসেছিল নয়নের। তখনই বেজে উঠলো মোবাইলটা। ভীষণ বেরসিকের মতো, হুট করে আচমকা। একঘেয়ে রিংটোনটা যেন হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ হয়ে তীক্ষ্ণ একটা ছ্যাঁকা মেরে দিলো… একেবারে হৃৎপিণ্ড বরাবর!
কাঁচা ঘুমটা ভাঙার পরে একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো মাথায়। এই ভয়ানক অসময়ে ফোন বাজছে কেন?

ইদানীং ঘুমাতে যেতে যেতে প্রায়ই মাঝরাত হয়ে যায়। না, তেমন কোন জরুরি কাজে অবশ্য আটকে পড়ে না নয়ন। অহেতুক আলতু ফালতু এটা সেটা করে সময়গুলোকে শুধুমাত্র হাপিস করে দেয়। আর সবার মতো তো এতো দামী নয় ওর সময়। সস্তা সময়কে ব্যয় করতে তাই খুব বেশি ভাবতে হয় না।
প্রতিদিনের একই ধরাবাঁধা রুটিনেই আটকে গেছে জীবন। ক্লাস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরটাকে কিছুক্ষণের জন্য বিছানায় নিশ্চল আটকে রাখা। হিটারে চাল ডাল কিছু একটা চাপিয়ে ফেসবুকের অজানা, অদেখা কিংবা ক্ষণিকের চেনা মানুষগুলোর সুখ-দুঃখ আনন্দ বেদনাকে অখণ্ড মনোযোগে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মুখস্ত করে চলা। তাদের সুখী সুখী মুখগুলোর পেছনের লুকিয়ে রাখা অজানা গল্পটাকে হাতড়ে খুঁজে ফেরা। তারপরে কষ্টকর চিনচিনে ব্যথার একটা দীর্ঘশ্বাস হাওয়ায় মিলাতে মিলাতে নিজের জীবনের যোগ বিয়োগের খাতাটা শুরু থেকে আবার মেলাতে বসা। এই তো! এভাবেই চলে আসছে এতোগুলো দিন। মাঝে মাঝে ভয় হয় নয়নের। বাকি দিনগুলোও হয়তো এভাবেই পার হয়ে যাবে। প্রাপ্তির অঙ্কগুলোকে আর কাঁটাছেড়া করে নতুন কিছু বসানোর হয়তো আর ফুরসতই মিলবে না।
যদিও নামের সাথে এখনও ছাত্র উপাধিটা ঝুলে আছে, কিন্তু সেটার মেয়াদ ফুরোতেও আর বেশিদিন বাকি নেই। রেজাল্টটা হয়ে গেলেই এখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলতে হবে। তারপর আবার কোন নতুন ঠিকানায়, নতুন বেশে…অন্য কোন সফরে।

লেখক: ফাহমিদা বারী

রাতের ফোন কখনো সুসংবাদ বয়ে আনে না। এবারেও আনলো না।
অবশ্য নয়নের জীবনে দুঃখের খবরগুলো দিনরাত্রির বিভেদ মানেনি কখনো। যার যখন ইচ্ছে হয়েছে সময়জ্ঞান না মেনেই এসে ধরা দিয়েছে ওর কাছে।
এখনো চোখ বুঁজলে বটতলার ঘনপাতায় ঢেকে থাকা সেই ক্লান্ত দুপুরের ছবি একেবারে সটান ভেসে ওঠে চোখের সামনে। কী বার ছিল যেন সেদিন! সোম অথবা বুধবারই হবে। হাট বসেছিল গাঁয়ের বাজারে। গ্রামের বাজারে ঐ দুদিনই হাট বসে। লোকজনের বাকবিতণ্ডা আর চেঁচামেচি খোলা মাঠ পেরিয়ে ভেসে আসছিল বেশ অনেকখানি দূর থেকেও। শান্ত দুপুরে সেই অশান্ত অস্পষ্ট কোলাহলের মাঝে বসে নিজেকে কেমন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী বলে মনে হতো নয়নের।
নয়নের ছোটকাকু ভালো বাঁশি বাজাতে পারতো। অলস দুপুরগুলোতে বটতলায় বসে সেই বাঁশির সুর শুনতে শুনতে কেমন যেন নেশা ধরে যেত। কাকু তাস দিয়ে নানারকম খেলাও দেখাতে পারতো। নয়নের প্রিয় শখ ছিল ছোটকাকুর সাথে সময় কাটানো। চিন্তাভাবনাহীন ছোটকাকুর জীবনে পুরো সময়টাই বলতে গেলে অবসর। আর অবসরে মানুষ যেভাবে দুলকি চালে সময় কাটায়, নয়নের ছোটকাকুও ঠিক সেভাবেই সময় কাটাতো। বাঁশিতে সুর তুলে, তাস খেলে, খেলা দেখিয়ে আর বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা মেরে। নয়নের খুব হিংসা হতো ওর ছোটকাকুকে। মানুষ চাইলেও যা পায় না, তা যতই তুচ্ছ হোক না কেন…সেটার আকর্ষণের মায়া কাটানো এত সহজ নয়।
ছোটকাকুর মতো জীবন কাটাতে চাইলে বাবা মেরে ওকে একেবারে তক্তা বানিয়ে দেবে। পড়াশুনা কিংবা কাজকর্ম না করে মানুষ কীভাবে এত শুয়ে বসে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে দিন কাটাতে পারে…তা নয়নের বাবা কিছুতেই বুঝতে পারতো না। ছেলেকে ভাইয়ের অতিরিক্ত সংসর্গ থেকেও সরিয়ে রাখতে চাইতো তার বাবা। সেটি অবশ্য পারতো না কিছুতেই। ছোটকাকুর মতো ওমন ফুরফুরে জীবন না কাটানো যাক, সেই জীবনের কিছুটা স্পর্শ পাওয়া গেলেও তো চলে! তাই ছোটকাকুর সাথে একেবারে সেঁটে থাকতো নয়ন। একটাই তো মোটে জীবন! প্রিয় মানুষগুলোর সাথে সেই জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেওয়া গেলে বেশ হয়।

কাকু বাঁশি বাজানো শুরু করার আগে কিছুক্ষণ দম মেরে বসে থাকতো। বেশ অনেকটা সময় চুপ করে থেকে কী যেন চিন্তা করে নিত। তারপরে বুক ভরে বার কয়েক শ্বাস টেনে নিয়ে শুরু করতো। নয়ন বহুদিন জিজ্ঞেস করেছে,
‘চুপ কইরা কী ভাবো কাক্কু?’
ছোটকাকুর চোখদুটো খুব সুন্দর। মায়াময় টানা টানা। নয়নের কতদিন মনে হয়েছে, কেন যে ওর নিজের নাম নয়ন! আর কাকুর নাম বাদল! নয়ন নামটাতো কাকুকেই মানায়! কাকু অবশ্য তার চোখ নিয়ে খুব লজ্জায় থাকতো। এমন চোখ নাকি মেয়েদের থাকলেই বেশি ভালো দেখায়। ছেলেদের এমন হরিণমার্কা চোখ থাকাটা খুব লজ্জাকর ব্যাপার। তার বন্ধু বান্ধবরা নাকি ‘লেডিজ মার্কা চোখ’ বলে তাকে বেজায় খেপায়। সুর করে ছড়া কাটে।
নয়নের প্রশ্ন শুনে সেই চোখে রাজ্যের মায়া মেখে ছোটকাকু বলতো,
‘সুরটারে বুকের মইধ্যিখানে বসাইয়া নেই আগে। পরে না বাঁশিতে তুলুম। বুঝিস না ক্যান রে গাধা!’
নয়ন অনেকদিন ছোটকাকুর কাছে বায়না ধরেছে বাঁশি শেখার জন্য। কাকুকে রাজি করাতে পারেনি। কী এক অদ্ভূত যুক্তি দেখিয়ে কাকু বলতো,
‘বুকের ওপরে ম্যালা চাপ পড়ে রে পাগলা! বাঁশি শিইখা কাজ নাই। মন দিয়া লেখাপড়া শেখ। কামে দিব!’
নয়ন সাথে সাথে প্রশ্ন করতো,
‘তাইলে তুমি শিখলা ক্যান?’
‘ধুর! আমি কি তোর মতো শিক্ষিত নাকি রে! অশিক্ষিত মাইনষের এটা ওটা না শিখলে চলে না।’

কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। নয়নের ছোটকাকু এসএসসি ফেল করেছে দু’বার। তারপরে কেটে গেছে বেশ অনেকগুলো বছর। বাদল আর পড়ামুখো হয়নি। দু’বার এসএসসি ফেল করলে তবু নাকি কিছুটা মানসম্মান অবশিষ্ট থাকে। তিনবার ফেল করলে সেটুকুও জলাঞ্জলি দিতে হয়। আর নয়ন তখন গাঁয়ের স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ে। তবু বাদলের চোখে নয়নই বেশি শিক্ষিত। কারণ তার সামনে আরো এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। দু’বার এসএসসি ফেল করলে সেই রাস্তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। আর এগুনোর সম্ভাবনা থাকে না।

বাদলের বাবা-মা অর্থাৎ নয়নের দাদা-দাদী, বাদলের জন্মের মাত্র কয়েক বছরের মাথাতেই পটাপট পটল তুলে ফেলেছে। বাপ মা হারা বাদলকে নয়নের বাবাই একরকম কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে। নয়নের সাথে তার বয়সের ব্যবধান মাত্র এগারো বছর। নয়নের বাবা মা-ই তার ছোটকাকুর একরকম অলিখিত বাবা মা। বোকাসোকা আলাভোলা গোছের বাদলকে নয়নের মাও খুব স্নেহ করতো। দু দু’বার এসএসসি ফেল করে বাড়ি থেকে কিছুদিনের জন্য পালিয়ে থাকতে হয়েছিল বাদলকে। নয়নের বাবা পরীক্ষার আগেই কড়া সমন জারী করে দিয়েছিল,
‘এইবার যদি পাশ করবার না পারোস বাদলা, তাইলে বাড়িত ঢুকবার পারবি না! খবরদার কইলাম! পিটাইয়া তর হাড়হাড্ডি দুই জায়গায় কইরা ফেলুম!’
আতিপাতি করে খুঁজেও যখন রেজাল্ট বোর্ডে নিজের নামটা পাওয়া গেল না, তখন আর বেশি ঝামেলায় না গিয়ে কিছুদিন হাওয়া হয়ে ছিল বাদল। আশেপাশের বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে নিজেই রটিয়ে দিয়েছিল, পরীক্ষায় পাশ করতে না পেরে বাদল আত্মাহুতি হয়েছে। তাকে আর কোথাও খুঁজে লাভ নেই।

নয়নের বাবা এই খবর শুনে হার্টফেল করতে করতে বেঁচে গেছে। অনুশোচনা আর অনুতাপে তখন তার পাগলপারা দশা। নয়নের মাও কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ঢোল বানিয়ে ফেলেছিল। নয়নের বাবাকে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলেছিল,
‘আপনের নিজের মা মরা ভাই! এমন শক্ত কথা কইলেন সেই ভায়েরে! সে কোন মুখে বাড়িত আইবো? আইজ যদি সত্য সত্যই সে উল্টাপাল্টা কিছু কইরা থাকে, পারবেন আপনে নিজেরে মাফ করতে?’
নয়নের বাবা তখন আধমরা। চোখের সামনে যাকেই পাচ্ছে তাকেই ধরে অনুনয় বিনয় করে বলছে,
‘ওরে বাবা…আমার বাদলারে নিয়া আসো গো বাবাসোনারা! আমি কি সত্যি সত্যিই ওরে এমন দিব্বি দিছি নাকি? ওরে আমার ভাইরে…তুই এইটা কী করলি রে ভাই আমার…বাপ-মা’র কাছে আমারে দোষী বানাইয়া গেলি…’
নয়নের বাবা-মা’র চোখের পানি তাজা থাকতে থাকতেই অবশ্য বাদলের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। বন্ধুদের ঘাড়ে চড়ে বিরাট রাজ্যজয়ী রাজার মতো এসে বাড়িতে আবার তার অভিষেক ঘটেছে। নয়নের বাবা চোখের পানি রগড়ে মুছে নিয়ে কটমটে শুকনো চোখে চেয়ে থেকে কাঠ কাঠ গলায় বলেছে,
‘নাটক তাইলে ভালোই দেখাইলি বাদইল্যা! আচ্ছা দেখা…এক মাঘে শীত যায় না, জানিস তো!’
নয়নের মা স্নেহভরা প্রশ্রয়ের কণ্ঠে তার বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছে,
‘নাটক দেখাক আর যাই দেখাক…নিজের ভাই…মাফ কইরা দ্যান। পড়ালেখা সবাইরে দিয়া হয় না। আপনার পোলারে বানাইয়েন জজ- ব্যারিস্টার!’
‘হ বানামুই তো! তোমার পারমিশনের দরকার আছে নাকি আমার? এই গাধারে কও, সে আমার কুন কামে আইবো? এদ্দিন খাইয়াইলাম, পরাইলাম…ওহন নিজের ভাগ বুইঝা শুইনা নিয়া যা পারে করুক! আমি কি ওর জমাজমি আগলাইয়া রাখোনের যখ হইছি নাকি?’

পড়ালেখা না হয় না হোক, নয়নের বাবার ইচ্ছে ছিল ভাইকে অন্তত নিজেদের জমাজমি দেখাশুনার কাজে লাগিয়ে দেবে। তাদের বাবার রেখে যাওয়া জমির উত্তরাধিকার তো তারা দু ভাই-ই। আর সেই জমির পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। ভালোভাবে দেখেশুনে রাখতে পারলে অনায়াসেই তাদের দু’ভাইয়ের দুই তিন বংশধর খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে।
কিন্তু এখানেও বিধি বাম। ছোটভাই এমনই অকর্মার ঢেঁকি যে সেই কাজটিতেও তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো না। দিনরাত টই টই করে ঘুরে বেড়ানো আর বাঁশি বাজানো ছাড়া তাকে দিয়ে আর কিছুই হয় না। নয়নের বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। ভাই যদি বেলা থাকতে থাকতে নিজের ভাগ ভালোভাবে বুঝে শুনে না নেয়, তাহলে দু’দিন পরে মানুষেই তাকে কান ভাঙ্গানি দেবে যে…বড়ভাই কিছুই দেয়নি। শুধু ভাতে কাপড়ে রেখে দিয়েছে।

স্কুলের ওপরের ক্লাসে পড়া নয়নও বাবার মনটাকে সেভাবে বুঝতে পারতো না। এই অতিরিক্ত শাসন আর ধমকাধমকির পেছনের লুকিয়ে থাকা সত্যটা সেই বয়সে কিছুতেই ওর কাছে ধরা দিত না। ছোটকাকুর প্রতি বাবার শাসনের খড়গটাকে নয়নের কাছে সবসময়ই ভারী মনে হতো। একজন মানুষকে এভাবে জোর জবরদস্তি করার কী আছে? যার যেভাবে ভালো লাগে, তাকে সেভাবেই থাকতে দেওয়া উচিত। যখন সময় আসবে, ছোটকাকু নিশ্চয়ই তার দায়িত্ব ঠিকভাবেই পালন করবে।
কিন্তু সেই সময় যে এতো তাড়াতাড়িই এসে যাবে, সে কথা কে কবে ভাবতে পেরেছিল?
হয়তো নয়নের বাবাই তো কোনভাবে জেনে গিয়েছিল। তাইতো ভাইকে স্বাবলম্বী বানানোর পেছনে তার চেষ্টা এতোটা অটুট ছিল।
ছোটকাকু’র বাঁশিতে সেদিন কিছুতেই সুর উঠছিল না। বারকয়েক চেষ্টা করে হাত থেকে বাঁশি ফেলে দিতে দিতে কাকু বলেছিল,
‘কিছুই বুঝলাম না রে নয়ন! বাঁশি আজ আমার বুকের মইধ্যিখানের সুরটারে ধরবারই পারতাছে না! বাঁশি এমন বেয়ারা হইলো ক্যান আজ…কিছুই বুঝলাম না!’

বাদল অবাক হয়েই তাকিয়ে ছিল মাটিতে ফেলে রাখা তার বাঁশির দিকে। সে তখন যেন সত্যি সত্যিই তার বাধ্যগত বাঁশির হঠাৎ এমন বেয়ারাপনার কারণ খুঁজতে ব্যস্ত ছিল। সেই সময়ই দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ছুটে এসেছিল পবন, নয়নের বাবার জমাজমির হিসাব রক্ষক। প্রতি হাটবারে সে নয়নের বাবার সাথে হাটে আসতো। ফসলের দরদাম করতো। বিছন কিনতো। ভালো দাম পেলে ফসলাদি বিক্রি করতো।

পবনের বয়স বাদলের মতোই। হয়তো কিছু একটু বেশির দিকেই। গায়ে গতরে শক্তসমর্থ। তার পেটে কিছু বিদ্যেপানিও ছিল। জমাজমির হিসাব নিকাশ সে বেশ ভালো বুঝতো। খাটাখাটনিও করতে পারতো প্রচুর। তবু নয়নের বাবা’র খুব ইচ্ছে ছিল, তার ছোটভাই বাদলই এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিক। নিজের জিনিসকে মানুষ যেভাবে মমতা দিয়ে আগলে রাখে, পর কি আর সেভাবে রাখতে পারে?
পবনের বাড়ি এই গাঁয়েই। তার বাপ ঠাকুর্দাও একসময় নয়নের দাদা-পরদাদার জমাজমির কাজ করতো। সেসব ছিল নেহায়েত শ্রমিকের কাজ। তাদের বংশে পবনই কিছু লেখাপড়া শিখেছিল। সে পাশের গ্রামের কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে। তার বংশে এ পড়ালেখাটুকুই অনেক বেশি। তাই আর বেশিদূর এগুনোর মতো সাহস সে কুলিয়ে উঠতে পারেনি। বংশের ধারা মেনে নিয়ে সেও শেষমেষ নয়নের বাবার কাছেই ফিরে এসেছিল। আর নয়নের বাবাও তাকে তার শিক্ষার যোগ্য সম্মান দিয়েছে। কুলি মজুরের কাজ থেকে তার উত্তরণ ঘটেছে। হাতে কলম উঠে এসেছে। জীবনযাত্রার মান এক ধাক্কায় অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে।

বিশাল শক্তপোক্ত শরীরটা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসছিল পবন। নয়ন আর বাদল হাঁ করে তাকিয়ে ছিল সেদিকে। চব্য লেহ্য খেয়ে খেয়ে গায়ে গতরে এই ক’বছরে যথেষ্ট গোশত লেগেছে পবনের। দৌড়াতে বেশ ভালোই কষ্ট হচ্ছিলো।
নয়নের মনের মধ্যে কোন অশুভ সম্ভাবনার ইঙ্গিতমাত্রও ছিল না। একটু আগেই সে বাড়ি থেকে এসেছে। বাড়ির রোয়াকে পেতে রাখা চেয়ার টেবিলে বসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে উঠোনে মা’র কুমড়ো বড়ি দেওয়া দেখছিল। কুমড়ো ছেঁচে ছেঁচে মাশকলাইয়ের ডালের সাথে মিশিয়ে বড়ি বানানোর পরে রোদে শুকোতে দেওয়া পর্যন্ত সবগুলো ধাপ সে বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখে। মা কেমন নিটোল হাতে করে সবকিছু! নয়নের খুব ভালো লাগে দেখতে।

বাবা খেয়ে দেয়ে একটু আগেই হাটে গিয়েছে। হাটে যাওয়ার আগে প্রতিদিনের মতোই অনুপস্থিত ছোটকাকুকে উদ্দেশ্য করে বকাঝকা করছিল বাবা। মা সেসব শুনেও শুনছিল না। শুধু শেষমেষ না থাকতে পেরে একটু উষ্মামাখা গলাতেই বলেছিল,
‘দয়া কইরা এইবার আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে রওয়ানা দ্যান। প্রতিদিন এমন কইরা নিজের ভাইরে গালমন্দ করেন। মাইনষে শুনলে কইবো, না জানি কী কষ্টে আছে এনে! আমরা জানি তারে কতই অত্যাচার করি!’
‘মাইনষের কথায় আমার কী যায় আসে নয়নের মা? মাইনষে কি আমার ভাইরে খাওয়াইয়া দাওয়াইয়া এত্ত বড় বানাইছে…নাকি আমি বানাইছি? মাইনষের বেশি দরদ উথলাইয়া উঠলে মাইনষেই দ্যাখুক! আমি দূরে বইসা তালি মারি! আইছে মাইনষের গপ শুনাইতে…’

এসব বাকবিতণ্ডা নয়নদের বাড়ির নিত্যদিনের আলাপে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। প্রতিদিন একবার করে হলেও ছোটকাকুর নাম নিয়ে বাবার হৈ চৈ করা চাই। নয়নের খুব মন খারাপ হতো। ছোটকাকুর জন্য খুব কষ্ট হতো ওর। বাবা কেন যে ছোটকাকুকে প্রতিদিন এতো গালমন্দ করে! কোনদিন যদি কাকু আবার বাড়ি ছেড়ে চলে যায়! সেই একবার যেমন গিয়েছিল…সেইরকম! আর যদি কখনো ফিরে না আসে!
নয়ন অনেক ছোট ছিল তখন। তবুও দেখেছিল, সেইবার বাবা কত কেঁদেছিল কাকুর জন্য! ইনিয়ে বিনিয়ে সবার কাছে কত কাকুতি মিনতি করেছিল! কী জানি…হয়তো ওর বাবার মনেও কোন কষ্ট থেকে থাকতে পারে। সেজন্যই বাবা এভাবে নিজের আদরের ছোটভাইকে প্রতিদিন বকাঝকা করতো। কিন্তু বাবার সেই কষ্টটুকু বোঝার মতো বয়স তখনো হয়ে উঠেনি নয়নের। ওর ভালো লাগতো না প্রতিদিনের এই খ্যাঁচখ্যাঁচ। দূরে কোথাও গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে মন চাইতো।

ছোটকাকুর অবশ্য এসব গালিগালাজ মোটেও গায়ে লাগতো না। বড়ভাই যখন বকাবকি’র ঢিল ছুঁড়তে থাকতো, ছোটকাকু তখন ফিসফিস করে নয়নের সাথে গল্প করতো। কিংবা নিচের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতো। নয়ন জিজ্ঞেস করতো,
‘বাবা তোমারে এতো বকে, তোমার খারাপ লাগে না কাক্কু?’
ছোটকাকু চোখ পাকিয়ে বলতো,
‘তোর বাপ তরে যখন বকে, তোর খারাপ লাগে?’
‘হুম লাগেই তো!’
‘কতখানি লাগে?’
‘বেশি না…প্রথমে একটু লাগে। পরে ঠিক হইয়া যায়!’
ছোটকাকুর মুখে হাসি ফুটে উঠে। উদ্ভাসিত মুখে বলে,
‘এই তো! ঠিক কইছিস রে পাগলা!… আমারও তাই হয়। যেদিন ভাইজান খুব বেশি বকে, একটু খারাপ লাগে। পরে আর মনেই থাকে না! ভাইজান তো আমার ভালার লাইগাই বকে রে!’
তারপরে একটু চুপ করে থেকে বলে,
‘তোর যেমন বাপ লাগে…আমার লাগে ভাই। আমার তো নিজের বাপ নাই গা…তাই ভাইজানই আমার বাপ! বাপের কথা বেশিক্ষণ গায়ে লাগে না!’

কাজেই এটুকু হৈ চৈ ওদের বাড়িতে স্বাভাবিক ঘটনাই ছিল। বকাঝকা শেষ করে মুখে এক টুকরো তিক্ত ভাব ঝুলিয়ে নিয়ে বাবার হাটে যাওয়া…মা’র মুখে লেগে থাকা স্নিগ্ধ শান্তি…উঠোনজুড়ে সোনাঝরা শীতের রোদ…বাতাসে ভেসে বেড়ানো সর্ষে ফুলের ঝাঁঝালো সুবাস। কোথাও কোন অস্বাভাবিকতা কিংবা ছন্দপতন ছিল না।

তবু আজ দিনটাই বুঝি কেমন! নিয়মের মাঝে যখন টুকটাক অনিয়ম এসে জড়ো হয়, তখন কেমন যেন অস্বস্তি বোধ হয়। চিরকালের বাধ্য ছোটকাকুর বাঁশি আজ একটুও সুর তুললো না। মনটা ভালো লাগছিল না নয়নের। ছোটকাকুর মতো সেও নিজের অজান্তেই এর কারণ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আর এরই মধ্যে…পবনদা’র এই হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসা! এর মাঝেও কী যেন একটা অস্বাভাবিকতা ছিল!

(ক্রমশঃ)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৭১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.