একটা ঝড় তোল প্রজন্ম!

0

সুপ্রীতি ধর:

আমি নির্বাক, আক্ষরিক অর্থেই। আমার ফেসবুক আবারও ব্যান, এবার একমাসের জন্য। অপরাধ তো আমার পুরনোই। প্রবাসে বসে দেশের বা বিশ্বে যখন এতোকিছু ঘটে যেতে দেখছি, ঠিক তখন আমার এই নিস্তব্ধতা নিজেই মানতে পারছি না। হাত নিশপিশ করে, জানতে ইচ্ছে করে সেইসব দলকানা ও মৌলবাদীদের (শুধু ধর্মীয় নয়) মনোভাব, যারা গত আগস্টে আমাদের তুলোধুনো করে দিয়েছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সমর্থন জানানোয়, আমাকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল গালিগালাজে ভরে উঠেছিল তাদের টাইমলাইন! তারা এবার কী বলছে?
অনেককেই চুপ থাকতে দেখছি, হয়তো তাদের ঘর এখনও নিরাপদ, তাই তারা কফি হাতে টিভির রিমোট কন্ট্রোলে চোখ রাখছে। কিন্তু একদিন জানি, তারাও আমাদের সাথেই শামিল হবে, তবে অনেক রক্ত ঝরানো শেষে। দেরি হয়ে যাবার পর।

দেখতে পাচ্ছি, শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নেমেছে। আমি তাদের পূর্ণ সমর্থন জানাই। আবারও তাদের ওপর খড়্গ আসবে জানি, কিন্তু দমে যায় না যেন এই বাচ্চারা। এরই মধ্যে কিছু দলকানা সাংবাদিক তাদের অস্বস্তির কথা লিখতে শুরু করেছে, ওরা যেন এদের দিকে না তাকায়, না শোনে এদের কথা।

আনজিলা জেরিন আনজুম লিখেছেন, “ঐশীর চোখের সামনে হইসে এক্সিডেন্ট। সে বর্ণনা দিল। দুই বাসের একসাথে চাপা লাগার পরেও আবরার শুরুতে মরে নাই। সে চেষ্টা করতেসিলো বাসের তলা দিয়া বাইর হওয়ার। ওই শুওর তাও বাস থামায় নাই। ছেলেটার মাথার উপর দিয়া বাস চালায় আগায়ে গেসে। মাথা থেইকা পাঁজর পর্যন্ত পুরা কিমা। খুলি থ্যাঁতলায়ে রাস্তায় মগজ পইড়া ছিল.. ছড়ায়ে ছিল..

ছেলেটার বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। প্রতিদিন ছেলেরে বলতেন বাবা জীপে নামায় দিয়াসি। ছেলে রাজি হইত না। বন্ধুদের সাথে ভার্সিটির বাসে যাবে জন্যে। কালকেও বাসে তুলে দিতে আসছিলেন। পিছনেই দাঁড়ায় ছিলেন। চোখের সামনে দেখসেন..”

গতকাল থেকে বার বার আবরারের মুখটি ভেসে উঠছে, সেও শরিক হয়েছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে, সেও চেয়েছিল একটি নিরাপদ জীবন। কিন্তু হায়! সেই সড়কেই সে চলে গেল। বাবার সামনে। ক্ষমতাধর ব্রিগেডিয়ার হয়েও বাবা তাকে বাঁচাতে পারেননি সড়কের ওই দানবদের হাত থেকে, যে দানবেরা তৈরি হয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা, লোভ, দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারে। যাদের পেছনে রাষ্ট্রের সমস্ত কালোশক্তি এক হয়ে রক্ষাকবচ হয়ে আছে!

আমি জানি না, এই বাবা, যে তিনি একটু একটু হাঁটা শিখিয়েছিলেন ছেলেকে, সেই তিনি চোখের সামনে পিষে যেতে দেখেছেন নিজেরই রক্তকে। সেই তিনি কীভাবে সামাল দিবেন বাকিটা জীবন, আদৌ দিতে পারবেন কীনা, নিশ্চিত নই। যে মা তার তিল তিল শক্তি দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন সন্তানকে, যে তিনি ছেলে বাসায় না ফেরা পর্যন্ত উদগ্রিব হয়ে অপেক্ষা করতেন, সেই মা এখন কী নিয়ে বাঁচবেন! তারা কি আসলেই বেঁচে থাকবেন? এই যে একটু একটু করে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে অগণিত মানুষের মৃত্যু ঘটছে শারীরিক ও মানসিকভাবে, এই যে মানসিকভাবে মৃতদের মিছিল একটু একটু করে দীর্ঘায়িত হচ্ছে, এই মিছিল রুখবে কে? ভুখা-নাঙ্গাদের মিছিল বেয়নেটের ডগায় রুখে দেয়া যায়, কিন্তু যে মানুষ জীবোন্মৃত, তাকে মারবে কোন বেয়নেট? আছে কি এমন অস্ত্র কোথাও?

আবরারের ছবিটা আমি দেখছি, বার বার দেখছি। একপাশ থেকে মুখটা দেখি। চোখের পলকে দেখেছিলাম রাস্তায় পড়ে থাকা আবরারকে, রক্তে মাখামাখি। স্ক্রল করে পাশ কাটিয়ে গেছি, এই ছবি সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। সেই থেকে ও আমার সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। আমার ঘুম, আমার দৈনন্দিন কাজকর্ম।
আমিও মা, আমারও নাড়িতে টান পড়েছে ওর ওই ছবি দেখে। আমার ছেলের সাথে অনেক মিল তার, ও তো আমারও ছেলে। পৃথিবীর সব বাবা-মা যেমন আমার, তেমনি সব সন্তানেরাও আমারই।

একটা ছবি দেখলাম, সত্যি বলছি, এরপর থেকে বেশ ঘেন্না লাগছে নিজেকেই। ঢাকা উত্তরের নতুন মেয়র আবরারের রক্তের দাগ না মুছতেই একটা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে ফেলেছেন। কী আশ্চর্য! জানতে ইচ্ছে করে, উনার নিজের কি ছেলেমেয়ে আছে? পারতেন উনি নিজের সন্তান হারানোর একদিন পরই এরকম একটি ঘটনা ঘটাতে? ক্ষমতা মানুষকে এমনই অন্ধ করে দেয়? নাকি উনি আদতেই অন্ধ? অবশ্য অন্ধ না হলে এমন একটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে দায়িত্ব নিতে রাজী হতে পারতেন না। ধিক, শতধিক এই মেয়রকে!

আরেকটা কথা না বললেই না। ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস কোনো সমাধান না। ঢাকা শহরে অনেক সড়কে এগুলো আছে, যদিও সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী একেবারেই। সবার আগে পরিবহন সেক্টর থেকে দুর্নীতিবাজ, লোভীদের হটাতে হবে। একে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই।

আমি একজন মা হয়ে আন্দোলনরত প্রজন্মের পাশে দাঁড়িয়ে বলছি, তোমরা কেউ ঘরে ফেরো না। ‘ফিরে যাও বাবারা’ বলে কেউ যদি তোমাদের ফিরে যেতে বলে, তোমরা শোনো না ওদের কথা। উপযুক্ত জবাব ওদের দিয়ে দাও। জানি তোমাদের ওপর নেমে আসবে আবারও নানান অত্যাচার, নির্যাতন। কিন্তু একটা রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দিতে তোমাদের বিকল্পও যে নেই!

একটা ঝড় তোল প্রজন্ম, তুমুল ঝড়। যে ঝড়ে উড়ে যাবে সমস্ত অন্যায়, অন্যায্যতা, অপরাধ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2K
    Shares

লেখাটি ৪,৬৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.