বিয়েটা আসলে কী!

0

সামিনা আখতার:

জাবি ক্যাম্পাস! এই শব্দটা উচ্চারণের সাথে সাথেই জাবির ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ করে যারা অনেকদিন আগে এই প্রাণের ক্যাম্পাসটা ছেড়ে গেছেন তাদের কেমন লাগে, তা কেবল সেইসব ছাত্রছাত্রীরাই জানেন। জাবির কোনো ভাল খবরে প্রাণটা যেমন নেচে ওঠে, খারাপ খবরেও মনটা তেমনি খারাপ হয়ে যায়।

খবরের আসল কারণ-অকারণ কতটুকু জানি অথবা জানি না, সে হিসাব বাদ দিয়ে দুটো ছেলেমেয়ে, বিশেষ করে মেয়েটির বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে চলছে বিষোদ্গার! এই নুতন প্রজন্মেরই একটা অংশ যুক্তি, অন্যান্য সমাজের সাথে তুলনা ইত্যাদি বাদ দিয়ে সেই যুগ যুগ আগে কী বলা হয়েছিল তাকেই আঁকড়ে আছে।

এই বিষোদগারের বিরুদ্ধেও আসছে অনেক বিশ্লেষণধর্মী লেখা, মন্তব্য ইত্যাদি। নতুন প্রজন্মের এই অংশটা যেকোনো উপদেশবাণী, চলে আসা নিয়ননীতি বিনা বাক্যে মেনে নিতে নারাজ।
আমি এই তর্ক-বিতর্কতে আশার আলো দেখি। সমাজের জন্য ঠিক কোনটা সঠিক নিয়ম, নীতি, পদ্ধতি সেটি একদিনে একজন ব্যক্তির ঠিক করার বিষয় নয়। তাই এই লেখনীর বিতর্ক চলতে থাকুক। এভাবেই আমরা খুঁজে পাবো সঠিক পথ। এই বিতর্ক একটি গণতান্ত্রিক পন্থা। কারও মতামতকে অশ্রদ্ধা নয়, কারও মাথা ঘাড় থেকে ফেলে দেয়া নয়, বরং চলুক না বিতর্ক দিনের পর দিন, বছরের পর বছর!

এবার জাবির ঘটনা আর এর পর সামাজিক মাধ্যমে সয়লাব হয়ে যাওয়া মতামতের প্রেক্ষিতে আমি আমার দেখা/শোনা দুটো ঘটনার উল্লেখ করবো;

এক-
বাংলাদেশে গত ২০ বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে কাজ করার সুবাদে বিদেশি অনেক নারী এবং পুরুষ সহকর্মীর সাথে কাজ করতে হয়েছে। এতে করে তাদের নিজ নিজ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, জীবন ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানার সুযোগ হয়েছে। এদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ পুরুষ বসের কথা আজ বলবো (তার নাম, সংস্থা ইত্যাদি না হয় নাই বললাম)-
আমি বাংলাদেশ থেকে যখনই তাকে ফোন বা মেসেজ দিতাম কাজের জন্য, অনেক সময়ই তার উত্তরগুলো ছিল এরকম; “আমি এখন আমার মেয়েকে খাওয়াচ্ছি, পরে ফোন করছি” আমি মেয়েটাকে বেবি কেয়ার থেকে তুলতে যাচ্ছি, পরে ফোন করছি ইত্যাদি। তারপর সে যখন বাংলাদেশে এলো কার্যক্রম দেখতে, তখন ১০/১২ দিন আমরা ঢাকা, কক্সবাজারসহ আরও অনেক এলাকায় ঘুরে বেড়ালাম। এই ১০/১২ দিনে কাজের কথা ছাড়া যে একটি বিষয়ে সে খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলেছে, সেটি হলো তার ছোট্ট মেয়েটির কথা, যে মেয়েটির প্রথম জন্মদিন পালন হবে, যেদিন সে ফিরে যাবে সেদিন।

কক্সবাজারে কথার এক ফাঁকে আমি যখন তাকে বললাম, তোমার স্ত্রী আর কন্যাকে নিয়ে বেড়াতে এলে ওরা খুব আনন্দ পাবে। তখন সে বললো, দেখো, এশিয়ার এই দেশগুলোতে এলে আমাদেরকে মিথ্যে বলতে হয়। কারণ আমরা এখনও বিয়ে করিনি, আর বিয়ে না করে একসাথে থাকাটা তোমরা ভালভাবে নাও না। আমি অবাক হয়ে গেলাম। প্রশ্ন করাতে সে জানালো, ইংল্যান্ডে ব্রিটিশদের ৯০% কেই পাওয়া যাবে যাদের বিয়ের আগেই এমন সন্তান আছে। আরও জানালো যে বিয়ে নামের এই চুক্তিটা মূলত গুরুত্বপূর্ণ হয় সম্পত্তি ভাগের জন্য। আমার উৎসাহ বেড়ে গেল ওদের সম্পর্কে জানবার। জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, এই সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত তোমরা কখন নিলে, কেমন করে নিলে?

সে জানালো যে সন্তান ধারণের এক বৎসর আগে তার বান্ধবী তাকে জানায় তার সন্তান নেয়ার ইচ্ছের কথা, কিন্তু তখন সে নিজে ইচ্ছুক নয় বলে জানায়। এভাবে আরও এক বছর পর তারও যখন মনে হয় সন্তান নেয়ার কথা, তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেয়।

আহা, দুটি মানুষ, একজন নারী আর একজন পুরুষের ভালবাসার আর মন দিয়ে চাওয়ার ফসল এক কন্যা সন্তান! এই দুটো মানুষের এই সম্পর্কটাকে যদি বিশ্লেষণ করি, কী আছে এদের মধ্যে! শুধু পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং ভালবাসা ছাড়া!

অন্যদিকে আমাদের পরিবার এবং বিয়েগুলোকে যদি দেখি তাহলে কী দেখবো, ৩৫ লক্ষ টাকার দেনমোহর, আগুন মাঝখানে রেখে মন্ত্রের পর মন্ত্র আওড়ানো, পাকের পর পাক সাত পাক ঘোরা, তাতেও হয় না, দুজনের আঁচল এমনভাবে গিঁট বেঁধে দেয়া হয় যেন আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে দুটো মানুষকে একখানে বাঁধবার। তাও থাকে না! ছুটে যায়, কেবলই ছুটে যায়! আর যারা আছেন বা থাকেন, তারা কতটুকু শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর ভালবাসা নিয়ে আছেন, তা হলফ করে বলা মুশকিল! কারণ এইসব স্বামী-স্ত্রীর মাথার উপর আছে একদিকে ধর্মের খড়্গ, আর অন্যদিকে হরর মুভির মতো সমাজের ভয়ঙ্কর মুখ।

যাওয়ার সময় আমার সেই বস বললো, সে তার মেয়ের জন্য কিছু কিনতে চায়। আমি তাকে নিয়ে গেলাম আড়ং। নকশী করা একটা বড়সড় হাতি তার পছন্দ হলো। শুড় আর গায়ে নানান রঙের সুতা আর চুমকির কাজ করা একটা কালো হাতি আর এক কন্যার জন্য অন্ত:প্রাণ এক বাবাকে হয়তো আমি কোনদিন ভুলবো না!

দুই
২০০৮ এ প্রথম আলোর নারীমঞ্চ এ প্রকাশিত আমার গল্পটা ছিল এরকম-

পাবনার বেড়া এলাকায় স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থায় ক্যান্টিনে রাঁধুনির কাজ করে নুরুন নাহার। তার বয়স যখন ১৯-২০ বছর, তখন এলাকায় নির্মাণাধীন মধুমতি ব্রিজে কাজ পেয়েছিল স্থানীয় ও অন্যান্য এলাকা থেকে আসা অনেক শ্রমিক।
কুড়িগ্রাম থেকে আসা শ্রমিক আবু বক্করের সাথে বাবা বা অন্য অভিভাবকহীন নুরুন নাহার এর বিয়ের ব্যবস্থা করে স্থানীয় শ্রমিক আর অন্যান্য মুরুব্বিরা। নুরুন্নাহারের কোলে যখন ২১ দিনের এক সন্তান তখন আবু বক্কর ঐ এলাকা ছেড়ে চলে যায়।নুরুন নাহারের অপেক্ষার পালা শেষ হয়, যখন সে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে আবু বক্করের অন্য স্ত্রী আর সন্তান আছে। যখন তার সাথে কথা হচ্ছিল, তখন তার বয়স ৩৬। অনেকবার বিয়ের প্রস্তাব আসলেও নুরুন্নাহার আর বিয়ে করেননি।

তার ভাষায়, “ওতে কী আছে, তা আমার জানা হয়ে গেছে!”
নুরুন্নাহারের ছেলেও অনেক বড় হয়েছে। প্রাইমারি পর্যন্ত পড়িয়ে আর পড়াতে পারেননি, একটি অটোমোবাইলের দোকানে চাকরি পেয়েছে।

নুরুন নাহারের সন্তান অবৈধ নয়, যদিও বাবার দাবি বা দায়িত্ব নিয়ে কেউ কোনদিন তার সামনে এসে দাঁড়ায়নি।
যারা তার বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল, তাদের কাছে এখন গেলে হয় তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, অথবা বলে ‘এ তোর ভাগ্যে ছিল’! তবুও এই সমাজ পুরুষটিকে বলবে না তুমি পতিত পুরুষ, ব্যভিচারক, তুমি স্বামী বা বাবা নামের কলঙ্ক!

উপরের গল্প দুটোর সাথে যদি আমাদের চিন্তাধারাকে যদি মিলাই, কী পাওয়া যাবে?

আমরা একজন নারী আর পুরুষের যৌনসম্পর্ক করার ক্ষেত্রে তারা ঘোষণা দিল কি দিল না অর্থাৎ বিয়ে করলো কি করলো না, তার উপর যতটা গুরুত্ব দেই, তার একশত ভাগের একভাগ গুরুত্বও দেই না তাদের যৌন সম্পর্কের পর তার শারীরিক, মানসিক আর সামাজিক প্রভাব আর সন্তান হলে তার দায়িত্বের উপর। এ নিয়ে আমাদের শিক্ষা তো দূরের কথা, কথা বলাই বারণ।

অথচ বিয়ে আসলে কী! বিয়ে হলো একজন নারী আর একজন পুরুষের একসাথে থাকার সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রের খাতায় নথিভুক্ত করা। পরবর্তীতে সম্পত্তি আর সন্তানের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রেই যার প্রয়োজন বেশি। বিয়েতে সাক্ষী একটা বড় ব্যাপার, অথচ ওইদিনের পর সারাটা জীবন এই দুজন নারী পুরুষের সব সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্না, দায়-দায়িত্ব সব এই দুজনেরই। ওই সাক্ষীগণ এর বিন্দুমাত্র কাঁধে নেন না।

আমি বলছি না ঐ নথিভুক্তির দরকার নেই, কিন্তু সে সিদ্ধান্তও নিতে দিতে হবে ঐ প্রাপ্তবয়স্ক নারী আর পুরুষকেই। আর নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক আর স্বাধীনভাবে নিতে হলে ঐ বিষয়ে শিক্ষা জরুরি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলতে “যৌনতা” আর “অভিভাবকত্ব” বিষয়ক শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন নারী অথবা পুরুষকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া উচিত যে যৌনসম্পর্ক পুরোপুরি তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, এর সিদ্ধান্তও তার নিজের এবং এর পরবর্তী ফলাফলের দায়িত্বও তাকেই নিতে হবে।

সমাজের যে অংশটা এই ধরনের কথায় ভয় পেয়ে যান, তাদেরকে বলি; বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে চোখ মেলে দেখুন স্বাধীনতা থাকায় তাদের রাস্তাঘাট যে শুধু যৌন কার্যক্রমে সয়লাব, তা কিন্তু নয়। বরং শিক্ষা, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতে তারাই এগিয়ে চলেছে। তারাই বরং জানে একজন ভালো বাবা বা মা হওয়ার জন্য ধর্মের অনুশাসন, আইন কোনটিই পূর্বশর্ত নয়, পূর্বশর্ত হলো একজন দায়িত্বশীল ভাল মানুষ হওয়া। আর এর জন্য চাই শিক্ষা এবং সামাজিকীকরণ।

শুধুমাত্র চাপের মাধ্যমে এক গুমোট সামাজিকীকরণ চলতে থাকলে সদ্য পৃথি্বীতে আসা সন্তান পৃথিবীর আলো না দেখে আবার ট্রাঙ্কের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। তারপর ধীরে ধীরে নীল হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে! এই ধরনের সমাজেই এই ‘সম্মান রক্ষার হত্যা (Honour killing)’ বেশি হয়। যতটা খবরে আসে তার চাইতেও বেশি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 52
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    52
    Shares

লেখাটি ৭২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.