নিজের পরিচয়েই সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার সাহস করো মেয়ে

0

ডা. ফাহমিদা নীলা:

বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে দুর্ঘটনাবশতঃ সন্তানের আগমন, অতঃপর তাকে সবার অলক্ষ্যে জন্মদান এবং ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করা। পুরো ব্যাপারটাই আমাকে এতোটাই আহত করেছে যে এই মুহূর্তে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। এইরকম অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী আমি। আমরা। যারা নিয়ত সন্তান আকুতি আর সন্তান সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করি।

অনেকক্ষণ চিন্তা করলাম। কেন আমার এতো অস্থিরতা? কেন এক নিঃশব্দ হাহাকার আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।

উত্তর আমি নিজেই দিয়ে ফেলেছি কিছুক্ষণ আগে। আমরা সন্তানের জন্য হাজারও মায়ের আকুতি দেখেছি, দেখছি প্রতিনিয়ত। তাই যখন কেউ এসে নির্দ্বিয়ায় জানায়, গর্ভের সন্তানটি সে রাখতে চায় না, তখন অজান্তেই বিরক্তি ফুটে উঠে চোখেমুখে, রুষ্টতা স্পষ্ট হয়ে উঠে কন্ঠে।

‘তবে কেন? সন্তান না চাইলে এ খেয়ালিপনা কেন? দেশে কি জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার এতোটাই অভাব?’
তেনারাও রুষ্ট হোন আমার কথায়। তাদের জীবন, তাদের জরায়ু, তাদের সন্তান, আমার এতো কথা কেন? আমাদের এতো মাথাব্যথা কেন?

আহারে মেয়েরা, কেন তা যদি তোমরা বুঝতে! নিঃসন্তান মায়ের আহাজারি দেখেছো কখনো? দেখেছো হাহাকার? শুধু একটি সন্তানের জন্য আকুলতা! বোঝার চেষ্টা করেছো কখনো সমাজ-সংসারের তীক্ষ্ণ ফলায় তার ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বুকের প্রতি মুহূর্তের রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা?

ক’দিন আগে একজন নারী এসেছিল আমার চেম্বারে। দশ বছরের সংসারে সন্তানের মুখ দেখেনি। সে কাঁদতে কাঁদতে এসে আমার পা ধরে বসে পড়লো,
‘ম্যাডাম, আমাকে যেভাবে পারেন, একটা বাচ্চার ব্যবস্থা করে দেন। কীভাবে বলে ইঞ্জেকশন পুশ করে বাচ্চা হয়, তাই করে দেন। আমার অনেক কষ্ট, একটা বাচ্চা আমার খুব দরকার।’

ওর আহাজারি দেখে যে কারও চোখে জল আসবে। আমরা তো পাষাণ হয়ে গেছি। ওর মতো শত-হাজার নারী এমনিভাবেই হাহাকার করে ফিরছে। আর তোমরা? ইচ্ছে হলো, বাঁধহীন প্রেমের জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দিলাম। তারপর ভুল করে আসা অনাহুত সন্তানকে টেনে-হিঁচড়ে নিজের শরীর থেকে বের করে ছুঁড়ে ফেললাম আস্তাকুঁড়ে।

আশ্চর্য্যের ব্যাপার কি জানো? এ কাজটা তোমাদের মধ্যে কোন অনুশোচনা বা অনুতাপের সৃষ্টি করে না। নিঃশঙ্কোচে কত ব্যাখ্যা দাও,
‘বাচ্চা ছোট ছিল ম্যাডাম। কী করবো?’
‘বাচ্চার বয়স কত?’
‘চার বছর।’
আর কিছু বলার আছে? চার বছরের ছোট্ট বাচ্চা আছে বলে চার মাসের পেটের বাচ্চাটাকে খুন করে ফেলার কী সুন্দর সোজাসাপ্টা ব্যাখ্যা! মাঝে মাঝে রাগ করে বলে ফেলি,
‘দুটোর একটাকে খুন করতে হলে কোলেরটাই করেন না কেন? একই তো কথা!’

সপ্তাহখানেক আগে এক দম্পতি এলো। দোকান থেকে বাচ্চা নষ্ট করার ওষুধ খেয়ে রক্তস্রাব শুরু হয়েছে। এখন ক্লিয়ার হলো কিনা জানতে এসেছে।

জিজ্ঞেস করলাম,
‘নষ্ট করলে কেন প্রথম বাচ্চা?’
অকপটে চট করে জবাব দিল,
‘আমি তো স্টুডেন্ট! কেন নিব?’
‘স্টুডেন্ট হয়ে তাহলে বিয়ে করেছো কেন? প্রথম ইস্যু নষ্ট করার পর তোমার যদি আর বাচ্চা না হয়! তখন?’
উত্তর দিল না। কেমন একটা নির্লিপ্ত ভাব চেহারায়।

মনে করিয়ে দিলাম,
‘এই যে তোমার স্বামী দোকান থেকে ওষুধ এনে খাওয়ালো বাচ্চা নষ্ট করার জন্য, যেদিন বাচ্চা চাইলেও হবে না, সেদিন কিন্তু ও আর তোমাকে চিনবে না। একবারও মনে রাখবে না, সেই ওষুধ তুলে দিয়েছিল তোমার মুখে।’
ছেলেটার দিকে তাকাইনি। সাধারণত রোগীর পুরুষ সঙ্গীর দিকে তাকাই না আমি। মেয়েটা একটু অর্থপূর্ণ চোখে তাকালো সঙ্গীর দিকে। এবার তাকিয়ে দেখলাম, সঙ্গী মাথা নিচু করে আছে। কিছুক্ষণ পর আমার এসিস্ট্যান্ট এসে বললো,
‘ম্যাডাম, মনে হয় বিয়েই হয়নি।’

অবাক হলাম না। এমন ভুরি ভুরি দেখি। নতুন কিছু নয় তো! পরদিন জরায়ুতে আটকে পড়া গর্ভের বাদবাকি অংশ ডিএন্ডসি করে বের করার পর ক্লিনিকের ম্যানেজার জানালো, আসলেই সে বিবাহিত নয়।
‘কীভাবে বুঝলে?’
‘ম্যাডাম, ভর্তি ফর্ম পূরণের সময় স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করতেই পাশে থাকা ছেলেদের দিকে তাকালো। পরে এক ছেলে এসে স্বামীর নাম বললো।’

আহারে মেয়ে! অবাধ স্বাধীনতার যুগে বয়ফ্রেন্ডের সাথে একান্তে সময় কাটাতে পারো, তার সন্তান গর্ভে ধারণ করতে পারো, নিঃশঙ্কোচে সেটা নষ্টও করতে পারো, আর সন্তানের পিতা হিসেবে তার নামটা উচ্চারণ করতে এতো দ্বিধা! পারমিশন নেয়ার জন্য তার দিকে তাকাতে হয়? এখনও বোঝ না মেয়ে, তোমার অবস্থানটা কোথায়?

শোনো মেয়েরা, ভালবাসো, প্রেমে পড়ো, চুটিয়ে ডেট করো, কিন্তু নিজের সীমানাটা ঠিক রাখো। নিজের চারপাশের লক্ষণরেখা স্পষ্ট করে রাখো, সঙ্গীর জন্য দৃশ্যমান করে রাখো। চারপাশে এতো এতো উদাহরণ দেখেও কেন শেখো না তোমরা? কেন বোঝো না, প্রেম করা আর দায়িত্ব নেয়া এক জিনিস না। বয়ফ্রেন্ডের দায়িত্বশীলতার উপর আস্থা রেখে নিজের ব্যাপারে দায়িত্বহীন হয়ো না। মনে রেখো, ভীড়ের স্রোতে হাত ধরে রাখা সহজ। স্রোতের উল্টোদিকে চলতে গেলে পা পিছলাবেই। কাজেই সে পথে হাঁটার আগে নিশ্চিত হয়ে নিও বিপরীতমুখী স্রোতে ভেসে গেলে সঙ্গী তোমার হাত শক্ত করে ধরে থাকবে তো! নাকি সে নিজের জীবন বাঁচাতে স্রোতের অনুকূলে গা ভাসিয়ে হারিয়ে যাবে জনসমুদ্রে?

ভেবে দেখেছো কখনো? না, আমার ও ওরকম না। আমার ও খুব ভালো। আমাকে খুউব ভালবাসে। মেয়ে, তুমি ভালোবাসার চিনেছো কী? এতো ভালোবাসে যে পুরুষ, সে নিজের ভালোবাসার ফুলকে ছিঁড়ে ফেলতে চায় কেন? আর তুমি? তুমি নিজে বোঝো, ভালোবাসা কী? বুঝলে তুমি মা হয়ে পারতে নির্মমভাবে নিজের ভালোবাসার উপহারকে বলিদান দিতে? নিজেকেই কি ভালোবাসতে পেরেছো তুমি? নাড়ি ছিঁড়ে যে ধন ফেলে দিলে অবহেলায়, তাকে ভালবাসতে পেরেছো?

তাহলে খামাকা ভালোবাসার দোহাই দিও না আর। যেদিন নিজের গর্ভে ধারণ করা সন্তানকে মাথা উঁচু করে জন্মপরিচয়সহ দুনিয়াতে নিয়ে আসার সাহস অর্জন করবে, সেদিন জরায়ুর ব্যবহার করো। আর নইলে নিজের সন্তানকে নিজের পরিচয়ে বড় করার শক্তি ধারণ করো। তোমাদের ভালোবাসার লোকদেখানো মিথ্যে টানাটানিতে আর কোন দেবশিশুকে বলিদান দিও না।

প্লিজ। সময় থাকতে সাবধান হও মেয়েরা। নইলে ধর্ম, সমাজ, পরিবার, এমনকি নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতেও লজ্জায় মাথা নত হয়ে যাবে। মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়াও। সামনে এগিয়ে যাও। কোন পাপবোধ সাথে নিয়ে নয়, কোন কাপুরুষের সাথে কদম মিলিয়ে নয়, এগিয়ে যাও আপন আলোয়, আপন শক্তিতে, আত্মমর্যাদা নিয়ে।

গাইনি বিশেষজ্ঞ
১৭/০৩/২০১৯ ইং

শেয়ার করুন:
  • 6.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
    6.9K
    Shares

লেখাটি ৮,০১০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.