আবছায়া

0

সোহানা স্বাতী:

মেয়েটার চোখ ভ্রমর কালো। দীঘির জলের মতো শান্ত। সবাই একই কথা বলে,’দেখেছো মীরা, তোমার মেয়েটার চোখ কথা বলে!’ কথা হয়তো বলে, অন্যরা সে কথার অর্থ কতটা বোঝে জানি না, কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত ওর চোখের ভাষা অনুবাদ করতে পারিনি।
কোনটা অভিযোগ, কোনটা অনুযোগ, কোনটা উচ্ছ্বাস, কোনটা বিদ্রোহ বুঝি না আমি। শুধু বুঝি ওর দৃষ্টিতে গভীরতা আছে, সে গভীরতায় আছে শুধু তলিয়ে যাওয়া। ওর চৌদ্দ বছরের মুখাবয়বেও এক আলাদা সৌম্যতা, মাঝে মাঝে মনে হয়, সে যেন আমার চেয়েও বেশী বয়সী। নীরবে সব বুঝে যায় সে, আমার অপারগতা আমার সীমাবদ্ধতা সবকিছু।

একটা পেপারে সাইন করে যেদিন সব দায় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সোহম, অনেকেই বলেছিল খোরপোশ দাবি করতে। সে তো স্বাবলম্বী, দিব্যি অন্য জনের সাথে থাকছে ইউকে’তে, অলিখিত সংসার। মেয়েটারও তো ভবিষ্যৎ আছে। আমি ভবিষ্যৎ চিন্তাকে সযত্নে সরিয়ে রাখি আমার সেই সাত বছরের মেয়ের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি থেকে। তখন ওর চোখের বোবা চাহুনিতে নানান প্রশ্ন। হঠাৎ কেন বন্ধ হয়ে গেল বাই এয়ারমেইল লেখা খাম আসা, নানান পার্সেল আসা। আর আমি শঙ্কিত ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মানিগ্রাম বন্ধ হলে কী হবে!

আমার কেবলই মনে হতো, পা নেই এমন কারও কাছ থেকে হঠাৎ যেন ক্র্যাচটা হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নেওয়া হলো। সোহমের উষ্ণতা, আলিঙ্গন এসবের চেয়েও বেশি অভাব বোধ করেছিলাম দৈনন্দিন খরচাপাতি মিটাবো কী করে! এতোদিনের ব্যবহৃত উদার চেক বইটা যেন অসহায় হয়ে পড়লো নিমিষেই, চেকমুড়ি গুলোর নীরব স্পর্শে শুধু এটাই বুঝেছিলাম জীবন ধারণের রীতিটা বদল হবে এবার।

সোহানা স্বাতী

প্রথম ধাক্কাটা পেল মেয়ে, নামী স্কুল থেকে যখন তাকে নিয়ে আসা হলো। জুন সেশন এসে অভিযোজন হলো ডিসেম্বরে, ইংলিশ মিডিয়াম রূপান্তরিত হলো ইংলিশ ভার্সনে। বন্ধুহীন, জৌলুসহীন, শখহীন, আনন্দহীন জীবনের সাথে মানিয়ে নিতে নিতে ওর চোখের ভাষায় এলো এক নির্লিপ্ততা। আমার তো কোন কিছুই ছিল না, বাবার টাকার জোর বা রূপের জোর কোনটাই না।
সেই না থাকার আক্ষেপ করার মতো সময়ও ছিল না। সার্টিফিকেটগুলো অনেকদিন পর বের হয়েছিল পুরনো স্টিলের আলমারি থেকে। পড়ে থাকা ল্যাপটপটার কী বোর্ডে খট খট আওয়াজ যেন সেদিন একটু বেশিই কানে বেজেছিল যেদিন প্রথম নিজের সিভিটা তৈরি করি। সম্ভাব্য সব জায়গায় দিয়েছিলাম। কোথাও থেকে কোন সাড়া আসেনি। ছয়টা মাসে যখন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তলানিতে হাত পড়েছে, ঠিক তখনই জবাব আসে এই এনজিও থেকে। এইডস প্রতিরোধে কাজ করতে হবে।

ওরা জানতে চেয়েছিল, ‘দেহপসারিণী থেকে সীমান্তের ট্রাক ড্রাইভার সব লেভেলেই কাজ করতে হবে, পারবেন তো?’
আমার তখন ভেবে দেখার সময় নেই পারা বা না পারার। টিকে থাকাই এক মাত্র লক্ষ্য তখন। টিকে গেলাম, কিন্তু সাত বছরে মেয়ের চোখের উচ্ছ্বাস ঢেকে গেল কাঠিন্যের আবরণে। স্কাইপে সোহমের সাথে যখন কথা বলে মেয়ে, আমি লুকিয়ে চুরিয়ে খেয়াল করি ওর চোখটা চকচক করে কিনা। সোহমকে স্ক্রিনে দেখলে আজও আমার ক্যামন জানি লাগে, দুর্দান্ত সেই দিনগুলো আজও পেছন থেকে টানে আমাকে। প্রান্তিক গেইটে প্রতিদিন সে দাঁড়িয়ে থাকতো আমার বাসের অপেক্ষায়, বটতলার কাঠের বেঞ্চে দুজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শীতের পাখির কাকলীতে যখন মুখরিত ক্যাম্পাস, ঝিলের জলে পাখিদের সুখী অবগাহন, তখন আমার কাজল চোখের গভীরে সুখ আবিষ্কারের নেশায় নেশাতুর সে। নেশার ঘোর কাটতে সময় লেগেছে মোটে আট বছর। আট বছরে জানান দিয়েছে, কোন বাঁধনই তার কাছে টেকসই নয়। একঘেয়েমি তাকে বাঁধতে পারবেনা কোন ভাবেই।

বিয়ে সন্তান এসব বাঁধনে আমিই বেঁধেছিলাম তাকে। উদাসীন মানুষ সে, গোছানো শুধু একটা জায়গায়, সেটা তার ক্যারিয়ার। পিএইচডির চিঠিটা হাতে পেয়ে সে একটা কথাই বলেছিল, ‘মীরা আমাকে যদি সংসারে মন দিতে না হতো, তবে এই চিঠিটা আমি আরও আগে পেতাম।’ দূরত্বটা বুঝে গিয়েছিলাম সেদিনই। বুঝেছিলাম, তাকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার সাধ্য আমার নেই, এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিও তাকে আর ফেরাতে পারেনি দেশে।

বাবার মেধা আর আমার কাজল চোখের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে মেয়েটা আমার সামনে দিয়ে নীরবে ঘুরে ফিরে, খুব কম কথা বলে, কোন চাওয়া নেই, আক্ষেপ নেই।
ইদানিং ওকে ভয় করে আমার, ঠিক যেমন মাকে ভয় পেতাম সেই তরুণী বেলায় সোহমের প্রেমে যখন আকণ্ঠ ডুবে যাই। ইদানিং অফিস থেকে যেদিন আশফাকের কাছে যাই, ফিরতে দেরি হয় আমার। সহজভাবে তাকাতে পারি না আমি, মনে হয় ঐ চোখ জোড়া আমাকে পড়ে ফেলবে নিমিষেই। ও রাত জেগে পড়াশুনায় ব্যস্ত থাকে সামনে স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার জন্য। আমি নিজের ঘরে চলে যাই নিঃশব্দে।

আয়শা খালা মশারি টানিয়ে দেবার সময় বলে, ‘মেয়েকে সব খুলে বলো। বুঝমান মেয়ে তোমার, সে ঠিক বুঝবে।’ আমি পারি না কিছুতেই। বাবা যা সহজে পারে, মায়ের কাছে তা পর্বত ডিঙ্গানোর সমান। সন্তানের দায়ভারের দাগ শুধু শরীরে না, মায়ের মনেও চেপে থাকে আমৃত্যু।

আশফাকেরও একই কথা, ‘কথা বলো মেয়ের সাথে। তার চেয়ে কে বেশি বোঝে তোমাকে?’ প্রতিবার একই জবাব আমার, ‘এসব সাংসারিক জটিলতায় আমি ফেলতে পারবো না মেয়েকে, এমনিতেই সে বিধ্বস্ত। এই বেশ আছি। তোমার সাথে দেখা বা কথা হচ্ছে না, এমন তো না।’

আজও দেরিতে ফেরা। সারাদিনের ক্লান্তিতে নুয়ে আসে শরীর। ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিতে বলি আয়শা খালাকে। না মেলা পুরনো হিসেবটা আবার মেলাতে চেষ্টা করি, সেই যে ছেলেবেলায় শেখা ধারাপাত … দুই এক্কে দুই , দুই দুগুণে চার … ভাঙ্গা পরিবারে কক্ষণো দুই দুগুণে চার হয় না… সেখানে কেবলই পাঁচ হয়ে যায়। নিঃশব্দে ঘরে ঢোকে মেয়ে, তবুও ওর পায়ের চেনা শব্দটা বুঝি আমি, যেমন অনুভব করতে পারতাম ওর হার্টবিটের শব্দ যখন ও আমার শরীরে ছিল। কোন রকম ভূমিকা ছাড়াই সে একটা খাম এগিয়ে দেয় আমার দিকে। আলোহীন ঘরে বাইরের আলো এসে রহস্যের নকশা ফেলেছে মেঝেতে। সেই আবছা আলোয় বুঝতে অসুবিধা হলো না এটা বাইরে থেকে আসা খাম।

‘বাপি আমার জন্য পেপারস পাঠিয়েছে। তুমি পারমিশন দিলে আমি সাইন করতে চাই।’
একটা সাইনে আমি সোহমের বুকের সমুদ্দুরে ভেসেছিলাম। একটা সাইনে সুনামির মতো সব তছনছ করে চলে গিয়েছিল সে। আবার একটা সাইনে আমার বুকটা খালি করে দেবার সব আয়জন করে ফেলেছে সোহম, অথচ আমি কিছুই জানি না। আমার বোবা আর্তনাদ প্রকাশ পেল না, গলার কাছে এসে ধাক্কা খেয়ে ফিরে গেল আবার বুকের গভীরে।

অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলাম ‘তুমি তো জানো, সে একজনের সাথে থাকে ওখানে।’
‘জানি মামনি, সিনথিয়া একটা ফ্যামিলি চায়। ওরা একটা সন্তান অ্যাডপ্ট করতে চায়, যার বয়স হতে হবে ১৮ এর নিচে। তো, আমি নই কেন? বাবাও চায়, আমি ওখানে পড়াশুনা করি।’
বুকের ভেতরের ঝড় লুকিয়ে মেয়েকে অসহায় প্রশ্নটা করলাম, ‘তুমি সত্যিই যেতে চাও?’
‘হ্যাঁ, যেতে চাই।’

আমার সব যুক্তি তর্ক যেন বোবা হয়ে গেল। এতো কষ্ট, এতো ত্যাগ, এতো মমতা! সব হেরে গেল উন্নত দেশ আর অর্থের কাছে!

নিজের ঘরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো সে। ‘তুমিও তো ভালো নেই। তোমাকে প্রায়ই আলো নিভিয়ে ঘরে থাকতে হয়। তুমি তো নিজের জীবনটা যাপন করলে না কখনো। এক জীবনে বেঁচেছো বাপির জন্য, এখন আমার জন্য। আমি তো এমনিতেই একসময় চলে যাবো বাইরে। সেটা না হয় একটু আগেই হলো।’

এই প্রথম অন্ধকারের মাঝেও ওর চোখের ভাষা পড়তে পারলাম আমি। ওর নিষ্প্রভ চোখ ঠিকই লুকিয়ে নিল কিছু একটা। অসাড় দেহটা নিয়ে খাটে পা ছড়িয়ে বসে থাকলাম আমি। মনে মনে শুধু চাইলাম আলোটা নেভানোই থাক অনন্ত কাল। কখনো কখনো আঁধারটাও বড় প্রয়োজন হয়, কান্নার জোয়ার লুকাতে।

শেয়ার করুন:

লেখাটি ৩৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.