ট্রাঙ্কে নবজাতক, মৃত্যু ও প্রশ্নের মুখোমুখি শিশুটির মা

0

সুপ্রীতি ধর:

খবরটি এরকম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের একটি কক্ষের ট্রাঙ্ক থেকে এক নবজাতককে উদ্ধার হয় শনিবার দুপুরে। একজন ছাত্রীর কক্ষে নবজাতকের কান্নার শব্দ পেয়ে আশপাশের ছাত্রীরা বিষয়টি জানায় হল কর্মচারীদের, পরে তারা তালা ভেঙে শিশুটিকে উদ্ধার করে। এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাত পৌনে ১০টার দিকে শিশুটি মারা যায়। এক ছাত্রী জানান, ওই ছাত্রী যে গর্ভবতী, তা তারা আগে থেকে টের পাননি। তার শারীরিক কাঠামোতেও তেমন কোনও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। তার চলাফেরাও স্বাভাবিক ছিল।

এই ঘটনায় মিডিয়ায় নানা ধরনের খবর আসছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েটিকে মানে শিশুটির জন্মদাত্রীকে দোষারোপ করে। সেইসব খবরের নিচে যে ধরনের কমেন্ট হচ্ছে তাতে অসুস্থতা বোধ করা ছাড়া উপায়ও থাকছে না। অনেক প্রশ্নও জাগছে অনেকের মনে, একটি শিশুর জন্ম তো একদিনেই হয় না, সেজন্য নির্দ্দিষ্ট সময় দরকার হয়। এই দীর্ঘ সময়েও আশেপাশের কেউই কিছু টের পেলো না? বা কেউ কোনো সহায়তার হাত বাড়াতে পারলো না মেয়েটির প্রতি? যদি না বাড়িয়ে থাকে, তবে কেমন কর্তৃপক্ষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারিরা? একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো কেবল প্রতিষ্ঠানই নয়, অভিভাবকও বটে! যেকোনো শিক্ষার্থীর দেখভাল, নিরাপত্তার সব দায়িত্ব সেই প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সকলের। তাহলে এই ঘটনা কেমন করে ঘটলো, কেউ কিছু জানলো না?

আরও আছে প্রশ্ন। সেই পুরুষটি কোথায় এখন? আনন্দের ভাগ নিয়েছে যে পুরুষ, সে কেন এর দায়ভার নেয় না এই সময়ে এসেও! প্রশ্নগুলো কেবল ঘুরপাকই খায়, উত্তর পায় না।

এরকম নানান প্রশ্ন জাগছে সাধারণের মনে। নিচে এর কিছু অংশ তুলে ধরা হলো উইমেন চ্যাপ্টারের পাঠকদের জন্য:

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মির্জা তাসলিমা সুলতানা লিখেছেন, এই শিক্ষায়তনের শিক্ষক বলে আর দাবি করি কোন মুখে! আমরা কেমন দায়িত্ব পালন করি? বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন সমাজ আমরা তৈরি করেছি, যেখানে শিক্ষার্থী মেয়েটি তার চরম অসহায় মুহূর্তেও বিভাগে, অন্য বিভাগে কিংবা তার হলের কোন শিক্ষকের কাছে যায়নি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর আছে, বিভাগগুলোতে শিক্ষার্থী উপদেষ্টা আছে, শিক্ষার্থী উপদেষ্টা ও পরামর্শদান কেন্দ্র নামে ৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী একটা অফিস আছে…কাঠামোতে এতো এতো জায়গা থাকা সত্ত্বেও আমরা কী করি যে আমাদের শিক্ষার্থীরা এইরকম সময়ে কারো কাছে যায় না, কোন আস্থার জায়গা পায় না! শিক্ষার্থী মেয়েটির হলের ঘরে একা একা প্রসব করার মতো, নবজাতককে ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রাখার মতো পরিপ্রেক্ষিত আমরা কেমন করে তৈরি করেছি, জারি রেখেছি! কীসের লেখাপড়া, কীসের কী! এই সমাজের কেবলই একটা বর্ধিতাংশ যদি এই বিশ্ববিদ্যালয় হয়, সেখানে নতুন জ্ঞান উৎপাদন ও চর্চা হবে কোত্থেকে! এতো অসহায় বহুকাল লাগেনি!

রনির এই ছবিটি ফেসবুক থেকে নেয়া হয়েছে।

লেখক ও উন্নয়নকর্মী সাদিয়া নাসরিন লিখেছেন, আমরা সবাই এই সকালে বেঁচে আছি। এই শিশুটি বাঁচেনি। পাশের পুরুষটির নাম রনি। জাবিতে ট্রাংক থেকে উদ্ধার করা শিশুটির জন্মদাতা। জাবির মার্কেটিং এর শিক্ষার্থী। শিশুটির মা’ও জাবির শিক্ষার্থী। দুজন পরিপূর্ণ নারী পুরুষ ভালোবাসাকে ভোগ করেছিলো। সম্মান করেনি, তাই দায়িত্বও নেয়নি। শিশুটির জায়গা হয়েছে তাই ট্রাংকের ভেতরে। বাচ্চাটা তো মরেই গেলো, এবার সবাই মেয়েটাকেও মারবে। যথারীতি বেঁচে যাবে পুরুষ প্রবল। যারা বাঁচাবে তারাই আবার নিউজের কমেন্টবক্সে এসে সুশীল সাজবে।

পুরুষটির কথা কিছু বলার নেই আমার আর। কোন পুরুষকেই কিছু বলার নেই ইন ফ্যাক্ট। তবে বলার আছে মেয়েটিকে। মেয়েদেরকে। এই স্যাটেলাইটের যুগে এসেও মেয়েরা যদি অন্যের “দায়িত্ব” নেয়ার আশায় নিজেই সম্পর্কে এমন দায়িত্বহীন হয়, তবে শিশুহত্যার অভিশাপে এইসব সকাল অন্ধকার হয়ে যাওয়াটাই অনিবার্য।

একটু পরেই খুব গুরুত্বপুর্ণ একটা প্রেজেন্টেশন আছে। বুকে চাপ চাপ ব্যথা করছে।

জীবন!!!

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট দিলশানা পারুলের প্রতিক্রিয়া, আমি কোন কিছুতেই মেয়েটার সাইকোলজি বুঝতে পারছি না। এইটা তো হঠাৎ ঘটা বিষয় না। সাত-আট মাস ধরে প্রাপ্তবয়ষ্ক একটা মেয়ের সাইকোলজি। আমি সত্যি অকুল পাথারে পড়ে গেছি! বিষয়টা আমি কোনভাবেই বুঝতে পারছি না। প্রাতিষ্ঠানিক ভরসাহীনতাটা খুব সহজেই বুঝতে পারছি, এটি বোধগম্য; কিন্তু মেয়েটার সাইকোলজি বোঝার সাধ্য আমার নাই।

পারুলের এই প্রতিক্রিয়ার উত্তরে শিক্ষক নাসরিন লাবণী লিখেছেন, আমি বুঝতে পারছি। মেয়েটি আমাদের সমাজে থেকে কোন আশা ভরসার স্থান পায়নাই। এমনকি প্রকাশিত খবরেও সে বিবাহিত কিনা সেটা নিয়ে বেশী আলোচনা। ‘ওয়াচ টাওয়ার’ বলে একটা মুভি আছে, যেখানে তুরস্কের একটা মেয়ে ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হওয়ায় অন্য শহরে কাজ নিয়ে চলে যায়, কাজ করতে করতেই দিনের আলোতে বাচ্চা প্রসব করে একা একা লুকিয়ে তারপর বাচ্চাটাকে রাস্তায় ফেলে দেয় সবার অলক্ষ্যে। মেয়েটি হয়তো সেরকম কিছু ভেবেছিল, অথবা কিছুই ভাবতে পারেনি, বুঝে উঠতে পারেনি, সময়য়ের কাছে ছেড়ে দিয়েছিল। যেখানে এই ঘটনায় কত্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া হল, “মেয়েটি তথ্য গোপন করে অন্যায় করেছে”, তদন্ত কমিটি করা হয়েছে সেজন্যে, সেখানে ভরসা পাবেই বা কীভাবে?

তনিমা তাসনিম লিখেছেন, পুরো প্রেগনেন্সি একা হ্যান্ডেল করার মতো যার শক্তি, সাহস যার আছে, সে কেন আর একটু সাহসী হয়ে উঠলো না সেটাই কোনোভাবে মেনে নিতে পারছি না।

বিভিন্ন আলোচনা-মন্তব্য পড়ার পরও কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, মেয়েটিকে তার বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আমরা খুব ভালো করেই জানি, কেমন জীবন অপেক্ষা করে আছে মেয়েটির জন্য! বাবা-মা কেমন আচরণ করছে বা করবে ভবিষ্যতে! তনিমার কথার রেশ ধরেই বলতে চাই, এতোটা শক্তিই যখন ধরেছিল মেয়েটি, আরেকটু সাহসী হয়ে উঠলেই সে এরকম একটি সুন্দর শিশুকে পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখতে পারতো!

হমম, নিশ্চিত করেই জানি রনি নামের ওই পুরুষটি হয়তো এই সম্পর্ক নিয়ে অনেক ঘুরিয়েছে মেয়েটিকে, সন্তানকে অস্বীকার করেছে। এমনটাই হয়ে থাকে সাধারণত। যদিও কারও কারও লেখায় দেখলাম যে রনি নাকি সন্তানটি যে তার এই মর্মে স্ট্যাটাস দিয়েছে। এটা কি বীরত্ব দেখানো? এই দীর্ঘ সময়ে তার ভূমিকা কী ছিল?

যাই হোক না কেন, মেয়েটি কি মানসিকভাবে সুস্থ ছিল? সেই বা কেমন করে সব লুকাতে সক্ষম হলো? নিজে নিজে সন্তানের জন্মও দিল? কী করে? এই ভয়াবহ একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েও সে নির্বিকার মনে নবজাত সন্তানটিকে ট্রাংকের ভিতরে ঢুকিয়ে রাখলো! অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে সে এটা করেনি! তাহলে? খুন করলো সে? ভেবেছিল, এভাবে সে পার পেয়ে যাবে? সব এলোমেলো লাগছে আমার!

সন্তান ধারণের জন্য যখন কোনোরকম পূর্ব প্রস্তুতি না থাকে, তখন কোনো একটা অসতর্ক মুহূর্তেই একটি মেয়ের গর্ভে সন্তান আসে। কিন্তু প্রস্তুতি থাকুক বা না থাকুক, মাতৃত্বের অনুভব কিন্তু একইরকম হয়। দুই-আড়াই মাস পর যখন বিষয়টি ধরা পড়ে, তখন একটি প্রাণের সঞ্চার হয়ে গেছে মাতৃজঠরে। নারীর শরীরে তখন নানারকম হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে। সে তখন নিজের মধ্যে আরেকটি প্রাণ ধারণ করার অনুভূতি পায়। সহজ হয় না সেই অনাগত ভ্রুণটিকে সরিয়ে ফেলা। সবাই পারে না। সেইজন্যই যথেষ্ট মানসিক শক্তি দরকার হয়। বা তাকে মোটিভেট করতে হয় এই কাজে, কাউন্সেলিং লাগে। আমরা একটা অভাগা জাতি, যেখানে ধর্মীয় ও সামাজিক ন্যায়নীতির বুলি আউড়িয়ে সবাইকে দমন করতে চাই, অথচ খুব সাধারণ চাওয়া-পাওয়াগুলোকে অস্বীকার করি কঠোরভাবে।

বর্তমান সময়ে এসেও মেয়েটি কেন খুনি বা হন্তারক হয়ে উঠলো, কতোটা অসহায় হলে একজন মানুষ নিজের ভালোমন্দ, বাঁচা-মরার প্রশ্নেও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, এটা বুঝতে হলে ওর মানসিক চিকিৎসা দেয়া জরুরি। ওর মনের মধ্যে কী ছিল, কেন সে এরকম একটি আচরণ করলো, সন্তান গর্ভে ধারণ ও জন্মদানের পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে সে, কাজেই আর সব মায়েদের মতোনই তার মনেও নানারকম প্রভাব ফেলছে আমি নিশ্চিত, সেখানে মেয়েটিকে কোনরকম বিচারসভায় না বসিয়ে ওকে সুস্থ করে তোলাটা জরুরি, এই মুহূর্তে অবশ্যকাম্য।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 418
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    418
    Shares

লেখাটি ২,৮৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.