গসিপ নারীর অস্ত্র?

0

সৈয়দা সাজিয়া আফরীন:

মেহেরুন নেসাকে খুবই হঠাৎ কোন পূর্ব আলাপ-আলোচনা ছাড়াই তালাক দেন মালেক উদ্দিন। মেহেরুন নেসা ও মালেক দুজনেই পেশায় ব্যাংকার। বিয়ের পর থেকে আট বছর সংসারের জন্য অনেক খেটেছেন, আয় করে অর্থও দিয়েছেন। মালেকের চোখে মেহেরুন নেসা সুন্দরী নন, আকর্ষণীয়া নন। মেহেরুন নেসাকে তিনি উপেক্ষা করেন এবং গোপন একটি সম্পর্কে থাকেন।

সব জানলেন, তবুও মেহেরুন নেসা সরে দাঁড়াবার শক্তি পাননি। একদিন হঠাৎ করেই তালাকের নোটিশ পেলেন, তালাক হয়েও গেল। কাকতালীয়ভাবে মালেকের বিরুদ্ধেই সবাই সমালোচনা-আলোচনা শুরু করলেন। মালেক অফিসের পরিবেশে উপেক্ষিত হতে থাকেন। একবার দুবার বার বার। মালেককে অনেক কিছুতে নিমন্ত্রণও করা হয় না, মূলত কোনো সম্পর্কই আর নেই তার সাথে। তার সামাজিক সম্মান শূন্যে নামছিল। তিনিও খুব চোর চোর হয়ে থাকছেন। শুনেছি, এখন অন্য জায়গায় চাকরি খোঁজেন।

অন্যদিকে মেহেরুনের একটি প্রমোশন হয়েছে; আগে সংসারের কাজের জন্য সামাজিক গ্যাদারে যেতে পারতেন না। এখন খুব সুন্দর আর গুছিয়ে সবখানে নিজের সতেজ উপস্থিতি জানান দেন। মেহেরুন এখন তার প্যারেন্টসদের অনেক সাহায্য করতে পারছেন। তার সুখটা দেখা যায়, অনুভব করা যায় না। অথচ কী ভয় না পেয়েছিলেন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে!

গসিপ কী? গসিপ একটি বাক্য, বা বাক্যসমষ্টি, যা অন্য কারো সম্পর্কে বলা হয়। তথ্যটি সত্য বা মিথ্যে হতে পারে। তথ্যটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক দুটোই হতে পারে। অন্য কারো সম্পর্কে তার অবর্তমানে আলোচনাই গসিপ বা পরচর্চা। গসিপ বা পরালোচনা শব্দটিকে আমরা খুব কাঁচা অর্থে জানি। এ শব্দের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে অনেকটা এভাবে- ‘ক শো অফ করে’ ‘গ বেশি দেমাগী’ ‘দ এর চরিত্র খারাপ’ ‘ল এর সংসারে অশান্তি চলছে’ ‘ফ এর স্বামী বহুগামী’ ‘প এর সংসার টেকেনি’ ‘ম জামাই নিয়ে ঢং করে’।
আবার ক থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত সবার সাথে আলাপও রাখি। এটি গসিপ বা পরালোচনার সবচে কাঁচা প্রাথমিক ফর্ম। পরালোচনা বা গসিপকে আমরা দেখেছি অত্যন্ত নির্দয়ভাবে; উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তিস্বার্থে ও নিজের ঈর্ষাকে তৃপ্ত করার নিরিখে। এর যত নেতিবাচক রূপ থাকুক না কেন, এটি হতে পারে নারীর আত্মরক্ষার জন্য শক্তিশালী একটা মাধ্যম। এটিকে একটি পারদর্শিতা ভেবে শুধু ব্যবহারটা জানতে হবে।

কয়েকদিন আগের কথা- আমার বান্ধবী যার সাথে আমি প্রাত্যহিক অনেক কথা বলি; প্রাসংগিক-অপ্রাসংগিক, ভালো-মন্দ, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব। আমার দৃষ্টিতে ভালো নয় (পুরুষ) সেরকম একজনের ব্যক্তিগত এবং প্রফেশনাল স্খলনের পুরো প্রোফাইলটা খুব জুসি করে বলছিলাম। তথ্যগুলো নেতিবাচক গোপন এবং সত্য। আর এসব কথা-ইনফরমেশন শেয়ার করার মতো করে বলিনি, গসিপের মতোই বলেছি নির্দয় ঠাট্টা খোঁচা যুক্ত করে। লক্ষ্য করছিলাম বলার সময়টা খুব দ্রুত গড়াচ্ছিল। বলাবলি দুজনেরই ভালো লাগছে, আমার বরং একটু বেশিই লাগছে। কারণ বক্তা আমি। বারবার বোঝার চেষ্টা করছি আমি কী যাকে নিয়ে কথা বলছি তাকে ঈর্ষা বা ঘৃণা করি?

গল্পটি ছিল এরকম- একটা মানুষ খুব নির্দয় প্রতারক হয়েছিল তার সঙ্গীর (স্ত্রী) কাছে নির্যাতক ছিল ব্যক্তিগত জীবনে। ওই মানুষটি প্রফেশনাল জীবনে ঠিক দুর্নীতি নয় সোজা ব্ল্যাকমেইল এর আশ্রয় নিয়ে ধনী হয়েছিলেন। প্রকাশ্যে তার জয়ী জয়ী ভাব ছিল। রাতারাতি ধনী হবার অহংকার ছিল। উপেক্ষিত, প্রতারিত এবং নির্যাতিত হবার পরেও ওই নারী মামলা করেননি, কাউকে বুঝিয়ে সমবেদনা নেননি, সাহসীর মতো ছেড়েও আসেননি বরং মেনে নিতে বাধ্য হতে হতে কেমন নিঃসঙ্গ হয়ে উঠেছিলেন। সে গল্প আমি জানি। আমি এও জানি কিছু করার অথরিটি আমার নেই। ওই নারীর সাথে আমিও পরাজিত হয়েছিলাম। পরে ওই ব্যক্তির খুব লোকসান হয়, সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। এতে আমি তৃপ্তি পাই। এই ক্ষমতাহীন আমি জুসি করে গসিপ করি। গসিপে আমার আর শ্রোতার উভয়ের প্রশান্তি আসে।

এ বিষয়ে সাইকোলজি টু ডের একটি অনুবন্ধ পড়েছিলাম। এতে পরালোচনার কিছু ভালো দিক বলা হয়েছে। ভাবটা বুঝিয়ে অনুবাদ করলাম। পরালোচনা বা গসিপের পাঁচটি ভালো দিক হলো-

এক- নিজের প্রতি অন্যায় হয়েছে বোধ করলে, নিজেকে পীড়িত অনুভব করলে, গসিপ আপনাকে মানসিক পীড়া থেকে রেহাই দিতে পারে। হয়তো দায়ীরা একটু সাবধানী হবেন। সোজা কথায় নিজের অভিব্যক্তি সামনে পেছনে সবসময় ব্যক্ত করতে পারেন। তবে তথ্যটি সঠিক হতে হবে, উদ্দেশ্য সৎ হতে হবে।

দু্ই- যারা তৃতীয় ব্যক্তি গসিপে (পরালোচনা) তারাও সাবধানী হয়ে যান। নিজে এরকম পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য কিছু ভালো আচরণকে রপ্ত করেন এবং আলোচনায় আসা আচরণগুলোকে নিজের মধ্য থেকে মুছে দেন। এটি ভালো প্রভাবক।

তিন- এটি একটু রসাত্মক, তবে সত্যতা আছে। যারা নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান; প্রচণ্ড উদ্বেগের ফলে তাদের রক্তচাপ ও হার্টরেট বেশি থাকে। গসিপ তাদেরকে এ সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। কারণ কথাটা বলে দেবার পর বা অনুযোগ করার পর উদ্বেগ কমে।

চার- গসিপের ফলাফল সবসময় নেতিবাচক হবে না। মনে করেন এক লোকের ক্ষতির জন্য অন্য লোক তার নামে দুর্নাম করলেন। কিন্তু ফলাফলটি ভালো হলো। সেই সমালোচনাটি বরং ক্ষতিগ্রস্ত লোকটির জন্য উপকারি হলো। অথবা কোন ব্যক্তির বিজয়ের গল্পটি বললেন। এটি অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। যাই বলেন না কেন ফলাফল হলো ইতিবাচক!

পাঁচ- মিশিগানের গ্রোসে পয়েন্টের একজন ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী আন্দ্রে আন্দ্রেজেজস্কি বলেছেন, গসিপ পারস্পরিক ভালো-মন্দ অভিজ্ঞতাগুলোকে আদানপ্রদান করে। একজনের গল্প থেকে অন্যজন শিক্ষা নেন। এক্ষেত্রে আপনি ইন্ধন দিচ্ছেন না, অনুসন্ধান করছেন।

গসিপকে জঘন্য, কদর্য, এবং শত্রুতা সৃষ্টিকারি আচরণ হিসেবেও আমরা দেখেছি। যখন ব্যক্তিক শত্রুতা নিবারণের জন্য মিথ্যে বলে অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়, ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে মানুষটি যাই করুক তার চলন বাঁকা ধরনের মানসিকতাকে প্রমোট করে। প্রত্যেকটি নেগেটিভ ভাইভ ফিরে ফিরে আসে; এতে যোগাযোগের স্থান আর সংশ্লিষ্ট সবাই খুব আক্রান্ত হয়। এরকম গসিপে সত্যি ইস্যুটা গুম হয়ে যায়। কে কাকে পছন্দ করে বা করে না এর উপর সবকিছু নির্ভর করে। একটি সুস্থ সম্পর্ক আর মানবিক যোগাযোগের পক্ষে এটি খুব ক্ষতিকারক।

গসিপকে কাজে লাগানোর উপায়টা আমার মতো করে বলি-
আমরা সবাই অনেক বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলি। নিজেদের মধ্যে বলতে সেটা কখনো বন্ধু, আত্মীয়, স্পাউস বা কর্মস্থল। অনেক বিষয় বলতে রাজনীতি ভোটাভুটি, লেখালেখি, ওর কী হলো, তার কী হলো, এমনকি সেলিব্রেটিদের ডিভোর্সও আমাদের আলোচনার টেবিলে স্থান করে নেয়।

গ্ল্যামার অ্যান্ড গসিপ সম্ভবত সবচেয়ে পঠিত আর চর্চিত বিষয়। মানুষ গসিপ জানতে চায়, মানুষ গ্ল্যামার দেখে, মানুষ ঘটনা জানতে চায়। আমরা তার বাইরেও না, ঊর্ধ্বেও না। আমরা সাইডে কথা বলি, আমরা অনুপস্থিতিতে সমালোচনা করি, আমরা ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে জাজ করি। এটা মনুষ্য স্বভাব। এর প্রভাব আছে। এই প্রভাবের বলয়ও নিছক তুচ্ছ নয়। এই স্বভাবটাকেই নারীর পক্ষে ব্যবহার করতে হবে।

কীভাবে?

এক- সব ঘটনায় নিরপেক্ষ জাজ হতে চাইবেন না। তার জন্য আদালত আছে। আমি আদালত নই। আমি পক্ষ অবলম্বন করবো। নারীপক্ষ। যদি কিন্তু যখন বলতেই হচ্ছে, সে কথাটা নারীর ফেবারে বলতে শিখুন। না বলতে পারলে চুপ যান।
দুই- নারীর বিপক্ষের কোন জুসি আলোচনায় শামিল হবেন না। সম্ভব হলে তিন কথা শুনিয়ে দে । সাহস কম হলে প্রস্থান করেন।
তিন- পরচর্চা করেন। বার বার করেন। প্রচুর করেন। নির্যাতক পুরুষটির বিপক্ষে। নারীর বিপক্ষে নয়।
এই নিয়মে গসিপ করলে হার্ট ভালো থাকবে।
শুভকামনা গার্লস।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 125
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    125
    Shares

লেখাটি ৬৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.