‘ভাবী’রা সব মানুষ হোক

0

লিপিকা তাপসী:

বাচ্চাদের নাচের, গানের স্কুলে বাচ্চার বন্ধুর মায়েরা ভাবনা চিন্তা ছাড়াই এক অপরকে ভাবী ডেকে বসেন। কখনো অবিবাহিত খালা, ফুফু, ইয়াং নানী, দাদীরাও ভাবী হয়ে যায়। তারা নিজেদের নাম বলেনও না, অন্যের নাম নিয়ে তাদের মাথাব্যথাও নেই।

যাকে ভাবী ডাকছেন তার স্বামীকে আদৌ দেখেছেন কিনা, তার স্বামী আছে কিনা দেখার, জানার প্রয়োজন ছাড়াই তারা স্বামীর বোন বনে যান। কেউ কারো নাম জানে না অথচ তারা বন্ধু, ভাবী বন্ধু। নাম মনে রাখার ঝামেলা নেই। কোনো কোনো সময় অনেক মায়েদের সাথে পরিচিত হবার আগেই নাম বলে নিলেও তারা গল্প চালাতে থাকে ভাবী সম্বোধন করেই। কিছুক্ষণ পর আবার মনে করিয়ে দিলেও কিংবা না দেখা হাসবেন্ডকে কমন ভাই না বানিয়ে নিজেদের মধ্যে বোন বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরির কথা বললেও বিদায় নেবার সময় বলে যায়, ভাবী আসি, আবার দেখা হবে।

কোথাও কোথাও বাচ্চার বাবারাও অন্য মাদেরকে ভাবী বলে ডাকে। কিন্তু কোনো মা কিংবা বাবা তার সন্তানের বন্ধুর বাবাকে দুলাভাই ডাকে না।

আমাদের সমাজে নারীকে পূর্ণ মানুষই মনে করে না। তার ব্যক্তি পরিচয় আছে সেটি বোধের মধ্যেই থাকে না। সে কারও স্ত্রী,
কারও মা সেই পরিচয়ই মুখ্য। নারী নিজেও তার চর্চা করে না, অন্যেরাও সেটি করে না। তাইতো তার নাম হয়ে যায় মিসেস চৌধুরী, মিসেস খন্দকার, কল্যাণী দত্ত হয়ে যায় মিসেস কল্যাণী গায়েন, প্রতিমা পাল হয়ে যায় মিসেস প্রতিমা মজুমদার, আবার শামীম ভাবী, মিজান ভাবী, ক্যাপ্টেন ভাবী, রুহুল ভাবী, আবার অর্চির মা ভাবী, তুলতুলের মা ভাবী, রাতুলের মা ভাবী। স্বামী, সন্তান এর পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যায় নিজের নাম, নিজের পরিচয়।

শুধু স্কুলের সামনে কেন, বাইরে কি ঘটে না? কয়েকদিন আগে অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন,
-এটা কি প্রপার মায়ের নাম্বার? ভাবী, প্রপাকে নিয়ে আগামীকাল টিভিতে চলে আসবেন।
– ঠিক আছে। আপনি আমার পার্টনারের কীরকম ভাই হোন? আমাকে ভাবী সম্বোধন করলেন, তাই জিজ্ঞ্যেস করছি।
– না মানে, চিনি না। মানে আমি কি ভুল বলেছি? (একটু ঘাবড়ে গিয়ে) আসলে ঐদিন সকল মায়েদের সাথে দেখা হয়েছিল তো সকলকে ভাবী ডেকেছি, তাই আপনাকেও ভাবী ডেকে ফেলেছি।
-আপনি বাচ্চাদের অদেখা বাবাদের ভাই বানিয়ে ফেললেন? আর সাথে আসা ফুফু, খালারাও আপনার ভাবী হয়ে গেল? তা কাউকে দুলাভাই ডেকেছেন? আপনি তো অফিসের কাজে ফোন করেছেন, আর অদেখা কাউকে দুলাভাই, ভাবী ডাকা যায়?
সে ভুল হয়েছে বলে দুঃখ প্রকাশ করে ফোন রেখে দিল।

ডাক্তারের চেম্বারে অনেক রোগী অপেক্ষা করছেন। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারীকে ডাকা হচ্ছে, কিন্তু কারও সাড়া না পেয়ে পরের সিরিয়াল ডাকা শুরু হয়েছে। তখন পাশের রোগীর সাথের জন বলে উঠলো, আমার মায়ের সিরিয়াল ছিল, তারা মায়ের নাম ভুলে গিয়েছিল। মায়ের নাম শুনে অভ্যস্ত নয় বলে সাড়া দিতে দেরি হয়েছে। যাকে ডেকেছেন তিনিও তার নাম ভুলে গেছেন!

পাড়ার মসজিদের মাইকে অসময়ে (আযানের টাইমের বাইরে) ঘোষণা দেয়ার শব্দ মানইে কোন শোক সংবাদ। ঘোষণা শুরু হয়.. ধানমন্ডি ৭ নং রোডের নিবাসী জনাব মরহুম দেলোয়ার হোসেনের ছোট ভাই মরহুম আতোয়ান আলীর স্ত্রী, জনাব মইনুল আলীর মাতা আজ সকালে ইন্তেকাল করছেন…। একই ঘোষণা দুইবার থেকে তিনবার হয়ে থেমে যায়। নামটা ঘোষণা হয় না। কারণ নামধারী ব্যক্তি নেই, আছে ওমুকের মা, তমুকের স্ত্রী। জন্মানোর পরে একটা নাম ছিল, কিন্তু ওমুকের স্ত্রী, ওমুকের মা, ওমুকের দাদী, নানীর ভারে সেই নামটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু পুরুষের নাম অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা আছে। বউয়ের নামের পরে সন্তান, তার সন্তান, তার সন্তানদের নামের শেষে লেজ লাগানোরও ব্যবস্থা আছে। অর্ধজীবী নারী আর চিরজীবী পুরুষ।

নতুন বাসা ভাড়া নিলে বা কিনলে সেখানের বাবার বয়সী বাড়ির মালিক, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে, দারোয়ান, বুয়া সবার ভাবী হয়ে যায়, বাড়িটা যদি নারীর নামে হয় তবুও। তাহলে কি এই যে ভাবী ডাক ডাকবে না মানুষ। অবশ্যই স্বামীর ভাই সম্পর্কের যারা তারা বৌদি বা ভাবী নামেই ডাকবে। কিন্ত, অফিসে, ডাক্তারখানায়, মেয়ের স্কুলে ভাবী ডাকতে হবে কেন? নারীর একটা পরিচয় হলো কারো স্ত্রী, কিন্তু সর্বোপরি সে একজন ব্যক্তি, স্বতন্ত্র মানুষ, তার একটা নাম আছে, পরিচয় আছে। সেই পরিচয়টি মুখ্য।

সবশেষে ডিয়ার ভাবীরা, আপনারা নিজেরোই যদি নিজেদেরকে সম্মান না দেন কার ঠেকা পড়েছে আপনাদেরকে ডেকে ডেকে সম্মানিত করবে। নিজেদেরকে সম্মান করতে শিখতে হবে, নিজেদের পরিচয়কে নিজেদেরকেই মর্যাদা দিতে হবে আগে। না হলে সেই মরণকালে ওমুকের মা, তমুকের স্ত্রী, তমুকের ভাবী হিসেবেই মরবেন। তাই নিজেরা নিজেদের নাম ধরে ডাকাটা শুরু করেন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 2.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.8K
    Shares

লেখাটি ৭,৭৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.