‘স্বনারীত্বপ্রেম’ বা Autogynephilia আসলে কী!

0

সুমিত রায়:

স্বনারীত্বপ্রেম বা Autogynephilia এর ব্যাপারে শুনেছেন কেউ? এটা রূপান্তরকামিতা (transsexualism) এরই একটা প্রকারভেদ। এই বিষয়ে বাংলা ভাষায় আগে কোনো লেখা চোখে পড়েনি। আজই এক বড় বোনকে দেখলাম প্রথম এই বিষয়ে কিছু লিখতে। প্রথম এই বিষয়ে একটা লেখা দেখে ভালো লাগল।

সেই লেখায় একজন স্বনারীত্বপ্রেমী ব্যক্তি (পুরুষ) সম্পর্কে বলা হয়েছে। তার মেয়েদের মতো পোশাক পরতে, মেয়েদের সাজসজ্জা নিতে ভালো লাগে। অনেকেই তাকে সমকামী বা সমপ্রেমী বলে মনে করে, কিন্তু ছেলেদের প্রতি তার কোন রকম প্রেমপূর্ণ বা যৌন আকর্ষণ কাজ করে না, তার আকর্ষণ কাজ করে মেয়েদের প্রতি। মেয়েদের সাজসজ্জা পছন্দ করে বলে গে কম্যুনিটি তাকে সমকামী হিসেবে ধরে নেয়, তারপর যা হবার তাই হয়। ব্যাপারটা দুঃখজনক…

লেখক: সুমিত রায়

এমনিতে বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরাকে Transvestism বলে, প্রচলিত ভাষায় cross dressing -ও জনপ্রিয় হয়ে গেছে। কিন্তু যদি এর সাথে যৌন ফ্যান্টাসি বা আগ্রহ জড়িত থাকে, তখন এটা একটা প্যারাফিলিয়া। এই প্যারাফিলিয়াটিকে সাধারণভাবে Transvestic fetishism বলে, তবে আরেকটি অধিক শিক্ষায়তনিক নামও আছে, সেটা হচ্ছে Autogynephilia। Auto মানে নিজ, “gyne” অংশটি নারীবাচক, আর philia এর দ্বারা আকর্ষণ বোঝায়। Autogynephilia এর বাংলা তাহলে কী বলা যায় স্বনারীত্বপ্রেম? Autogynephile-রা তাহলে বাংলায় স্বনারীত্বপ্রেমী?

যাই হোক, এখানেই শেষ নয়। অনেকের মধ্যে নিজের লিঙ্গ নিয়ে gender dysphoria কাজ করতে পারে, যেখানে সমলিঙ্গে আকর্ষণ থাকে না। কোন ব্যক্তি যে লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে জন্মগ্রহণ করে সেই পরিচয়ের জন্য মানসিক চাপ (distress) অনুভব করার বিষয়টিকে gender dysphoria বলা হয়। gender dysphoria এর ভুক্তভোগীগণের ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের লিঙ্গ পরিচয় আর তাদের উপর আরোপিত লিঙ্গ পরিচয় ভিন্ন হয়। এর ভুক্তভোগীদেরকে রূপান্তরকামী (transsexual) বলা হয়। যারা রূপান্তরিত হয় তাদেরকে রূপান্তরিত লিঙ্গ (transgender) বলে।

কিন্তু এই যে মানসিক চাপ (distress) বোধ করা, এটা কিন্তু অনেক আগে থেকেই মনোবৈকল্য (mental disorder) হিসেবে সংজ্ঞাকারী উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে। কাজেই ৮০ এর দশকে একেও একটি মনোবৈকল্য হিসেবেই চিহ্নিত করা হল, নাম দেয়া হল লিঙ্গ পরিচয় বৈকল্য (gender identity disorder)।
কিন্তু পরে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেল, এই চাপ আসলে ব্যক্তির অন্তর্নিহিত নয় যেমনটা অন্যান্য মনোবৈকল্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বরং এই মানসিক চাপ সংস্কৃতি আরোপিত। অনেক সংস্কৃতিতে যেমন সামোয়ায় তিনটি লিঙ্গ পরিচয় সুপ্রতিষ্ঠিত। সেখানে তৃতীয় লিঙ্গের লোকেরা মানসিক চাপ ছাড়াই নির্বিঘ্নে থাকতে পারে। কিন্তু বিষমমুখী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মভিত্তিক সমাজ ও আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজের বিষমমুখিতা (heteronormativity) রূপান্তরকামীদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালে তাই লিঙ্গ পরিচয় বৈকল্য (gender indentity disorder) নামটি পরিবর্তন করে নাম রাখা হল gender dysphoria। এই শব্দটার একটা ভাল বাংলা দরকার।

যাই হোক, কথা হচ্ছিল স্বনারীত্বপ্রেম নিয়ে। এখন যেসব Gender dysphoria- তে থাকা ব্যক্তি সমকামী নন, তাদেরকেও এই স্বনারীত্বপ্রেম এর শ্রেণীতে ফেলা হয়। এটা নিয়ে আমেরিকান-ক্যানাডিয়ান যৌনবিশেষজ্ঞ রে ব্ল্যানচার্ডের একটা কাজ আছে যা Blanchard’s transsexualism typology নামে পরিচিত। ব্ল্যানচার্ড পুরুষ থেকে নারী বা MtF রূপান্তরকামিতাকে দুইভাগে বিভক্ত করেছিলেন। একটি ভাগে পড়ে সমকামী রূপান্তরকামীরা (Homosexual transsexual) যারা “কেবল আচরণ ও বেশভূষাতেই নয়, বরং পুরুষকে প্রেমপূর্ণভাবে বা যৌন-আবেদনের সাহায্যে আকৃষ্ট করার জন্যেও লিঙ্গ পুনঃপ্রতিষ্ঠাকরণ অস্ত্রপ্রচার (sex reassignment surgery) করতে চায়।”

আরেকটি ভাগে পড়ে স্বনারীত্বপ্রেমী রূপান্তরকামিরা (autogynephilic transsexuals)। ব্ল্যানচার্ড বলেন, “এরা কেবল নিজেদেরকে নারীতে পরিণত করবার ধারণার দ্বারাই যৌন উত্তেজনা অনুভব করেন।” ব্ল্যানচার্ড আরও বলেন, “এদের কোনটাই “মেকী রূপান্তরকামিতা” নয়। উভয়েই রূপান্তরের দ্বারা উপকৃত হতে পারেন। রূপান্তরকামিতার শিক্ষায়তনিক আলোচনায় এই দুই প্রকারভেদ এর পার্থক্যের আলোচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ”।

স্বনারীত্বপ্রেম শব্দটি আমার সৃষ্টি। কারও এটা পছন্দ না হলে অন্য কোন নাম প্রস্তাব করতে পারেন। তবে নাম যাই হোক, এই বিষয়ে সমকামী-বিষমকামী সকলের মধ্যেই সচেতনতা সৃষ্টি দরকার।

শেয়ার করুন:
  • 29
  •  
  •  
  •  
  •  
    29
    Shares

লেখাটি ২৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.