মাতৃত্ব ও পেশা-নয় কোনো দ্বন্দ্ব

0

দিল আফরোজ দ্যুতি:

মাতৃত্ব যেমন একজন নারীর জন্য খুবই সহজাত একটি বিষয়, তেমনি একজন শিক্ষিত নারী সমাজের উন্নয়নে কাজ করবে, পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করবে এবং সর্বোপরি নিজের একটি পরিচয় তৈরি করবে, তা কি খুবই স্বাভাবিক বিষয় নয়? হয়তো অনেকেই আমরা এর উত্তরে হ্যাঁ বলবো, কিন্তু মনের অজান্তেই কেন যেন আমরা মাতৃত্ব ও কর্মজীবী নারীর অস্তিত্ব একসাথে দেখতে অভ্যস্ত নই, অথবা দেখতে চাই না।
মনের অজান্তেই কেন যেন আমরা নারীর এই দুই পরিচয়ের মাঝে একটি সীমারেখা টেনে দেই, একজন কর্মজীবী নারীর মধ্যে তৈরি করি তার মাতৃত্ব ও পেশা’র দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব এবং দ্বন্দ্বময় কথা ও আচরণ একজন মাকে করে তোলে সন্তানের প্রতি মানসিকভাবে দুর্বল ও কর্মস্থলে অস্থির। কিন্তু এই আমরাই হয়তো আধুনিকতার লেবাস পরে কথায় কথায় উদাহরণ দেই উন্নত বিশ্বের কোন সাংসদের সংসদে বসে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্তানকে দুধপান করানোর!

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব সেন্ট লুইস পরিচালিত এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, একজন কর্মজীবী মা তার অন্যান্য যেকোনো সন্তানহীন সহকর্মী অপেক্ষা বেশি কর্মদক্ষ। একটু ভাবুন তো, একজন মা যিনি নয় মাস তার সন্তানকে এতো ধৈর্য্য সহকারে গর্ভে ধারণ করেন এবং অপরিসীম কষ্ট করে জন্ম দেন, কর্মক্ষেত্রে তিনি কী পরিমাণ ধৈর্য্যশীলতা ও কষ্টসহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে পারেন? একজন মা যিনি হাজারও কর্মব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের ছোট থেকে ছোট প্রয়োজনগুলোও ভুলেন না, তিনি কতোটা দায়িত্বশীলভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করবেন, তা বলাই বাহুল্য।

কর্মজীবী নারী ও তার মাতৃত্ব পরস্পর প্রতিযোগী কোনো বিষয় নয়, বরং নারীর দুই পরিচয়ই অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত। নারী একই সাথে তার সন্তান এর প্রতি যেমন দায়িত্ব পালন করতে পারে, তেমনি কর্মক্ষেত্রেও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারে। পরোক্ষভাবে সমাজের এবং প্রত্যক্ষভাবে আমাদের কিছু ভুল মানসিকতার কারণে আমাদের বহু কর্মজীবী মা হয় তার কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে, নয়তো পেশাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সন্তানকে কাছে না পাওয়ার দ্বন্দ্বে জর্জরিত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে যেমন মনে করা হচ্ছে মা হওয়া মানেই নারীর কর্মদক্ষতা কমে যাওয়া এবং এই মানসিকতার কারণে প্রতি পদে পদে কর্মদক্ষ নারীটিকে পূর্বের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হচ্ছে, কর্মোন্নতি ধীর হয়ে যাচ্ছে, কাজের বিভিন্ন ধাপে তাকে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে বলে দেওয়া হচ্ছে যে যেহেতু সে একজন মা, তাই এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হয়তো সে সম্পন্ন করতে পারবে না।

কর্মক্ষেত্রে এই অবহেলা যেমন দেখি একজন কর্মজীবী মা’র প্রতি, তেমনি আরেক সমস্যাও আছে যেখানে দেখা যায় কর্মজীবী মাকে অতিরিক্ত কাজের চাপ চাপিয়ে দেয়া এটা মনে করে যে সেই নারীটি সেই মুহূর্তে শুধুমাত্র নিজের কর্মদক্ষতা প্রমাণের জন্য যেকোনো কাজ যা হয়তো তার করার কথা না তাও করবে। কেন করি আমরা এই আচরণগুলো? যে মুহূর্তে সেই কর্মজীবী মা’টির প্রয়োজন একটু আত্মবিশ্বাস ও অভিযোজন, ঠিক সেই মুহূর্তেই কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠে তার জন্য প্রতিকূল। এই প্রথাগত আচরণ কি নারীর পেশাগত পরিচয়ের প্রতি নির্যাতন নয়? তাকে মনে করিয়ে দেয়া নয় যে সে একজন নারী, সুতরাং কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের সে যোগ্য নয়? কেন একই পরিমাণ যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্বেও একজন পুরুষ অপেক্ষা একজন নারীকে কর্মক্ষেত্রে বারবার নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হবে?

শুধু কর্মক্ষেত্র কেন, পরিবারেও কি আমরা একজন কর্মজীবী মাকে যথাযথ সম্মানটুকু দিচ্ছি? সন্তান জন্ম দেওয়ার সাথে সাথেই কি আমরা ভেবে নিচ্ছি না যে এখন এই সন্তানের সমস্ত দায়িত্ব তার মা’র এবং পেশাটি হবে এখন তার জন্য অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ? পরিবার কি এখনো ভাবতে শিখেছে যে, সন্তান ও পেশা এই দুই-ই নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এই দুটি ভূমিকা মোটেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়! একজন কর্মজীবী মা তার পেশাকে প্রাধান্য দিচ্ছে, তার মানে কি এই যে সে একজন ভালো মা নয়? সে তার সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল নয়? চারপাশের কর্মজীবী মা’দের প্রতি একটু খেয়াল করে দেখুন তো একজন কর্মজীবী মা তার সন্তানের কোন প্রয়োজনটা পূরণের ব্যবস্থা না করে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছে? সমাজের প্রচলিত মানসিকতার বাইরে বের হয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখবেন একজন কর্মজীবী মা কতটা অতিরিক্ত চাপ নিজের উপর নিচ্ছে এই দুই পরিচয়কে সামাল দিতে গিয়ে।

তাহলে কেন আমরা একজন মা’কে এই দ্বন্দ্বে ফেলি? কেন আমরা মেনে নিতে পারি না যে, সন্তানের দায়িত্ব বাবা-মা দুইজন সমানভাবে পালন করে কর্মক্ষেত্রেও দুইজন সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারে? কীভাবে কর্মজীবী মা তার পেশাগত দায়িত্ব ও সন্তানের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবেন, তা নিয়ে দোষারোপ বা সমালোচনা না করে সিদ্ধান্তটা কি সেই কর্মজীবী মা এবং তার জীবনসঙ্গী’র উপর-ই ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়? পরিবারের একটু সহযোগিতা, একটু সহমর্মিতাই পারে একজন কর্মজীবী মাকে আশ্বস্ত করতে যে; তুমি এগিয়ে যাও কর্মক্ষেত্রে, আমরা আছি তোমার সাথে।

মাতৃত্ব কখনই নারীর দুর্বলতা নয়, বরং সন্তানের জন্ম নারীকে করে তোলে আরও ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল এবং উদ্দীপনায় ভরপুর। একইভাবে পেশাগত দায়িত্ব কখনই ভালো মা হওয়ার পথে অন্তরায় নয়। তাই নারীর অগ্রযাত্রায় তার মাতৃত্বকে বাঁধা হিসেবে দাঁড় না করানোই উত্তম, কারণ মাতৃত্ব কিন্তু সব বাঁধা অতিক্রম করতে সক্ষম!

ডেপুটি ম্যানেজার
কমিউনিকেশন, প্ল্যানিং এন্ড নোলেজ ম্যানেজমেন্ট
ব্র্যাক এডুকেশন প্রোগ্রাম, ব্র্যাক

শেয়ার করুন:
  • 746
  •  
  •  
  •  
  •  
    746
    Shares

লেখাটি ১,১১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.