সংসার ও সন্তান নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় কিনা!

0

তৌফিকুর রহমান:

শুধুমাত্র হ্যাঁ বা না শব্দে এই প্রশ্নের উত্তর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করলে পক্ষে-বিপক্ষের রোষানলে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় আমি দুদিকেই কিছু কথা বলতে চাই। বাকিটা সম্মানিত পাঠকেরা বিচার করবেন কোনদিকটার পাল্লা ভারী। সংসার, সন্তান বা ক্যারিয়ার এসবের ভারসাম্য বজায় রেখে সহাবস্থান নিশ্চিত করা যায় কিনা তার উপায় বের করাই এ লেখার উদ্দেশ্য, কারণ আমি বিশ্বাস করি সুন্দর জীবনের জন্য কোনটিকেই ফেলে দেয়া সম্ভব না। তবে সেজন্য সবার আগে আমাদের বুঝতে হবে কোনটি আমাদের সবার সাধারণ সমস্যা আর কোনগুলো আসলে ব্যক্তিগত সমস্যা, আর সেই অনুযায়ী সমাধানের পথ খোঁজা।

যে প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম, সংসার ও সন্তান নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় কিনা। হ্যাঁ দিয়ে যদি উত্তর দেই তাহলে হ্যাঁ এসব অবশ্যই ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায়, তবে তা শুধু নারীর জন্য নয়। সংসার বা সন্তান এ দুটোই অন্তরায় বা পিছুটান নারী এবং পুরুষ উভয়ের ক্ষমতায়নের পথে, ক্যারিয়ার গড়ার পথে, সৃষ্টিশীলতার পথে। কারণ সংসার বা সন্তান সুষ্ঠুভাবে মেইনটেন করতে পারাটা কোন সহজ কাজ নয়, বরং এখানে পারদর্শিতার বিষয় রয়েছে যা সবাইকে দিয়ে সমান ভাবে হয় না, এর জন্য সময়, শ্রম এবং মনঃসংযোগ দিতে হয়, এসব একটা ফুলটাইম দায়িত্ব বটে। তবে প্রাকৃতিক কারণেই হোক বা ঐতিহাসিক ভাবেই হোক সভ্যতার শুরু থেকেই নারীরা সংসার বা সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছিল, ফলে পুরুষ নিশ্চিন্তে এগিয়ে যেতে পেরেছে বাইরের কাজে, সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়ার কাজে। ঘরে বাইরের এই কাজের বিভাজনে শুরুতে পুরুষ বা সমাজের যতখানি না ভূমিকা ছিল তার চেয়ে বেশী ভূমিকা রেখেছে প্রকৃতি স্বয়ং।

লেখার এই পর্যায়ে যারা ভাবছেন আমি প্রকৃতির উপর দায় চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি যা নারীর জন্য অবমাননাকর তাদের উদ্দেশ্যে আমি খুবই সাম্প্রতিক একটা গবেষণার তথ্য তুলে ধরতে চাই।
জেন্ডার সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে জাতিসংঘের যে উইংটি কাজ করে তারা ইউএন ওমেন নামে পরিচিত। এ বছরের নারী দিবসের প্রাক্কালে তারা প্রকাশ করেছে পাঁচটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা যা বিগত এক শতকে নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এগুলো হচ্ছে হিপ্পো রোলার (আফ্রিকান অঞ্চলে সুপেয় পানি পরিবহনের জন্য গড়িয়ে নেয়ার বিশেষ পাত্র), বাইসাইকেল, ইন্টারনেট, স্যানিটারি প্যাড এবং নারীদের উপযোগী পরিধেয় প্যান্ট। ইন্টারনেট বাদে অপর চারটি উপকরণের উপযোগীতা বিশ্লেষন করলে দেখা যাবে এগুলো নারীকে সাহায্য করেছে মূলত প্রকৃতি প্রদত্ত কিছু বাধা অতিক্রমে। এসবের ফলে ঘরের বাইরে এসে কাজ করাটা তাদের জন্য হয়েছে নির্বিঘ্ন।

এখন ঘরের বাইরে আসাটা নির্বিঘ্ন করা গেলে দীর্ঘদিন ধরে নারীর আওতায় থাকা দায়িত্ব অর্থাৎ সংসার সন্তানের জন্য তার প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে একটা হঠাৎ শূন্যতা সৃষ্টি হওয়া। হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া এই শূন্যতাই মূলত পিছুটানের সৃষ্টি করেছে, প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীর ক্ষমতায়নের পথে। তাহলে যে প্রশ্ন দিয়ে লেখাটার শিরোনাম তার উত্তর যদি “না” চাই অর্থাৎ আমরা যদি চাই যে সংসার বা সন্তান নারীর ক্ষমতায়নে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না, আমরা যদি চাই যে আমাদের নারীসমাজ এগিয়ে চলুক তবে এই দায়িত্ব কাউকে না কাউকে শেয়ার করতেই হবে, নারীকে সুযোগ দিতে হবে এসকল প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করার।

এখন প্রশ্ন আসবে কে নিবে এই দায়িত্ব, পরিবার সমাজ নাকি রাষ্ট্র। সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছে আমাদের কিছু প্রত্যাশা থাকতেই পারে। তবে সীমিত রিসোর্স আর বিশাল জনগোষ্ঠীর আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে ইমিডিয়েট কিছু আশা করা ঠিক হবে না। আপাতত তাই পরিবারের ভূমিকাটাই মুখ্য। সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেসব সুবিধা দেয়া যেতে পারে তা হোল মানসম্মত ডে কেয়ার সেন্টার নিশ্চিত করা, নারীস্বাস্থ্য ও মাত্রিত্বকালীন ছুটির সুবিধার যথাযথ পরিপালন নিশ্চিত করা ইত্যাদি। তবে স্বাভাবিক ভাবেই সংসারী একজন নারীর সর্বাধিক প্রত্যাশা থাকবে তার স্বামীর কাছে। তবে স্বামীকে কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাইলে তার কাছেও সংসারে ফুলটাইম সাপোর্ট আশা করা উচিৎ হবে না। সেক্ষেত্রে উভয়ের পরিবারের বয়োজ্যোষ্ঠ সদস্যদের ভূমিকা রাখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

কর্মজীবী নারীদের প্রধান সমস্যা হয় মূলত তাদের ক্যারিয়ার ও সংসারের শুরুর সময়ে। এই সময়টা বড্ড ক্রুসিয়াল। সংসারে থাকে ছোট বাচ্চা, ক্যারিয়ারেও উপরে ওঠার সময়, এদুটোই বড় ডিমান্ডিং। তবে আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন যে এমন ফায়ার ফাইটিং সিচুয়েশনটা সাময়িক, হতে পারে ১০/১২ বছর। এরপর কিন্তু সন্তান এমনিতেই একটু আলগা হয়ে পড়বে, ব্যাস্ত হবে নিজস্ব জগতে, আর ক্যারিয়ারের চড়াই উৎরাইগুলোও তখন হয়ে যাবে অনেকটাই মসৃণ। এই ১০/১২ বছরের সময়টার জন্য আপনার যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে কিনা, যথেষ্ট সাপোর্ট আছে কিনা মূলত সেটাই নির্ধারণ করে দিবে এই লেখার শিরোনামের প্রশ্নটির উত্তরটি কি হবে।

পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আমরা পরিচিত হতে পারি এযুগের অনেক মহীয়সী নারীদের সাথে, স্বীয় যোগ্যতায় কর্মক্ষত্রে যারা উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। চিকিৎসক, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে বিশালাকায় বিমান বা যুদ্ধবিমানের বৈমানিক, কমান্ডো, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ বা এভারেস্ট জয়ী, কোথায় নেই তারা! কিন্তু সকল সফল নারীদের গল্পেরই একটা জায়গা কমন, সেটা হলো পরিবার থেকে তাদের উৎসাহ, উদ্দীপনা আর সাপোর্ট দিয়ে যাওয়া। যেন তারা আটকা পড়ে না যান সেই সংসার আর সন্তানের পিছুটানে। তবে এটাও ঠিক তারা কিন্তু সংসার বা সন্তানকে এড়িয়ে চলেননি, বা তেমনটি করার জন্য অন্যদের পরামর্শও দেননি। বরং তারা বলেছেন তাদের চলার পথে তাদের পরিবারের সহযোগিতার কথা।

আলাদা করে আমাদের আশেপাশের শীর্ষস্থানীয় সফল সকল নারীদের কথা হয়তো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব হবে না। তবে সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্য চলচিত্র “Hasina- A Daughter’s Tale”-এর মাধ্যমে জানা হয় যে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রথমদিকের দিনগুলো ছিল শেখ হাসিনার জন্য অত্যন্ত কঠিন, অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সফল রাজনীতিবিদ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্বের তালিকায় থাকা তিনিও কিন্তু একজন মা। দুটি শিশু সন্তান নিয়ে কিভাবে তিনি পার করেছিলেন তার সেই শুরুর দিনগুলো।
সেই প্রশ্নের উত্তর পাই উক্ত চলচ্চিত্রে শেখ রেহানার বক্তব্যে। শেখ রেহানা দেশে ফিরে দেখতে পান রাজপথের সংগ্রামে ব্যস্ত শেখ হাসিনা সেভাবে খেয়াল দিতে পারছেন না জয় এবং পুতুলের দিকে। শেখ রেহানাই তখন উদ্যোগ নেন জয় এবং পুতুল দুজনকেই ভারতের নৈনিতালে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়ার। সুতরাং দেখুন বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ সকলের জন্যই প্রযোজ্য। বলিউডের তারকা মা যারা আছেন যেমন মাধুরী দীক্ষিত, কাজল বা ঐশ্বরিয়া কেউই কিন্তু কখনোই কোন সাক্ষাৎকারে তাদের সংসার বা সন্তান নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেননি। বরং সবাই নিজ নিজ মত করে ব্যক্তিগত পরিকল্পনার মাধ্যমে ঠিক করেছেন কখন কোথায় কতটুকু প্রায়োরিটি দিবেন।

সুতরাং যারা সংসার, সন্তান ক্যারিয়ার ইত্যাদি নিয়ে গোলকধাঁধায় আছেন তারা প্রথমেই পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিন। আর এই পরিকল্পনা করতে হবে যুদ্ধক্ষেত্রে আসার আগেই। অল্প বয়সে অভিজ্ঞতার অভাবে নিজেদের পক্ষে হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারা সম্ভব হয় না। সেক্ষত্রে বাবা মা পরামর্শকের দায়িত্ব নিতে পারেন। লেখাপড়া শেষ, ক্যারিয়ার শুরু, বিয়ে, সন্তান নেয়া এসবের মাঝের গ্যাপ অথবা একাধিক সন্তানের ক্ষেত্রেও বা কতখানি গ্যাপ থাকবে এসবই পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।

আর পুরো সময়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সাপোর্ট পাওয়া যেতে পারে তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। এসব পরিকল্পনা সঠিকভাবে করতে পারা না পারার উপরেই নির্ভর করবে এই লেখার শিরোনামের উত্তর কী হবে। তবে এও বুঝি যে, সবসময় ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনুধাবন করে আগে থেকে পরিকল্পনা করা সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিজ নিজ জীবনের চাহিদা বুঝে বিভিন্ন বিষয়ের প্রায়োরিটি সেট করে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। ধন্যবাদ সকলকে।

শেয়ার করুন:
  • 171
  •  
  •  
  •  
  •  
    171
    Shares

লেখাটি ৭৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.