মাতৃত্ব যখন নারীর শ্রেষ্ঠ সম্মান

0

ফারজানা নীলা:

আপনার বিয়ের দুই বছর হয়ে গেছে এখনো বাচ্চা নেন নাই? ও মাগো, করছেন কি এসব? আরে মজা ঘুরাফিরা পরেও করতে পারবেন কিন্তু এখন বাচ্চা না নিলে অনেক সমস্যা হয়ে যাবে। চাইলেও আর পারবেন না নিতে। মেয়েদের আছে কি বাচ্চা ছাড়া? জন্ম দিতে না পারলে কেউ পাত্তা দিবে না”

যেকোনো বিবাহিত বাচ্চা না নেওয়া দম্পতি এটা শুনতে অভ্যস্ত হওয়ার কথা। বিশেষ করে মেয়েরা। বিয়ের এক বছর গড়াবে কী গড়াবে না শুরু হয়ে যাবে বাচ্চার জন্য হা হুতাশ। আমরা মনে প্রাণে এটা বিশ্বাস করি বিয়ে মানেই সন্তান। নারী মানেই উৎপাদন। শিক্ষিত অশিক্ষিত অধিকাংশ মানুষের চিন্তাধারা এমনই।

মানুষ বিয়ে করে সন্তান জন্মদানের জন্য। এটা ছাড়া বিয়ের আর কোনো উদ্দেশ্য লক্ষ্য বৈশিষ্ট্য নেই। যে দম্পতির সন্তান নাই, বা সন্তান নিচ্ছেন না তাদের জীবনের কোনো মানেই হয় না। বেঁচে থাকাও মনে হয় নিরর্থক।

এই নিরর্থক জীবন হলো মেয়ের জীবন। বাচ্চা না নিলে বা না হলে সেই মেয়ের জীবন বৃথা। কারণ তাঁর নারী জন্মের সার্থকতা নির্ভর করে শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র সন্তান জন্মদানের উপর। এবার সে নারী জীবনে আর কী কী করেছে, কী কী অর্জন করেছে, কী কী তাঁর যোগ্যতা আছে এসবই গৌণ। সে যদি কোনো বড় অফিসার হয়, সে যদি ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার -পাইলট -অভিনেত্রী -ব্যবসায়ী -সরকারী বড় কর্মকর্তাও হয়, তবুও বলা হবে “হয়ে কী লাভ, বাচ্চাই নাই”। এবং বাচ্চা নিতে গিয়ে সে যদি এই সকল অর্জন ত্যাগ করে দেয়, তবে সে মহীয়সী। অথবা এটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয় যে মেয়েই তো ত্যাগ করবে। বাচ্চার চেয়ে মূল্যবান আর কী আছে নারীর জীবনে! ক্যারিয়ার- অর্থ- প্রতিপত্তি দিয়ে কি নারী জল ধুয়ে খাবে?

অথচ হুবহু কথাগুলো আমরা ছেলের জন্য কি শুনতে পাই? তাঁকে কি কেউ বলে তুমি বাচ্চা না নিলে তোমার জীবনের কোনো মূল্য নেই? সমাজ পরিবার স্ত্রী তোমাকে পাত্তা দিবে না! বাচ্চা ছাড়া তোমার জীবনে আর আছে কী! শুনতে কি পাই? পাই না। কারণ আমাদের মননে এটাই গাঁথা যে পুরুষমাত্রই প্রতিষ্ঠিত কেউ, আর নারী মানেই সন্তান উৎপাদনে প্রতিষ্ঠিত।

একটা মানুষের জীবন আমরা বিচার করে ফেলি সে আরেকটা মানুষ জন্ম দিতে পারছে কিনা, বা দিচ্ছে কিনা বা কেন দিচ্ছে না সেটার উপর। অথচ বিয়ে মানেই শুধু উৎপাদন নয়। বিয়েতে একে অপরকে জানতে বুঝতে থাকতে সময় দেওয়া উচিত। আদৌ ওই মানুষটির সাথে সারা জীবন কাটানো যাবে কিনা সেটা জানার আগেই সংসারে তৃতীয় জনের আগমন ঘটিয়ে ফেলি। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে সময় কাটাবে, সেটা হোক না ২ বছর বা ১০ বছর। দুজন যদি দুজনে সুখী থাকে, তাতে কার কী ক্ষতি? কিন্তু সম্ভবত আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনে সুখী এটা দেখতে অভ্যস্ত নই। আমাদের কাছে এটা দৃষ্টিকটু লাগে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবশ্যই সন্তান আসতে হবে নইলে আবার কিসের স্বামী-স্ত্রী!

সন্তানের প্রয়োজন যখন কেউ নিজ থেকেই বোধ করবে তখনই সন্তান নেওয়া উচিত। সময় হয়েছে তাই নিতে হবে, সে জন্য নেওয়া মানেই হলো সন্তান ছাড়া সে অচল! আসলেই কি তাই? সন্তান ছাড়া কি মেয়েদের কোনো মূল্য নেই? সমাজ আর পরিবারের অযৌক্তিক আবেগতাড়িত কথায় না গিয়ে বাস্তব কী বলে?

মেয়ে হোক বা ছেলে সে জীবনে কী কী অর্জন করেছে বা করেনি, সেটা দিয়েই তাঁকে মূল্যায়ন করা উচিত। সন্তান দিয়ে নয়। সন্তান জন্মদান শুধুমাত্র একটা জৈবিক ক্ষমতা নারীদের। এটাই একমাত্র ক্ষমতা নয়। সে তাঁর পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে কী করতে পেরেছে সেটাই তাঁর আসল অর্জন, আসল শ্রেষ্ঠত্ব। জন্ম তো প্রাণীজগতের অন্যান্য অধিকাংশ স্ত্রীলিঙ্গ দিতে পারে। তাতে মহত্ত্ব কোথায়?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 344
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    344
    Shares

লেখাটি ৯৭১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.