‘নারী’ মোটেও কর্পোরেট পণ্য নয়, এর প্রতিবাদ প্রয়োজন

0

আনন্দ কুটুম:

সম্ভবত নতুন একটি ট্রেন্ড চালু হয়েছে। অনেক পুরুষকেই দেখলাম নারীদের মত নানা ধরনের অর্নামেন্টস পরে ছবি তুলে আপলোড করে নারী দিবস উদযাপন করছেন। এরা অধিকতর লিবারেল পুরুষ সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘নারী’ মানেই কি গহনা/অর্নামেন্ট? মিস ইন্টারপ্রেটেনশন হচ্ছে না তো?

আমি একটি মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে বড় হয়েছি। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে নারী কেবলই সাজগোজ গহনার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, নারী ব্যাপারটা আরও ভিন্ন, আরও গভীর এবং আরও ব্যাপক। আমার মা সারাজীবন তার পেশাগত দায়িত্ব পালন নিয়ে এতো ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন যে, আহ্লাদ করে শরীরে গহনা জড়ানোর জন্য যে সময়টুকু প্রয়োজন হয়, সেই সময়টুকু তার কখনোই ছিলো না। এবং আমার মায়ের মতো এমন নারী আমার চারপাশে অনেক দেখি।

লেখক: আনন্দ কুটুম

নারী মানেই গহনা বা গহনা মানেই নারী এটা প্রচণ্ড ভুল ব্যাখ্যা নারী সম্পর্কে এবং বলতে দ্বিধা নেই  যে পুরুষমাত্রই নারীকে এভাবে দেখতে অভ্যস্ত। এই অভ্যস্ততা গড়ে উঠেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। পুরুষের তৈরি করা এই দৃষ্টিভঙ্গি সন্তর্পণে লুকিয়ে আছে সর্বত্র। ফলে যে পুরুষটি অধিকতর লিবারেল, তিনিও নারী বলতে একটি পরিপাটি সাজগোজ বা গহনায় জড়ানো একটি নারী মুখাবয়ব ভেবে নেন। কিন্তু নারী কি আদৌ তাই?

আমি আমার মেয়ে বন্ধুদের সাথে যতবার তাদের পিরিয়ড নিয়ে কথা বলেছি, তারা প্রায় সবাই বলেছে, ‘এটা একটি অব্যাখ্যান যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি। তুমি হয়তো আমার অভিজ্ঞতা শুনে কিছু একটা কল্পনা করে নেবে, কিন্তু উপলব্ধি করতে পারবে না, কারণ, তুমি নারী নও’।

অনেকেই বলেছে যে, পিরিয়ডের সময় মানসিক অবস্থা খুব বিক্ষিপ্ত থাকে। তখন বাইরের মানুষগুলোর সাথে স্বাভাবিক কমিউনিকেশনও বাধাগ্রস্ত হয়। মা হতে পারার মধ্যে নারী যে ব্যতিক্রমতা, মাহাত্ম্য লুকায়িত আছে, সেটা পুরুষের নেই, এটা আমরা সবাই জানি। সুতরাং এই যে নারী বলে যে টার্ম, সেটা আসলে কী? গহনা? সুন্দর অবয়ব? চিকন সুরে কথা বলা? না আবেগ?

নারীত্ব আসলে যতোটা না শারীরিক/বাহ্যিক ব্যপার তার থেকে অধিক হলো মানসিক ব্যপার। অনুভূতি, দায়িত্ব, যোগ্যতা, সামর্থ্য। নারী-পুরুষ আদতে বায়োলজিক্যালভাবে প্রায় একই, ‘মানুষ’। সামান্য কিছু পার্থক্য। কিন্তু এই যে মৌলিক কিছু অনুভূতি আছে, সন্তান ধারনের সামর্থ্য আছে, স্তন্যদানের সক্ষমতা আছে, পিরিয়ডের সময় আবেগজনিত ইস্যু আছে, ভাবনা চিন্তায় ব্যতিক্রমতা আছে, শরীর ফেঁড়ে/কেটে নতুন একটি প্রাণীকে বাইরে বের করে নিয়ে আসতে পারার সাহস, এগুলোই হলো মানুষের মধ্য থেকে কিছু মানুষকে নারী হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। সুতরাং কোন মানুষ অর্নামেন্ট পরলেই সে নারী হয়ে যাবে না। অনুরূপভাবে অর্নামেন্ট না পরলেও নারীত্ব খোয়া যাবে না।

মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে বড় হয়েছি বলেই কিনা যে নারীকে গহনার বাক্সে বন্দী করে রাখার ব্যপারে আমার ভীষণ আপত্তি আছে। আর এই যে নারী দিবস, এটা আসলে কী ম্যাসেজ দিচ্ছে? ‘নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দিতে হবে?’ না কি ‘নারী বিভিন্ন কারণেই পুরুষ থেকে বেশি সেন্সিটিভ। সুতরাং তার সেন্সিটিভিটির প্রতি সদা জাগ্রত দৃষ্টি রাখতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সেই সেন্সিটিভ অংশের যত্ন নিতে হবে?’

আমার মতে নারী দিবসের উদ্দেশ্য দ্বিতীয়টি হওয়া উচিৎ। নারী পুরুষ জন্ম থেকেই সমান। সুতরাং নারীকে পুরুষের থেকে কম সুযোগ বা মর্যাদা দিলে সেটা ইনজাস্টিস। ইনজাস্টিস নিয়ে উৎসব করার কিছু নেই। নারী পুরুষের যে কোনো বিষয়ে যে প্রাপ্তির অসমতা আছে তা ঘুচানো জরুরি বটে। তবে নারী দিবস হোক মানুষের যে ব্যতিক্রম বিষয়গুলোর জন্য সে নারী সেই বিষয়গুলোকে সযত্নে আদর/মূল্যায়ন করার জন্য।

একজন নারী পাহাড়ে উঠতে পারে এতে কোনো ক্রেডিট নেই। কারণ পাহাড়ে পুরুষও উঠতে পারে, তৃতীয় লিঙ্গ ব্যক্তিও উঠতে পারে। কিন্তু নারী সন্তান জন্ম দিতে পারে। যেটা আর কেউ পারে না। সুতরাং সে সম্মান তো পাওয়ার যোগ্যই, অধিকতর মনোযোগ পাওয়ারও যোগ্য। নারী যে হরমোনাল চেঞ্জ এর জন্য তার অন্য কাজগুলো বাধাগ্রস্ত হয়, যা পুরুষের হয় না, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করার জন্য নারী দিবস হওয়া উচিৎ।

নারীর মাহাত্ম্য অনুভবের জন্য ‘নারী’ বিষয়টি উপলব্ধি দরকার। কর্পোরেট দুনিয়া বহু আগেই নারীকে পণ্য বানিয়েছে। এখন তারা ব্যস্ত নারী স্বাধীনতা, নারী দিবস, নারী সংগ্রাম এবং নারীর অর্জনগুলোকে পণ্য বানাতে। খুব সাবধান!!

শেয়ার করুন:
  • 683
  •  
  •  
  •  
  •  
    683
    Shares

লেখাটি ১,৬২৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.