“প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ দেয়া বাদ দিন”

0

দিনা ফেরদৌস:

কথাবার্তা বা চিন্তা ভাবনায় আমরা নারীরা আগের থেকে অনেক এগিয়ে গেলেও রান্নাঘর রয়ে গেছে ঠিক আগের মতো। ভালো গৃহিনী নিজেকে প্রমাণ করতে এখনও আগে হলুদ, না আগে মরিচ দিতে হয়, তা নিয়ে তর্কের শেষ নেই। আমাদের মা, চাচীরা যেমন ঘুমাতে যেতেন সবার পরে, আর ঘুম থেকে উঠার তাড়া ছিল সেই কাকডাকা ভোরে, আমাদের চাকুরিজীবী ভগিনীদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই।

দুর্গা দেবীর মতো দশ হাত না থাকলেও, দুই হাত দিয়ে সংসারের দশদিক সামলে, বাইরেও নিজেদের প্রমাণ করতে হচ্ছে প্রতিটি ক্ষেত্রে যে, তারা সব পারেন।

ঘুম থেকে উঠে নিজের দিন কীভাবে কাটাবেন তা নিয়ে না ভেবে সকলের নাস্তা, বাচ্চার টিফিন, দুপুরের রান্না থেকে শুরু করে বাজার সদাই সব তাকে ভাবতে হচ্ছে। অনেকে এসব করার বাইরে যে আলাদা জীবন আছে তা নিয়ে ভাবতে চান না অথবা ভাবতে যান না। অনেকে আবার এসবের মধ্যে নিজেদের বীরত্ব খুঁজে বেড়ান।
‘স্বামী তিনার হাতের রান্না ছাড়া খাবার মুখেই তুলতে পারেন না’! বাচ্চাদের (বুড়া বাচ্চাদেরও) তিনি একটু চোখের আড়াল হলে অচল হয়ে যায়। এক কথায় তিনি ছাড়া সারা সংসারই অচল। আত্মীয়-স্বজনের বিয়েবাড়ি, জন্ম বাড়ি, মরা বাড়ির কোন কাজই তাকে ছাড়া চলে না। যদিও তিনি জানেন এতো কিছু করার পরও তার বদনামের শেষ নেই। বিনিময়ে সব অকর্মাদের কাছ থেকে উপদেশ পেতে হয় ওই কাজটি কীভাবে করলে আরও ভালো হতো। তিনি সব বুঝেন, কিন্তু এতো ভাল স্বামী তার; যার মুখের দিকে তাকিয়ে সব মেনে নেয়া যায়, তাই সব মেনে নেন!

তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, তার বিয়ের সময় শাশুড়ি বলেছিলেন, আমার কিছুই চাই না, শুধু লক্ষ্মী একটা বউ চাই, যে আমার সংসার আগলে রাখবে। তিনি বিয়ের পর থেকেই লক্ষ্মী বউ হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উঠতে বসতে সব ক্ষেত্রে তিনি ব্যস্ত থাকেন নিজেকে সুপার-ওমেন প্রমাণ করতে। তিনি যতোই নিজেকে প্রমাণ করতে যান, চারপাশ থেকে তার উপর দায়িত্ব আরও চাপতে থাকে। সে সব দায়িত্বের ভারে যখন ক্লান্ত তখন আমরা শুনি, সারা জীবন এই করলাম, ওই করলাম কিছুই হলো না। বিশেষ করে হাউজ ওয়াইফদের ক্ষেত্রে এইসব হতাশা আরও বেশি দেখা যায়। তার মানে দেরিতে হলেও বুঝেন অন্যদেরকে তার উপর নির্ভরশীল করে তোলাটা ঠিক হয়নি।

আমি এইসব ক্ষেত্রে বলবো এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। এর পিছনে আমাদের মেয়েদের যথেষ্ট দায় আছে। নিজেকে প্রমাণ করার আরও বহু জায়গা আছে। আমরা হলুদ আগে না মরিচ আগে দিতে হয় তার জন্য যতটুকু সময় ব্যয় করেছি, আর কোন জায়গায় যত্ন সহকারে ঠিক ততটুকু সময় দিতে পেরেছি কি?
অন্যের কাছে নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে যতটুকু সময় ব্যয় করেছি, নিজের কথা ভেবে শুধু নিজের জন্য ততটুকু সময় ব্যয় করেছি কি? যাদের নিজেদের কোন প্রস্তুতি ছিল না বিয়ের পূর্বে, বা যারা বিশ্বাস করতেন বিয়ের পর তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর, যাকে শ্বশুর বাড়ির লোকজন নির্বাচন করেছেন তার পরিবারের সকলের বায়োডাটা থেকে শুরু করে তার গায়ের রঙ, চুল, দাঁত থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত দেখে; তিনারা বলতেই পারেন, সংসারটা তো নিজেরই, এখানে আলাদা করে আর নিজের জন্য সময় কী? সংসারের সবাইকে নিয়েই তো নিজের জীবন!

তাদের এই বিশ্বাসকে করুণা করা যায়, এর বেশি কিছুই না। যাদের কোনো যোগ্যতাই নেই নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেবার, তারা এর চাইতে ভালো আর কী বলতে পারে! যে স্বামী ঘাড়ে দায়িত্ব নেবে, সে তার মতো করেই চালাবে, এখানে বহু নীতিকথা, মানবিকতার কথা বলা যেতেই পারে, সমাধান হচ্ছে কি? আগে নিজের দায়িত্ব নিজে নেবার মানসিকতা লাগে, তারপর এজন্য প্রয়োজনে ফাইট করা লাগে, এরপর আসবে সমাজকে দোষারোপ করা।

এবার আসি যাদের বাইরে কাজ করার প্রস্তুতি আছে, তাদেরও কেনো এইসব বিষয় নিয়ে সাফার করতে হচ্ছে।
প্রথমত হচ্ছে, ছেলেরা বিয়ের আগে যেভাবে কন্ডিশন দেয়, আমরা মেয়েরা কি সেই রকম দেই? নাকি লম্বা কাবিন, শিক্ষিত পয়সাওয়ালা ছেলে দেখেই খুশিতে বাক বাকুম হয়ে যাই! একটি শিক্ষিত চাকুরিজীবী মেয়েকে বিয়ে দিতেও অভিভাবকদের মেয়ের সিকিউরিটির জন্য কাবিনের বাকি টাকা পয়সা নিয়ে যতোটা দর কষাকষি করতে দেখা যায়, তার নগদ চাকরি বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয় নিয়ে ততোটা কথা বলতে দেখা যায় না।

সেদিন চিত্র নায়িকা ‘মাহিয়া মাহির’ বিয়ের পর তার বরকে নিয়ে একটি সাক্ষাৎকারে দেখা গেল। তার বর বলছেন, মাহির কাজের ক্ষেত্রে তার কোনো বাধা নেই, তিনি তাকে এই স্বাধীনতা দিয়েছেন। ‘মাহিয়া মাহি’র বরকে আমার কাছে বেশ সহজ সরল মানুষ মনে হয়েছে, তিনি কথাটি সরলভাবেই বলেছেন। তবে কথা হচ্ছে, ‘চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি’র বিয়ের পর পরই কি বর তার স্বাধীনতার মালিকে পরিণত হয়ে গেলেন? স্বাধীনতা তো প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার, এটা কি কেউ কাউকে দেয়ার জিনিস?

আরও কিছু যোগ্যতা সম্পন্ন নারী আছেন, যারা মনে করেন তাদের এতো যোগ্যতা থাকতে যোগ্যতাসম্পন্ন পুরুষেরা কেনো তাদের পাত্তা না দিয়ে, কম যোগ্যতাসম্পন্ন নারীদের বেছে নেয়। ম্যাডাম, যারা আপনাদের যোগ্য হয়েও আপনাদের পাত্তা দিচ্ছে না, বুঝবেন আপনার এই যোগ্যতাই তার বড় সমস্যা। তার যোগ্যতার দরকার নেই। তার যোগ্যতা আছে বলেই সে বাজায়ে লক্ষ্মী বউ নিয়ে আসতে চাচ্ছে।

আপনারও যেখানে যোগ্যতা আছে, নিজের জন্য বাজিয়ে নিয়ে আসেন। যে আপনাকে পাত্তা দেয় না, তার পিছনে মিঁউ মিঁউ করা ছাড়েন। সেদিন “প্রথম আলো”তে দেখলাম, থাইল্যান্ডের এক ধনকুবের ‘আরনন রদথং’ তার ২৬ বছর বয়সী মেয়ের বিয়ের জন্য প্রস্তাব রেখেছেন, পরিশ্রমী পাত্রের জন্য ৪০ হাজার পাউন্ডসহ সুবিশাল ফলের বাগানের মালিকানাও দেবেন, যেখানে থাইল্যান্ডের কিছু এলাকায় ঐতিহ্য আছে, বিয়েতে পাত্রপক্ষ কনেপক্ষ’কে যৌতুক দেবার। একজন ভালো পরিশ্রমী পাত্রের জন্য ‘আরনন রদথং’ সেই প্রথা ভাংতে প্রস্তুত। কোনো সমাজের কোনো প্রথাই একদিনে তৈরি হয়নি ।

আর একদিনে তা ভাঙ্গাও সম্ভব না। কিন্তু আমরা নিজের জন্য নিজে কতটুকু করার চেষ্টা করছি সেটা বড় ব্যাপার। শুধু সব ধরনের যোগ্যতা থাকলেই জীবনে সব কিছু পাওয়া যাবে, এমন কোন কথা নেই। যেখানেই কোন ভুল বা অন্যায় হবে প্রথম থেকে মেনে না নিয়ে সেখান থেকেই প্রতিবাদ করতে হবে।

সবক্ষেত্রে ভালো মেয়ের সনদের জন্য মুখ বন্ধ করে বসে থাকতে নেই। আপনি যতোই ভাল হোন না কেনো, ভালোর সনদ যেখানে সমাজের উপর নির্ভর করে, তাই যতোই প্রমাণ দেন, ওই পরীক্ষা সারা জীবনেও শেষ হবে না। যখন যার প্রয়োজন থাকবে আপনার কাছে, সে তার প্রয়োজনে আপনাকে ভাল বলবে, আর যেদিন বলবেন পারবেন না, সেদিন খারাপ বলতে এক মুহূর্তও ভাববে না।

তাই বলি এখনো সময় আছে, নিজের জন্য ভাবুন, শুধুই নিজে ভালো থাকবেন কীভাবে, তার জন্য ভাবুন সবকিছুর আগে। আপনি কেমন মানুষ তা আপনার চাইতে কে আর ভালো জানে। সব জায়গায় নিজেকে প্রমাণ দেয়া বন্ধ করুন। বিয়ে, সংসার নামক অস্থিরতা থেকে বেরিয়ে আসুন।

আজ আপনি কিছু করলে যেমন বেশি কিছু হবে না, কাল আপনি না থাকলেও কিছু আটকে থাকবে না। বিয়ে করুন, সংসার করুন একজন সঙ্গীর জন্য, একজন বন্ধুর জন্য, যার সঙ্গে সংসারের সব কিছু ভাগাভাগি করে নেয়া যায়। এখানে কেউ কারো প্রভু বা দাস নয়। বিয়ে করুন নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে, কারও ঘাড়ে নিজের দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে নয়।

নিজের জায়গায় নিজের আত্মবিশ্বাস থাকলে, বাইরের লোকের সাহস নেই আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কথা বলার। যতোবার আপনি নিজেকে অন্যের কাছে প্রমাণ করতে যাবেন, ততোবার অন্যরা আপনার দুর্বলতার সন্ধান করবে। আজ যাদের প্রশংসায় আপনি মুগ্ধ হোন, জেনে রাখুন তারা শুধুই নিজের প্রয়োজনে আপনাকে ব্যবহার করতে চায় বলে এই প্রশংসা করে, আপনার ভালো থাকা বা না থাকাতে তাদের কিচ্ছু যায় আসে না।

বাঁচুন নিজের জন্য, কাজ করুন নিজের জন্য, নিজের প্রশান্তির জন্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ দেয়া বাদ দিন।

শেয়ার করুন:
  • 1.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.6K
    Shares

লেখাটি ৪,০২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.