বন্ধুর পথে বন্ধু

0

নাজনীন হাসান চুমকী:

একটা মেয়ে জন্মানোর পর থেকে খুব কালারফুল জীবন পায়, হরেক রঙের জামা। একটু বড় হতেই নানা ডিজাইনের ফ্যাশানেবল ক্লিপ, জুতা মোজা, খেলনা, পুতুল। আরেকটু বড় হতেই পায় গহনা, টিপ, ব্যান্ড, চোখে মায়া নিয়ে আসে গাঢ় কালো কাজল। যার কোনোটাই পুরুষ পায় না, ছোট থাকলে যতটুকু কালারফুল পোষাক পায় পুরুষ, বড় হতে হতে ততটাই ফিকে হতে থাকে রঙ।
বড় বয়সে পুরুষের সাথে রঙটা কেমন যেন মানায় না (যদিও সিনেমা বা বাস্তব জীবনে কিছু পুরুষদেরকে রঙ বেরঙের পোষাক পরতে দেখি, তবে, সেটা সবার ক্ষেত্রে মানানসই নয়)।
অথচ এই সাদামাটা পোষাক পরিধান করা পুরুষগুলোর জীবন বড় হতে হতে যেন ক্রমশ রঙিন হয়ে ওঠে। আর নারীরা যতই রঙিন পোষাকে সজ্জিত থাকুক, তাদের জীবন হতে থাকে ফিকে, ম্যাঁড়ম্যাড়ে, দুঃখ ভারাক্রান্ত।

নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসছে মনে, কীভাবে..?? একজন নারীর জীবন বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এগুতে হয়। সব ধাপেই তাকে অনেক কিছু ফেলে ফেলে এগুতে হয়। যেমন,
ছোটবেলায় বাসার সবার আদরে আদরে বড় হওয়া মেয়েটি, স্কুলে যেতেই ক্রমশ বাসার আত্মীয়দের আদর কমতে থাকে, শাসন বাড়তে থাকে, স্কুলে বন্ধু তৈরি হতে থাকে মেয়েটির। সময়ের কালক্রমে, স্কুল এবং স্কুলের বন্ধুরাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে প্রিয়।

স্কুল এবং হাই স্কুলের গণ্ডি পেরোলেই, ছিটকে পড়ে সেসব বন্ধুরা। এক্ষেত্রে ছেলেরা বাড়ির অনুমতিক্রমে বন্ধুদের বাসায় আড্ডা দিতে যেতে পারে, কিন্তু মেয়ে.. তাই পারে না। তবে ফেসবুক সেক্ষেত্রে একপ্রকার সাহায্যকারী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেখানেও বাসার মানুষের বাঁধা, ভয় “ফেসবুকিং করতে করতে মেয়েটা না জানি কোন অসৎ চক্করে পড়ে যায়..” যদিও এই ভয় অমূলক নয় বা একেবারে হেসে উড়িয়ে দেবার মতো নয়।

যাহোক, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ইঁদুর বিড়াল দৌঁড়ের মধ্যে কমে আসে স্কুল, হাইস্কুল জীবনের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আবার নতুন বন্ধু আবার নতুন ব্যস্ততা, বিশ্বস্ততা, নতুনভাবে সব দেখা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়টা এমন একটা সময় মেয়েদের জীবনের যা অনেক সময় জীবনের গতি অনেকটা চৌরাস্তার মতো করে দেয়। সেখানে থেকে যে নারী সঠিক পথ বেছে নেয় তার জীবনটা কষ্টের ভারে ন্ব্যুজ হয় কম।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বেশিরভাগ মেয়ের একা পথ চলা শুরু হয়। মা বা অন্য কোন পাহারাদার হুট করেই এই সময় সময় থেকে আর সাথে থাকে না তাই মুক্তির স্বাধীনতায় ভুল করে ফেলে বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যে প্রেম মেয়েদের জীবনে আসে, সেই প্রেমে ভীষণ সিরিয়াস হয়ে পড়ে মেয়েরা, এই প্রেম খুব কমই বিয়েতে পরিণতি পায়, কারণ, সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছেলেটা বিয়ের জন্য প্রস্তুত না, তাই ভয় পায়, আর মেয়ের সেকেন্ড ইয়ার মানেই বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। তো, সেই প্রেমের সফলতা বা ব্যর্থতার বেশিরভাগ শেয়ারিং হয় বন্ধুদের সাথে। অনেক সময় তো এই শেয়ারিংয়ের বন্ধুই দেহ ও মনের নিকটতম আত্মার আত্মীয় হয়ে যায়। এই সম্পর্কের ব্রেকআপ অধিকাংশ নারীই সামলে উঠতে পারে না। পরিণতি, বাবা মা’র পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে অথবা নিজেই ধুম করে ভুল মানুষকে ভালবেসে বিয়ে করে ফেলা।

বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ। শ্বশুরবাড়ি, নতুন জায়গা, সব নতুন মানুষ। এখানে সবাইকে বুঝে উঠতে সময় তো লাগেই। বন্ধু ভাবতেও ভয় লাগে। কেননা যতোই ভালবাসুক সবই বউয়ের বা ভাবীর চেয়ে, ছেলে বা ভাই তাদের আপন বেশি। সুতরাং যতোই বলি না কেন, হয় না, শ্বশুরকুলের কেউ বন্ধু হয় না।

বিয়ের পর একাকি মানসিক যুদ্ধের এই সময়টা খুব চ্যালেঞ্জিং সময় মেয়েদের। সবসময়ের আশ্রয়দাতা, বিপদের ত্রাণকর্তা, স্নেহময়ী মা, আত্মীয়-স্বজন, সহপাঠী সবার কাছ থেকে দুঃখ লুকিয়ে রাখায় পারদর্শী হয় মূলতঃ এই সময়টাই।
“খুব ভালো আছি.. সুখে আছি ভীষণ..” এটা বোঝানোতে সদা সতর্ক থাকাতেই যেন একজন নারীর সবচেয়ে বড় গুণ বা যোগ্যতা।
লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের পানি ফেলা, দমবন্ধ হয়ে আসা অবস্থায় বাথরুমে পানির কল ছেড়ে কান্না করে চোখ মুখ ধুয়ে বের হয়ে আসা শিক্ষিত মেয়েটিকে যখন অশিক্ষিত বলে ট্রিট করা হয়, ঠোঁটের কোণে করুণ হাসি আসা সত্ত্বেও মেনে নিতে হয়।

অদ্ভুত জীবন। ভয় পাওয়া জীবন। কারো সাথে শেয়ার করতে না পারার জীবন। “স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির মানুষ জেনে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে”- এই ভেবে ভীতুর জীবন।
চক্রাকারে, এই জীবনের আর পরিবর্তন আসে না। সংসার-সন্তান-স্বজনের চাপে নারীদের কেবলই দীর্ঘশ্বাসের জীবন। সন্তান বড় হয়ে নিজ নিজ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারপর..??? একা, একদম একা।

এতো হতাশার কিছু নেই, নিজেকে নিজে সময় না দিলে কেউ এসে সময় উপহার দিবে না। সবকিছুর মধ্যেও তাই নিজেকে ভালবাসতে জানতে হবে, নিজেকে সময় দিতে হবে, মুখ ফোটে নিজের মনের কথা বলতে জানতে হবে, পছন্দ অপছন্দ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে, যা মন চাই তাই লিখতে হবে, সময় করে ভাললাগার বই পড়তে হবে, পছন্দসই সিনেমা দেখতে হবে। আপনার চেয়ে বড় কেউ নয়; এটা বিশ্বাস করতে হবে। নিজেকে সম্মান করলে দেখবেন অন্যেও আপনাকে সম্মান করতে বাধ্য। বন্ধুর পথে ভয় না পেয়ে নিজেকে বন্ধু ভেবে এগিয়ে যান, আত্মতৃপ্তি সেখানেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.6K
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.