মেনোপজ ক্রাইসিস: আগে-পরের দুটি কথা

0

ডা. ফাহমিদা নীলা:

স্বাস্থ্য বিষয়ক কিছু লিখলেই যে বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য আমার কাছে সবচেয়ে বেশি অনুরোধ আসে তা হলো, মেনোপজ। অনেকদিন থেকেই ভাবছি এটা নিয়ে দু’কলম লিখবো। নানান কারণে হয়ে উঠছিল না। আজ নারী দিবসের প্রাক্কালে ভাবলাম, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লেখাই হোক এবারের নারী দিবসে আমার পক্ষ থেকে সকল নারীর জন্য উপহার।

আসুন, সবার প্রথমে জেনে নিই, মেনোপজ আসলে কী? একটা নির্দিষ্ট বয়সে এসে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু মেনোপজ নয়। ওই বয়সে কমপক্ষে একটানা বারো মাস মাসিক পিরিয়ড বন্ধ থাকলে তবেই আমরা বলবো মেনোপজ।

এখন প্রশ্ন আসে, বয়সটা কত? এই বয়স কিন্তু সকলের জন্য এক না। কেন এক না? কারণ প্রতিটা মেয়েই নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। প্রতিটি মাসিক পর্বে (মেনেস্ট্রুয়াল সাইকেল) কিছু কিছু ডিম্বাণু নষ্ট হয়। এবং যার ডিম্বাণু যতো তাড়াতাড়ি শেষ হবে, তার মেনোপজ ততো তাড়াতাড়ি হবে। অর্থাৎ মেনোপজের সময় নির্ভর করে কার ডিম্বাশয়ে কত পরিমাণ ডিম্বাণু নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে তার উপর। যদিও মেনোপজের পরেও কারো কারো ডিম্বাশয়ে কিছু ডিম্বাণু পাওয়া যায়, কিন্তু কার্যতঃ এরা অকার্যকর থাকে। সাধারণতঃ পঁয়তাল্লিশ থেকে শুরু করে পঞ্চাশ-একান্ন বছরের মধ্যেই মেনোপজ হয়। তবে এটা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। ডিম্বাণুর পরিমাণ ছাড়াও আরো কিছু ফ্যাক্টর মেনোপজকে ত্বরান্বিত করে। যেমন, ধূমপান, বন্ধ্যাত্ব, বন্ধ্যাত্বকরণ, ডিম্বাশয়ের কোন অস্ত্রোপচার, ক্যান্সার থেরাপি, জেনেটিক বা জাতিগত ফ্যাক্টর ইত্যাদি।

এবার আসুন, মেনোপজ নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্নতার কারণ কী? আসলে একজন নারী চল্লিশ বছর বয়স পার করার পর থেকেই মেনোপজ আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেন। যার প্রভাব পড়ে তার শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সামাজিক জীবনে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা যারা নারী রোগী নিয়ে কাজ করি, তাদের কাছে মেনোপজ এবং এর আগে-পিছের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইদানীং এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আলাদা একটা সোসাইটি পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে।

কী হয় এই সময়? এই আলোচনায় যাওয়ার পূর্বেই জেনে নেয়া দরকার, এই সময়টা আসলে শুরু হয় কখন? অর্থাৎ ঠিক কোন সময় থেকে একজন নারী তার শরীর এবং মনে মেনোপজের লক্ষণ খেয়াল করতে শুরু করেন। ব্যাপারটা কি জানেন, অনেক নারীই এই লক্ষণগুলো টের পেলেও কারণটা চিহ্নিত করতে পারেন না। ফলে জটিলতা হয় আরও জটিল। সাধারণতঃ একজন নারীর মেনোপজ শুরু হওয়ার দুই বছর পূর্ব থেকেই মেনোপজের লক্ষণ দেখা দেয়া শুরু করে। এবং মেনোপজ এস্টাবলিশড হওয়ার পরে পাঁচ বছর পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব থাকতে পারে। এই সময়টাকে আমরা পেরিমেনোপজাল এজ বলি। এই সময়টাও ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।

জেনে নিই, কী সেই লক্ষণসমূহ? পিরিয়ডের স্বাভাবিক নিয়ম পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্যান্য যে সকল লক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো সম্পর্কে একটু সংক্ষিপ্ত আকারে বলি।

প্রথমত: হট ফ্লাশ বা শরীরে হঠাৎ গরমভাব অনুভূত হওয়া। শীত, বর্ষা বা গরম যে কালই হোক না কেন, নারী এই সময় হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড গরম অনুভব করেন। সারা গা ঘেমে উঠে। মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠে অতিরিক্ত গরমে।

দ্বিতীয়ত: যোনিপথে শুষ্কতা অনুভব করা। যা অনেক সময় তার স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কে প্রভাব ফেলে।

তৃতীয়ত: যৌন চাহিদা কমে যাওয়া। যেটার কারণে জীবনসঙ্গীর সাথে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, বা দূরত্ব তৈরি হয়।

চতুর্থত: ঘুমে ব্যাঘাত। এই সময়কালে প্রায় সকল নারী ঘুম নিয়ে খুব ঝামেলায় পড়েন। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে দারুণভাবে।

পঞ্চমত: মুড সুইং বা আচরণগত অস্থিতিশীলতা। আমার মনে হয়, এটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, যা কিনা একজন নারীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। এই সময়কালে নারী খুবই ক্রিটিক্যাল অবস্থা পার করেন। হরমোনের প্রভাব ছাড়াও উপরিউক্ত প্রতিটি লক্ষণই তার আচরণের উপরে প্রভাব ফেলে। এগুলো একটা আরেকটার সাথে সংযোগ স্থাপন করে সমস্যা আরো জটিল করে তোলে।

এছাড়া মেনোপজের লক্ষণের যেকোনো একটা দেখা দেয়ার সাথে সাথেই নারীর মেনোপজভীতি দেখা দেয়। ফলে অতিরিক্ত মানসিক চাপ তার লক্ষণসমূহ আরো প্রগাঢ় করে। অল্পতেই রেগে যাওয়া,অসহিষ্ণুতা, চিড়চিড়ে বা খিটখিটে মেজাজ, বিরক্তিভাব, খামাকা ভাল না লাগা অনুভূতি, অযথা কান্না পাওয়া, যখনতখন হতাশা অনুভূত হওয়া এইসবের যেকোনটি বা সবগুলোই অনুভূত হতে পারে মেনোপজের আগে-পরে।

হরমোন বিষয়ক ব্যাপারটা নিয়ে একটু বলি। ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন, এই দুই হরমোন নারীর প্রজননকাল নিয়ন্ত্রণ করে। মেনোপজের কাছাকাছি সময়ে এসে এই দুই হরমোনের ঘাটতি দেখা দেয়, যার ফলশ্রুতিতে সকল লক্ষণ প্রকাশ পায় একের পর এক। শরীর হরমোন পতনের এই পুরো ব্যাপারটা মানিয়ে নিতে সময় নেয়। এই মানিয়ে নিতে না পারা থেকেই মূলতঃ শারীরিক ও মানসিক সমস্যার উৎপত্তি। এছাড়া শারীরিক সমস্যা আরো জটিল হয় পারিবারিক কারণে, যার মূল কারণ হলো, পরিবারের বাকী সদস্যগণের সমস্যা চিহ্নিত করতে না পারা।

কী করবেন? কীভাবে পাড়ি দিবেন এই ক্রান্তিকাল?

প্রথম কথা, মেনে নিন, মানিয়ে নিন। বয়ঃসন্ধি হওয়ার পূর্বেও তো আপনার একটা জীবন ছিল। ছিল না? আপনি সে সময়টা কি খারাপ ছিলেন? বরং ওই সময়টা স্বাভাবিকভাবেই আপনি উপভোগ করেছেন নিজের মতো। মেনোপজের এই সময়টাও আপনার জীবনেরই অংশ। কাজেই এটাকে আপনি এখনকার মতো করেই উপভোগ করুন। স্ট্রেসকে দূরে রাখুন। নিজের পছন্দের কাজ করুন, ঘুরে বেড়ান, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিন। যা আপনার মন ভালো করে, তাই করুন। আপনার জীবনসঙ্গীকে বুঝিয়ে বলুন। যৌনজীবন উপভোগ করতে চাইলে কিছু অলটারনেট ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারেন আপনার গাইনী কনসালট্যান্টের সাথে আলোচনা করে।

দ্বিতীয় কথা, রিলাক্স থাকার জন্য কিছু উপায় বের করে নিন। এরোবিক এক্সারসাইজ করতে পারেন। ইয়োগা করুন, মেডিটেশন করুন, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম করুন, যা আপনার ভেতরে ফুরফুরা অনুভূতি তৈরি করবে। ঠাণ্ডা পরিবেশ রাখুন চারপাশে। নিয়মিত গোসল করুন ঠাণ্ডা পানি দিয়ে। মুড ঠাণ্ডা রাখার জন্য গান বা বইয়ের আশ্রয় নিতে পারেন। ধর্মীয় উপাসনাও রিলাক্স থাকার অন্যতম উপায়।

তৃতীয় কথা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান। খাবারের তালিকায় জাঙ্ক ফুড, তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিয়ে প্রচুর শাক-সবজি এবং পানীয় যোগ করুন। ধূমপান বা অন্য কোনো নেশা থাকলে যথাশীঘ্র ত্যাগ করুন।

চতুর্থত: নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাবেন। মেনোপজের পরে কিছু সিরিয়াস শারীরিক সমস্যা হতে পারে। যেমন, হার্ট বা ব্রেনের প্রবলেম। সুতরাং এই বিষয়ে সাবধান থাকাই উত্তম।

সবশেষ উপদেশটি নারীর জন্য নয়। নারীর সারাজীবনের পুরুষ সঙ্গীর জন্য। ভাই, আপনার স্ত্রী জীবনের একটা জটিল সময় পার করছে। তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। তাকে সামলিয়ে নেয়ার সময় দিন। আপনার অসহিষ্ণুতা তার আচরণগত সমস্যা আরো জটিল করে তুলবে। সে আরো বেশি হতাশাগ্রস্ত হবে এই ভেবে যে,সে আর আপনার চাহিদাপূরণে সক্ষম নন। ভালোবাসার অনিশ্চয়তায় সে প্রতিনিয়ত আরো হতাশাজনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে। তার মানসিক জটিলতার এই অদ্ভুতুড়ে জটিল সময়ে আপনি তার পাশে থাকুন ভালোবাসা নিয়ে। আপনার আন্তরিক সাপোর্ট তার ক্রাইসিস কাটিয়ে উঠতে পজেটিভাবে সাহায্য করবে।

শেষ করছি একটা কথা দিয়ে, নারীর শরীর পৃথিবীর এক রহস্যময় জগৎ। এর সবটা বোধগম্য হওয়া সহজ ব্যাপার নয়। বিধাতার এক অপূর্ব সৃষ্টি এই নারী। সুতরাং, আপনার নারীত্বের প্রতিটি ইভেন্টকে জানুন, বুঝুন এবং উপভোগ করুন। জীবন মানেই ব্যালেন্স করে চলা। নারীত্বের সবটাও ব্যালেন্স করে নিয়েই চলতে শিখুন।

ভাল থাকুন পৃথিবীর সকল নারী সকল অবস্থায়, সকল পরিস্থিতিতে।
০৮/০৩/২০১৯ ইং

শেয়ার করুন:
  • 1.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.5K
    Shares

লেখাটি ৫,৮২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.