সশ্রদ্ধ প্রণতি সেই নারীকে, যার গর্ভে পৃথিবী প্রাণময়!

0

মনজুরুল হক:

প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে নানা মতের শেষে মোটামুটি ধরে নেয়া হয় ‘পুরাজীবীয় অধিযুগ’ (Paleozoic) থেকে। যার শুরু আজ থেকে ‘মাত্র’ ৬০.৫ কোটি বছর আগে। ৬০.৫ কোটিকে মাত্র বলা হচ্ছে এ কারণে যে পৃথিবীর বয়স প্রায় ৫০০ কোটি বছর ধরা হলেও মহাকালের নির্ধারিত কোনো বয়স নেই। এরপর ১৫-২০ কোটি বছর ধরে বিভিন্ন যুগ পার হয়েছে।

এই ৬০.৫ কোটি বছর আগে মেরুদণ্ডি প্রাণি না থাকলেও সরীসৃপ, কিছু কিছু মাছ বংশ বিস্তার করেছে। এরপর ট্রায়োসিক, যুরাসিক, ক্রিটাশুস যুগও পার করে প্লাইস্টোসিন বা হোমো স্যাপিয়েন্সদের যুগ শুরু হয়েছে যার মাত্র ১০ লক্ষ বছর আগে। সেই যুগে প্রথম যে প্রাণিটি তার শরীরের ভেতর আর একটি শরীর বড় করে এক সময় প্রসব করে, সেই প্রাণিটি একজন নারী। একজন মা। আজকের পৃথিবীর প্রায় ৭-শ’ কোটি মানুষের আদি মা! সেই নারীটি যে প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গর্ভধারণ করতে সক্ষম হয়েছে, তাকেই আমরা জন্ম বলি। কোনো কারণে সেই নারীটি গর্ভধারণ না করলে আজকের পৃথিবী অন্য কোনো প্রাইমেটে পূর্ণ থাকতো। আজকে পৃথিবীতে যতো নারী আছে তারা কোনো কারণে একসঙ্গে মারা গেলে ৬০/৭০ বছর পর পৃথিবী মানবশূণ্য হয়ে যাবে!

আজকে বিশ্ব নারী দিবসে সশ্রদ্ধ প্রণতি সেই আদিম নারীকে, যার গর্ভে আরও একটি মানব প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিল। পৃথিবীতে মানুষের আবাদ শুরু হয়েছিল। পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, কাঠামো-অবকাঠামো, মারণাস্ত্র, সুখ-সমৃদ্ধি, জীবন-মরণ, প্রেম-ভালোবাসা, কামনা-বাসনা, পূর্ণতা-অপূর্ণতা, সৃষ্টি-বিনাশ, ধ্বংস-নির্মাণ সবই ওই এক জোড়া নারী-পুরুষ থেকে। যেখানে নতুন প্রাণের ধারক ওই নারী।

মাতৃতান্ত্রিক আদিম সাম্যবাদী সমাজে পর্যন্ত নারীর ক্ষমতায়ন টিকে ছিল। শক্তি-সামর্থ্যে খানিকটা এগিয়ে থাকা প্রাইমেট হিসেবে পুরুষ সেই আধিপত্য বেশিদিন মেনে নেয়নি। এর পরেই শুরু হয়েছে পুরুষের আধিপত্যের যুগ। সেই থেকে আজ অব্দি পুরুষই এই বিশ্ব শাসন করে চলেছে। সেই সঙ্গে শাসন করেছে নারীকে। শাসন করেছে আর দু’দশটা পণ্য কিংবা অধিকাররূপে। পুরুষালী অধিকার থেকে। শেষ বিচারে ক্ষমতার দম্ভ থেকে।

বিভিন্ন ধর্মে ফলাও করে নারীর মর্যাদার প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এবং তাকে (নারীকে) মর্যাদা দেবার নসিহত করা হয়েছে। দ্বান্দ্বিক নিয়ম অনুয়ায়ী ‘মর্যাদা’ দিতে চাওয়ার অর্থ মর্যাদা নেই। অন্যভাবে ‘মর্যাদা দিতে হবে’ বলার অর্থ মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়েছে। আজকের বিশ্বে কোনো ধর্মে, জাতিতে, সম্প্রদায়ে, শ্রেণিতে, বিশ্বাসে, রূপকে, কল্পনায়, অধিবিদ্যায় নারী ক্ষমতাসীন নয়। এই পুরুষতান্ত্রিকতাকে পুরুষই যুৎসই কিছু নাম-টামও দিয়ে রেখেছে। যার একটি- নারীবাদ। নারীবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার আদিখ্যেতা দেখিয়েই তারা নারীকে কমোডিটিজ হিসেবে শোষণ করে। জাস্ট আ সেলেবল কমোডিটিজ। সেই কমোডিটিজ পারচেজ করার কারেন্সির নাম কোথাও বিয়ে, কোথাও ম্যারিজ, কোথাও লিভটুগেদার, কোথাও কেপ্ট, কোথাও পত্নি-উপপত্নি কিংবা রাখেওয়াল!

এরই মধ্যে যুগে যুগে জোয়ান অব আর্ক, হেলেন কেলার, রোজা লুক্সেমবার্গ, মারিয়া ভ্যান ডিপার্ট, নাদেজদা ক্রুপস্কায়া, উ চিয়াং, আনা ফ্র্যাঙ্ক, লায়লা খালেদ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ইলা মিত্র, বেলা দত্ত, বেগম রোকেয়া, রাবেয়া বেলীদের জন্ম হয়, তারা লড়াই করে। লড়তে লড়তে প্রাণ বিসর্জন দেয়। সেই সঙ্গে অজস্র পুরুষও নারীর অধিকার নিয়ে, মর্যাদা নিয়ে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করে। তারপরও নারীর অধিকার আসেনি। আসেনি ন্যুনতম মর্যাদা।

এই অঞ্চলে ভূগঠনের আর আর্থ-সামাজিক কারণেই বাংলা ভাষায় কবি-সাহিত্যিক ঝাঁকে ঝাঁকে জন্মে। তারাও বড় আহ্লাদ করে নারীর মুক্তি নিয়ে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ লেখেন। কিন্তু কেউ প্রশ্ন তোলেন না নারীকে পরাধীন করেছে কে? কারা তাদের মানুষের ন্যুনতম মর্যাদা দেয়নি? কোন অধিকারে দেয়নি? বরং এই নোংরা ক্লেদযুক্ত সমাজে বিস্ময়কর ‘সৃজনশীলতারূপে’ প্রচলিত রয়েছে জঘন্য জঘন্য সব প্রবাদ আর আপ্তবাক্য, যার প্রায় সবই নারীকে সম্ভোগ করার নানাবিধ বাসনা, পদ্ধতি এবং উপায় কেন্ত্র করে রচিত। সে সব এখানে কদাকার শোনাবে। সেই সব কিছুর মধ্যেই নারীকে ‘বিদ্ধ’ করার সুতীব্র বাসনা। আর সেই বাসনা এতোটাই জনপ্রিয় যে জন্মদাত্রী মায়ের সামনেও অবলীলায় বলা চলে! নির্বিকারভাবে বলা চলে- অমুক দল তমুক দলরে ৩ গোল ‘ভইরা’ দিছে। এই তথাকথিত সভ্য সমাজে নারীর গোপনাঙ্গে এমন কোনো বস্তু নাই যে বাঙালি স্টুপিড পুরুষ প্রবিষ্ট করায়নি। এবং এই সংস্কৃতি সমাজের এতোটাই গভীরে যে নারীও অবলীলায় আর এক নারীকে এইসব কুৎসিৎ কদাকার মর্ষকামী গালাগাল দিয়ে অভ্যস্ত।

তাহলে নারীর মুক্তি কীভাবে? কে সেই মুক্তি আনবে? কার কাছ থেকে? আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে যেখানে নারী স্রেফ অন্য আর দশটি ব্রান্ডেড টপসেলার কমোডিটিজের একটি ছাড়া অন্য কিছু নয়, সেখানে সামগ্রিক পুরুষশাসিত সমাজ-দেশ থেকে নারীর মুক্ত কীভাবে? এককভাবে সম্ভব নয়। যে যতভাবেই চেষ্টা করুক না কেন, শুধুমাত্র নারীর মুক্তি এই যুগে এক সোনার পাথর বাটি। এই মুক্তি আসতে পারে একমাত্র মানুষের মুক্তি থেকে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙ্গে প্রথমে নয়া গণতান্ত্রিক, পরে সমাজতান্ত্রিক এবং সর্বশেষ শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণ করেই সম্ভব নারীর তথা মানুষের মুক্তি। সামগ্রিকভাবে যা মানুষেরই মুক্তি।

৮ মার্চ, ২০১৯

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares

লেখাটি ২২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.