আমার যুদ্ধের জেনারেল আমি নিজেই

0

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

আমেরিকাতে এক সময় জন্ম নিয়েছিল ব্ল্যাক ফেমিনিজম, যেখানে কালো নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়েছিল। ইতিহাসের শুরুতে ফেমিনজম কথা বলতো শুধু সাদা নারীদের অধিকার নিয়ে। কালো, সুবিধাবঞ্চিত এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে কথা বলার কেউ ছিল না। কারণ, কালো নারীরা একাধারে নারী, কালো, এবং অনেকক্ষেত্রেই অর্থনৈতিকভাবে সাদাদের থেকে পিছিয়ে। সাদাদের পক্ষে ঐ কালো নারীদের জীবন যুদ্ধ অনুভব করা ছিল প্রায় অসম্ভব।

আরেকটি বড় বাধা ছিল বর্ণবাদ। তাই কালো নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে এগিয়ে এসেছিল কালো নারীরা নিজেই।
বাংলাদেশে ফেমিনিজমের জন্ম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের হাত ধরে। যদিও সেটাকে তখন নারীবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়নি। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যায় সেটাই ছিল বাংলায় নারীবাদের সূত্রপাত।

সাবরিনা স. সেঁজুতি

বেগম রোকেয়া ছিলেন সম্ভ্রান্ত-শিক্ষিত পরিবারের কন্যা। তিনি নিজের জীবন অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন নারীশিক্ষাই নারীমুক্তির একমাত্র উপায়। তাই তিনি তার পুরো জীবন নারীশিক্ষার নামে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর লেখনি এবং জীবন আদর্শ নিঃসন্দেহে বাংলার নারীদের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছে। নারীরাও যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাবার অধিকার রাখে, সে কথা বেগম রোকেয়াই সর্বপ্রথম এ সমাজে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।

বেগম রোকেয়ার পর বাংলায় শুধু নারীশিক্ষা নয়, পাশাপাশি নারীর অন্যান্য অধিকার, দেশের নানাবিধ সামাজিক অসামঞ্জস্যতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন অনেকেই, এখনো বলছেন। তবু নারী মুক্তি অর্জিত হয়নি। কখনো কখনো হতাশ হয়ে ভাবি, “বেগম রোকেয়া যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, এখনো সেখানেই পড়ে আছে কিনা কে জানে!”

বাংলাদেশে নারীশিক্ষার গুণগত মান কতটা বেড়েছে তা আলোচনা সাপেক্ষ। তবে সংখ্যাগত মান যে বেড়েছে তা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি এ কথাও সত্যি যে, নারী শিক্ষা নিশ্চিতভাবেই নারী স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারেনি। কারণ অন্য অনেক কিছুর মতোই নারী শিক্ষাও নারীর অলংকার হয়ে গেছে, অহংকার নয়।

পিতা-মাতা মেয়েকে নামিদামি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন, নারী শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নয়, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিয়ের বাজারে মেয়ের দাম বাড়াতে। নারীর ডিগ্রী কেবল পাত্র ধরা পর্যন্তই। চাকুরীর বাজারে তা কেবল সৌখিনতা। সৌখিনতা বলছি কারণ, অনেক পরিবারে এখনো নারীর চাকুরি সামাজিক মর্যাদা আর বউয়ের হাত খরচের বাহানা মাত্র। বহু নারীর উপার্জিত অর্থ শুধু ঠোঁট পালিশ আর গাল পালিশে শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করে এই সমাজ। নারীর উপার্জিত অর্থ যে কর্তব্য পালনেও কাজে আসতে পারে, সেটা সম্পূর্ন অবিবেচ্য, অনেকক্ষেত্রেই লজ্জার।

নারীর খরচে সংসার চলছে মানে তার পুরুষটি কিংবা পিতাটি অক্ষম। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ হলো টাকার মেশিন আর নারী হলো সন্তান উৎপাদনের মেশিন। এর ব্যতিক্রম দেখতে এখনো আমাদের সমাজ তৈরি নয়। ক্যাপিটালিস্ট সমাজ শিখিয়েছে টাকা যার হাতে সেই ক্ষমতাধর। পুরুষতান্ত্রিক ক্যাপিটালিস্ট সমাজে ক্ষমতাধর হবে পুরুষ। সেই ভূমিকায় নারীকে দেখা গেলে সে ডাইনি অথবা বেশ্যা।

আমেরিকার সাদা নারীরা যেরূপ কালো নারীদের জীবন সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, তেমনি আমার দেশের সিংহভাগ নারীজীবনের গল্প আজো পর্দার আড়ালে। তাই কে ডাইনি আর কে বেশ্যা, তা সমাজ নির্ধারণ করে দেয়, নারী নয়।

পর্দার আড়াল থেকে চাইলেই আমি কিংবা আপনি টেনে হিঁচড়ে ঐ সকল নারীদের গল্পগুলো বের করে আনতে পারছি না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেরাই নিজেদের কথা না বলছেন। তাই তাদের হয়ে লড়াইটাও লড়ে দিতে পারছি না। তাদের লড়াইটা তাদেরকেই লড়তে হবে। কালো আমেরিকান নারীরা দেরিতে হলেও যেমন বুঝেছিলেন, সাদা নারীরা নয়, বরং তাদের যুদ্ধ তাদেরকেই লড়তে হবে,তেমনি আশা করতে পারি আমার দেশের নারীরাও একদিন বুঝবেন। কিন্তু কবে?

আমার দেশের নারীদের বোধবুদ্ধি ধীর বিকাশের আরেকটি বড় কারণ, ফেমিনিস্ট মুখোশধারী পুরুষতন্ত্রের গুপ্তচর বাজারে নেমেছে অনেকদিন। তাদের থেকে সাবধান থাকাটা জরুরি।

কীভাবে চিনবেন তাদের?

“আমি ফেমিনিস্ট”-সচারাচর প্রকাশ্যেই একথা বলেন তারা। স্বামী কিংবা পিতার অর্থ ও ক্ষমতার মোড়কে আপাদমস্তক আবৃত। খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করলে হয়তো কোন একদিন চোখে পড়তে পারে- ঘরে ফিরেই, লোকচক্ষুর আড়ালে, ফেমিনিস্টের খ্যাতায় আগুন দিয়ে, “বুয়া, তুমি আবার বাচ্চা নিয়েছো? পেটে বাচ্চা আছে বলে সারাদিন ঝিমাবে? আমি তো বাচ্চা পেটে নিয়ে পাহাড়ে চড়েছি, ঝিমাই নাই, যাও যাও বিদায় হও” টাইপের ভাষণে ঘর গরম করছেন। তখন বুঝবেন এরাই গুপ্তচর। এদের থেকে দূরে থাকুন।

আপনি ভাবছেন, ফেমিনিস্ট মানে তো এমনই। সাত মাসের বাচ্চা পেটে নিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় চড়বে। ঝাঁসীর রানীর মতো পিঠে বাচ্চা বেঁধে যুদ্ধে যাবে। সত্যিকারের ফেমিনিস্ট দুর্বল নারীদের ঘৃণা করবে, সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?
না, স্বাভাবিক নয়। পেশিবল দেখানোর নাম নারীবাদ নয়। পেশিবল-অর্থবল-ক্ষমতাবল দেখাচ্ছে মানেই সে ক্যাপিটালিস্ট-পুরুষতন্ত্রের দালাল। তাদের এড়িয়ে চলুন। আর যতো পারুন নিজের গল্প নিজে বলুন। মনে রাখবেন আজকে আপনার লজ্জার গল্প, আগামীর ভবিষ্যত, সমাজ পরিবর্তনের সূত্রপাত।

ইতিহাস প্রমাণ-একই দেশে থেকে বর্ণ পার্থক্যের কারণে আমেরিকাতে যদি কালো নারীদের ভিন্ন আন্দোলনে নামতে হয়, বাংলাদেশে হয়তো এরকম অনেকগুলো ছোট ছোট আন্দোলনের পরেই নারীমুক্তি মিলবে। তাই আপনার গল্পটি আপনাকেই বলতে হবে, আপনার যুদ্ধের রচয়িতাও হবেন আপনি। অন্য কেউ নয়।

শেয়ার করুন:
  • 126
  •  
  •  
  •  
  •  
    126
    Shares

লেখাটি ৪৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.