‘ব্যালান্স ফর বেটার’ এবং নারী দিবস

0

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা ১৮৫৭ সালের ৮ ই মার্চ মজুরি বৈষম্য, দৈনিক কর্মঘণ্টা ও কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছিল, সেদিনও সরকারি লেঠেল বাহিনী নারীদের সেই মিছিলে চালিয়েছিল নির্যাতন। পরবর্তীকালে এই দিনটি স্মরণে রেখে ১৯১১ সাল থেকে প্রতিবছর ৮ ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। যার মূল উদ্দেশ্যই সমাজে নারী-পুরুষের মাঝে বিদ্যমান বৈষম্য কমিয়ে আনা।
নারী শ্রমিকের হাত ধরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সময়ের সাথে সাথে আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে নারী অধিকারের ভিন্নতা ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দিবসের কলেবর, তাৎপর্য এবং গুরুত্ব দিনে দিনে বৃদ্ধিই পায়নি কেবল সমাদৃতও হয়েছে।

২০১৯ এ এসে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আয়োজকেরা গ্লোবাল ক্যাম্পেইন ২০১৯ নামে বছরব্যাপী এক বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করেছেন; অর্থাৎ এই দিবস অধিক গুরুত্ববহ হয়ে দেখা দিয়েছে আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়!

সঙ্গীতা ইয়াসমিন

বলা বাহুল্য, সময়ের ঘড়িতে একশ আট বছর পেরিয়ে গেলেও সমাজে নারী-পুরুষের সমতা আনয়নে, সাম্যতার ভিত্তিতে সমাজ নির্মাণে এখনও আমরা সেই একই কেন্দ্রে ঘুরপাক খাচ্ছি, কিংবা কেন্দ্র থেকে খুব বেশি দূরেও পা ফেলতে পারিনি। আমাদের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ নারী দিবসকে সামনে রেখে এখনও আমরা সমতা উন্নয়নের কথাই বলে যাচ্ছি; আমরা সেই পুরোনো সুরই ভাঁজছি নানা ব্যঞ্জনায়।

সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন আসে এতোটা পথ পেরিয়ে তবে আমাদের অর্জন কী?

বাংলাদেশ যখন থেকে নারী দিবস উদযাপন শুরু করেছে, সেই হিসেবে খোলা চোখে দেখলে আমাদের অর্জন একেবারে অকিঞ্চিতকর নয়! একথা ভেবে আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতেই পারি, আজ আমাদের মেয়েরা ঘর ছেড়ে বাইরে কাজ করছে, শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতিসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে আপন মেধা ও মননের উৎকর্ষতা প্রমাণ সাপেক্ষে অবদান রাখছে দেশ, সমাজ তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। এইসাথে একথাও অসত্য নয় যে, নারীদের এই দীর্ঘ পথযাত্রায় আমাদের রাষ্ট্র, কিংবা সমাজের ঠিক কতখানি ইতিবাচক ভূমিকা ছিল সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাল্যবিবাহ আইন সংশোধন এবং নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন সংক্রান্ত বিষয়াবলীর দিকে দৃষ্টি দিলেই সেই ভূমিকা আরও সুস্পষ্ট হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক নারী দিবস গ্লোবাল ক্যাম্পেইন ২০১৯ এর থিম ‘balance for better, better the world” যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘ভালো’ কিছুর জন্য সমতা আনো, ‘ভালো’ রাখো পৃথিবীটাকে! এর সাথে সুর মিলিয়ে ইউএন উইমেন এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে -“Think equal, build smart, innovate for change”এবং বাংলাদেশ সরকারের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিপাদ্য -“সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো, নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো”। সবকটি থিমকে পাশাপাশি দাঁড় করালে একই সুর অনুরণিত হয়, অর্থাৎ প্রকৃত অর্থেই সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে এখন, একথাই বোঝা যায়।

তবে শঙ্কার কথা হলো, এ জাতীয় ক্যাম্পেইন কিংবা দিবস উদযাপনের যে সনাতনী প্রথা, তা কেবল নির্দিষ্ট সময়ান্তেই শেষ হয়ে যায়, ইটিং-সিটিং-মিটিং ছাড়া বস্তুত কোনো ফললাভ হয় না। দিবসকে ঘিরে বিশাল বাজেট, কর্মসূচি আয়োজন, গালভরা বক্তৃতা, সুন্দর মঞ্চসজ্জা; ব্যস, জাঁকজমকপূর্ণ একটি দিন কেটে গেলেই আমরা ভাবি এক বিশাল মহতী উদ্যোগের ইতিহাস রচিত হলো। পাশ্চাত্যের বা বিশ্বের অন্যান্য দেশের কথা জানা নেই, ব্যক্তিগত কাজের অভিজ্ঞতায় আমাদের দিবস উদযাপন বলতে এমনটাই বুঝি।

একই সাথে বিস্ময় ও আশার কথা এই যে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসকেন্দ্রিক এই গ্লোবাল ক্যাম্পেইনের অংশীজন হিসেবে রয়েছে নীতি-নির্ধারক, দাতা গোষ্ঠী এবং বিশ্বব্যাপী জায়ান্ট কর্পোরেট সংগঠনসমূহ। যারা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়ার প্রথম ও প্রধান সুবিধাভোগী। শিল্প বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন; অটোমেটেড সার্ভিসের ফলে সহজলভ্য এবং স্বল্পমূল্যে সেবাপ্রদানই এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য।
আর বলা বাহুল্য, প্রযুক্তিগত এই উন্নয়ন শ্রম বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। যার শুভ সূচনা ইতোমধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে; উন্নত বিশ্বের অনেক জায়ান্ট ইন্ডাস্ট্রিই তাঁদের বিশাল ব্যবস্থাপনার অপারেশন বন্ধ করে দিয়ে অনলাইন বিজনেস, বা ই-কমার্স চালু করেছেন।

৭০০ বিলিয়নের আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যেমন কাঙ্ক্ষিত, তেমনি এর দৌরাত্ম্য কীভাবে মানব উন্নয়নের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ হতে পারে যেখানে নারী-পুরুষের উদ্ভাবনী চিন্তার সম্মিলিত অংশগ্রহণে একটি সুন্দর সহাবস্থান হতে পারে আগামী পৃথিবীতে, সেকথা ভাবতে হবে উদ্যোক্তাদের, রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শাসকদের, নীতি-নির্ধারকদের, এবং অতি অবশ্যই এর সরাসরি উপকারভোগীদের, মানে কর্পোরেট জায়ান্টদের। পণ্য-সেবা সহজলভ্যকরণের পাশাপাশি অধিক সংখ্যক গ্রাহকও দরকার অধিক মুনাফার জন্য!

মুনাফাই যখন মূল লক্ষ্য, তখন বিশ্বে পুঁজির দৌরাত্ম্য যেমন বাড়বে, তেমনি শ্রেণী বৈষম্য হবে আরও প্রকট। শ্রম বাজার হবে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ! বাড়বে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান এবং সামাজিক অস্থিরতা! এমতাবস্থায়, অধিক জনসংখ্যার, স্বল্প পুঁজির, স্বল্প আয়তনের দেশে মানবিক উন্নয়ন, সহযোগিতা আর সহমর্মিতাপূর্ণ নারী-পুরুষের সহাবস্থান কেবল স্বপ্নে ইমারত নির্মাণই মনে হয়! যখন ধর্ষণের মতো একটি মারাত্মক ও জঘন্য অপরাধের শাস্তি প্রদান করতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন, সামজিক ঘৃণার উদ্রেক হয় না ধর্ষকের জন্য, বরং নানাবিধ সামাজিক চাপই দুর্বিষহ করে তোলে ধর্ষিতার জীবন! আর আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র থাকে নির্বিকার, সেখানে একটি ক্যাম্পেইন কীভাবে সমতার সমাজে উত্তীর্ণ হবার স্বপ্ন দেখাবে? এই প্রশ্ন সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে!

যেখানে খোদ পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই আজও ঠাণ্ডা লড়াই চলছে নারীদের বেতনকাঠামোয় বৈষম্য নিয়ে, এখনও সিঙ্গেল মাদারদের জীবন দুর্বিষহ সেই সমাজে, জরায়ুর স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ, টিন এজড গর্ভপাত অধিকার নয় প্রয়োজন; এমন সব সামাজিক বাস্তবতায় আমাদের মত দেশের নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থা ও অবস্থানের সমতা কতটা সহজপ্রাপ্য, আর কতটা সুদূর পরাহত, সেই প্রশ্ন অবান্তর নয় মোটেই। সভ্য সমাজের অনেক কিছুই যেমন সভ্যতার ঝা চকচকে মোড়কে থাকে আধো-আলোয় আবছায়া, তেমনি কিছু সত্য সূর্যালোকের মতোই, মেঘের আড়ালেও ঢেকে দেওয়া যায় না তার অস্তিত্ব!

তবুও আশার কথা এই যে, ক্যাম্পেইনের সকল অংশীজনই এই বিষয়টিতে একমত হয়েছেন যে, প্রযুক্তিগত বিপ্লবের ফলে আজকের পৃথিবীতে টিকে থাকতেই নারী-পুরুষের মেধা-শ্রম এবং উচ্চতর পেশাগত দক্ষতার সম্মিলন এখন সময়ের দাবি। মোট জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অঙ্ককে বাদ দিয়ে সামগ্রিক অর্থেই সুন্দর পৃথিবী গড়া অসম্ভব। সুতরাং ব্যালান্স আমাদের করতে হবে, এবং সেটা অনিবার্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেটি আমরা কোথায় করবো! রান্নাঘর, বসার ঘর, শোবার ঘরে কিংবা প্রক্ষালন কক্ষে, সেই বিবেচনাবোধ থাকুক আমাদের বিবেকের কাছে।

নারীর পুনরুৎপাদনমূলক ক্ষমতাকে যখন মনিটারি ফর্মে রূপান্তর সম্ভবই হয়নি, তখন নারীকে শুধুমাত্র সেক্স অব্জেক্ট না ভেবে পজেটিভ ডিস্ক্রিমিনেশন (সমতা আনয়নের লক্ষ্যে বাড়তি সুবিধা প্রদান) করে হলেও যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বি তৈরি করে উৎপাদনের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করানো বিশাল কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, সেটি করতে না পারলে অচিরেই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে আমাদের ভালোবাসার পৃথিবী!

বর্তমান বাংলাদেশে আইনের শাসনহীনতা, ন্যায়বিচারের অভাব এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ সংঘটন তথা প্রশ্রয় প্রদানের ফলে সুবিধাভোগীদের দাপটে চলছে যে নৈরাজ্য সেখানে দুর্বলদের প্রতিনিধি হিসেবে নারীই হচ্ছে সর্বাধিক ভিকটিম!রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জনসাধারণকে হিপ্নোটাইজড করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে যেখানে ধর্মের গুরুত্ব অবধারিত, সেখানে এই ফোর্থ জেনারেশনের শিল্প বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা ঢাল-তলোয়ারসহ মন-মননে কতটুকু প্রস্তুত সেই ভাবনাটাই ভাবা দরকার সর্বাগ্রে।

আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে কেবল একটাই আশঙ্কা, একবিংশ শতাব্দী আদতেই আমাদেরকে আরও অধিক সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে না তো! মানবীয়, ন্যায়পূর্ণ এবং সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণ আমাদের জন্য তবে সুদূর পরাহতই হয়ে রইল!
সুতরাং এখনই সময়, আসুন ডিজিটাল বাংলাদেশের সুন্দর আগামীর সাথে সকলে মিলেই একাট্টা হই নারীর উপরে করা সকল প্রকার জুলুম, জোর জবরদস্তি, আর নির্যাতনের প্রতিরোধে, নারীকে অধস্তন, কমজোরি, নালায়েক এবং প্রতিদ্বন্দ্বি না ভেবে সম্পূরক অংশীজন, কিংবা সহযোদ্ধা ভেবেই চলুন যুদ্ধে অবতীর্ণ হই!

ঘরের শত্রুর সাথে আঁতাত করে চলুন বহিঃশত্রুর মোকাবেলা করি! অন্যথায় নারীই কেবল পিছিয়ে পড়বে না, সময়ের দিনপঞ্জী থেকে পিছিয়ে পড়বে একটি বাংলাদেশ বিশ্বস্রোতের তালে তাল মেলাতে না পেরে!

টরন্টো, কানাডা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 185
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    185
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.