ভয়কে জয় করা কি সহজ?

0

আনন্দময়ী মজুমদার:

আট বছরের ছোটো ছেলেকে যত অভয় দিই, আর ঢেলে দিই গ্যালোন গ্যালোন আদর, ভালবাসা, সমঝোতা, তারপরও সে একা শুতে ভয় পায়।

অনেক কাউন্সেলিং, ব্রিদিন ব্রিদাউট, ভালো আর আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা ব্যবহার করেছি। সমস্যা মেটেনি। ভয়ের সঙ্গে চাপাচাপি চলে না। সর্বশেষ তাকে শিখিয়েছি, ভয়কে ছাদে গিয়ে বসে থাকতে বলো। বলো, আমার ঘুম পেয়েছে। আমি ঘুমাব। কিন্তু আমার বা দিদার বা কাছের একজনের উপস্থিতি ছাড়া ছেলে সেটুকু উদ্যম বাগাতে পারছে না।

আমরা ইস্কুল থেকে এসে পাঁচ বছর থেকে একা শুয়ে পড়ে ভালুকটা কাছে টেনে ঘুমাতাম। অঘোরে। এগারো দশ ঘন্টা পাক্কা। মাঝখানে কোন ওঠাউঠি নেই।

আট বছরে আমাদের দিন কেমন ছিল? আফ্রিকার কেমন যেন অচিনপুরে ১২ ঘন্টা ইস্কুলের রুটিনে বাইরেই থাকতে হতো। বাড়ি ফিরে খেলার সাথী ছিল বা ছিল না। প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতো সপ্তাহে এক বা দুই দিন। সেসব দিন আমাদের আলাদা করা যেত না।

আনন্দময়ী মজুমদার

একদিন শোনা গেল কমলা আন্টি মারা গেছেন। যে দিন মধ্যবয়েসী এই চমৎকার ছোটো করে ছাঁটা চুল, ফ্যাশনেবল এবং মার্জিত, ম্যাক্সি পরা, হাসিখুশি, সিঙ্গল, অমায়িক মানুষটিকে তাঁর বিছানায় মৃত পাওয়া গেল, সারা পাড়া জুড়ে গুঞ্জন শুরু। সকলে জমায়েত হলো আমাদের পাড়ায়। কয়েরি হাউজের সামনের মাঠ লোকে লোকারণ্য। বাঙালি, পাকিস্তানী, ভারতীয়, আরো দেশবিদেশের মানুষ।

সেটা ছিল মৃত্যুর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত, তাই আমি নানা অবুঝ আবেগে কাঁদছিলাম, আর আপাদমস্তক কাঁপছিলাম। তাঁর মৃত্যু অনেকের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি এই কথা শুনেই বোধহয়।

কিছুদিনের মধ্যে অবশ্য, আমাদের হালের সিনেমা দেখানো কমলা আন্টি, তাঁর চমৎকার আসবাব, তাঁর কাজু কিশমিশ মেশানো স্বাদু জলখাবার, তাঁর সিনেমা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া, আমাদের জোর সিনেমা-আড্ডার কথা, যথারীতি সবাই ভুলে গেল।

কমলা আন্টির নিচের তলার একলা থাকা ব্যানার্জি জ্যেঠুর জন্য মা মাঝেমাঝে পোস্ত, লাবড়া আর নানা জাতের রান্না তরকারি পাঠাতেন। ব্যানার্জি জ্যেঠু বয়েসে সিনিয়র, একা থাকতেন, মজার মজার গল্প করতেন, আমরা গেলে ঘুগনি (চটপটি) রান্না করে খাওয়াতেন, আর রাজনীতির আলোচনা করতেন। একবার তাঁর গলায় ‘আজ সবার রঙে রঙ মিশাতে হবে,’ শুনেছিলাম। আমাকে বেশ ভালবাসতেন। তাঁর হোমিওপ্যাথির বড়ি খেয়ে আমি প্রায় সেরে উঠতাম নাকি। তবে তাঁর বাড়ি বেড়াতে গেলে ইলাস্ট্রেটেড উইকলি থেকে বেছে বেছে ডেনিস দ্য মেনেস বা পীনাটসের কমিক স্ট্রিপ পড়া ছাড়া আমার আর কিছু করার থাকতো না। সে সব দিনে বাচ্চারা ‘বোর হচ্ছি’ বলে মা-বাবাকে গিয়ে বিরক্ত করতো না।

খড়কুটোর গাদা দিয়ে বাড়ি বানানো, কখনো মন থেকে তৈরি, ডিটেক্টিভ টুইন-এর নিজস্ব গল্প অভিনয় করে খেলা, বালখিল্য স্বভাবের আট বছর, নয় বছরের আমরা যখন বাড়ি ফিরেছি, মা হয়তো বললেন, লাবড়াটা ব্যানার্জি জ্যেঠুকে দিয়ে এসো তো।

সন্ধ্যে নেমে গেছে। বাইরে টিমটিমে বাতি আছে কী নেই। মইন আঙ্কেলদের বাড়ি আড়াল করে রাখা ঘন বাঁশবাগানের পাশ দিয়ে যেতে হতো ব্যানার্জি জ্যেঠুর বাড়ি। সেই বাঁশবাগান দিনের বেলায় যত ভালো, রাতের বেলা তত ভয়ের।

পেত্নি আর শাকচুন্নিদের শ্বাস ফেলার শব্দ আর শরশর বাঁশের গা ছমছমে অন্ধকারে খসখস পাতা পড়ার আওয়াজ।

আমি যাচ্ছি। ঘাড়ে কেউ এসে পড়লে পড়তেই পারে। কিন্তু আট বছরের যুক্তি মনে করছে, দেখি কী করে! আমি পালালে নিশ্চয়ই সে আরও জোরে ঝাঁপিয়ে পড়বে (কুকুর তাড়া করলে এরকম হয়)। তাই আমি ধীরে হাঁটি। এইভাবে গুটিগুটি হাজির হই ব্যানার্জি জ্যেঠুর বাসায়। ঠিক ওপরে কিছুদিন আগে কমলা আন্টির খালি ফ্ল্যাট একটা জলজ্যান্ত ভয়ের ছমছমে দরজা হয়ে দেখা দিয়েছে।
ওপরে তাকালে কী দেখা যাবে? ভয়ে ঘাড় নড়তে চায় না। তাই ঠিক সেইদিকেই চোখ পড়ে। যেন এক অদৃশ্য শক্তি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে বাধ্য করে। কমলা আন্টিকে দেখা যায় না। যেন এক ঘন্টা পরে ব্যানার্জি জ্যেঠু আমার কলিং বেল শোনেন আর ধীরমন্দ পায়ে এসে দরজা খোলেন। টুকিটাকি ভালোমন্দ প্রশ্ন করেন। হাসেন, আর তরকারির বাটি খালি করে ধুয়ে সেখানে ঘুগনি ঢেলে আমার হাতে দেন। আমি আবার ফিরি। সেই বাঁশ বাগানের ছমছমে খসখসে শরশরানির মধ্য দিয়ে। বাতাস বয় যেন ভুতের সুড়সুড়ির মতন।

এমন এক দিনে হয় না। কয়েক দিন। যেন অনেক দিন। এভাবে এক সময় ভয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তাকে পিঠে চাপড় মেরে বলা যায়, এবার আয়, অনেক কথা বলেছিস। যা, ঘরে যা, ভাগ!

ভয়কে জুজুর মতো ঘরের কোনায় পুষে রাখা মানুষ দেখতে পাই এখনো। বাঁধা কুকুরের মতো সে ভয়গুলো পোষ মানে না তাই তারস্বরে চেঁচায় আর জেদী হয়ে ওঠে। আট বছরের ভয় না শুধু। নানা বয়েসের। কিছু কিছু সময় ভয়রা মিলেমিশে থাকে। এক মন থেকে আরেক মনে বেড়াতে আসে। মাল্টিপ্লাই করে। কিন্তু এ অবস্থা বাঁশবাগানের চেয়ে বেশি ভুতুড়ে আর অবাস্তব মনে হয়।

সেদিন আমি ভেবে রেখেছিলাম, কমলা আন্টির চলে যাবার পরে ফাঁকা ফ্ল্যাটের দরজায় কমলা আন্টির মতো কাউকে দেখতে পেলে আমি কী বলতাম।

‘হ্যালো আন্টি। নাইস টু সী ইউ এগেন!’

তিনি কি দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে আসতেন? এক গাল হেসে জম্বির মতো চোখ বড় করতেন?

বুক দুরুদুরু করা গলা শুকিয়ে যাওয়া আমার আট বছরের মন বলছিল, না না, তিনি তো শান্ত মানুষ। আমাদের চকোলেট আর বাদাম দিতেন। তিনি আর কী করবেন? দূর!

ভয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে দেখি, সে বড়ো দুঃখী, আর গোবেচারা।

সে থাকবে আজীবন। কিন্তু তাকে সেই ছোট্ট থেকেই বলেছি, তোমাকে ড্রাইভিং সিটে বসতে দেবো না ভাই! তুমি ব্যাক সিটে গিয়ে বসো। আর কথা কম বলো।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    11
    Shares

লেখাটি ৮২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.