পুরুষনির্মিত আইনের কবলে একালের জোয়ান অব আর্করাও

0

মঞ্জুরুল হক:

শুভ জন্মদিন জোয়ান অব আর্ক।
১৪৪২ সালের এই দিনে (৬ জানুয়ারি) ফ্রান্সের মিউজ নদীর তীরে দঁরেমি গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই মহীয়সী নারী। আজ তার জন্মদিনে বিশ্বের এই প্রান্ত থেকে তেজদীপ্ত স্যালুট!

ইতিহাসের এক নির্মম ট্যুইস্ট। পুরুষশাসিত বিশ্বের অন্যতম প্রতিবাদ। পরাধীনতার শেকল ছেঁড়ার সুদক্ষ কারিগর। পরাধীন ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী বীরকন্যা।

ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে যে কয়জন সাহসী, যোদ্ধা, রাজনীতিবিদ এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে জোয়ান অব আর্ক ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিলেন পরাধীন ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী বীরকন্যা এবং রূপকথাতুল্য এক নেত্রী।

ইংরেজ শাসনাধীন ইংল্যান্ডের রাজপুত্র ষষ্ঠ হেনরি ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহন করলে ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লস পালিয়ে যান। মাত্র তের বছর বয়সে মাঠে ভেড়ার পাল চড়াবার সময় জোয়ান দৈববাণী শুনতে পান যে তাকে মাতৃভূমির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও ফ্রান্সের প্রকৃত রাজাকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে……।
এসবই ইতিহাসের সেই নির্মম ট্যুইস্ট।

অল্পদিন পর তারা ইংরেজ সৈন্যদের কবল থেকে তুরেলবুরুজ শহর উদ্ধার করেন। এরপর ১৬ জুলাই সপ্তম চার্লস ফ্রান্সের রাজা হিসেবে আবার সিংহাসনে অভিষিক্ত হন এবং জোয়ানকে তার অসামান্য সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য ফ্রান্সের রাজসভায় একটি বিশেষ সম্মানিত পদ দেয়া হয়।

জোয়ান শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁর মেধা, তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার বুদ্ধি আর বীরত্বের জন্য ফ্রান্স রাজসভার অন্যান্য পুরুষ সদস্যগণ তাকে মনে মনে হিংসা ও অপছন্দ করতে শুরু করলো। তারা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভয় পেয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো; কেননা রাজা সপ্তম চার্লস জোয়ানকে ভীষণ পছন্দ এবং বিশ্বাস করতেন। পরবর্তীতে জোয়ান ইংরেজদের সাথে এক ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত হলে রাজসভার সদস্যরা রাজাকে বোঝান যে জোয়ানের এই ধর্মযুদ্ধ রাজাকে ফরাসিদের কাছে ডেভিল (শয়তান)এ পরিণত করবে এবং এই ধর্মযুদ্ধ নাস্তিকতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তৎক্ষণাৎ রাজা জোয়ানকে ডেকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং ইংরেজদের সাথে সমঝোতায় আসতে বলেন। কিন্তু একরোখা এবং জেদী জোয়ান রাজার আদেশ অমান্য করেই যুদ্ধ চালিয়ে যান।

ফ্রান্স স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ইংরেজরা যখন জানতে পারে রাজার কথা অমান্য করে জোয়ান যুদ্ধ করছে, তখন রাজসভার অন্যান্য সদস্যদের সাথে হাত মিলিয়ে তারা জোয়ানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। কঁপিএন শহরের বহির্ভাগে শত্রু সৈন্যদের ওপর আক্রমণকালে ফ্রান্সের রাজনৈতিক দল বার্গেন্ডি-কর্মীদের বিশ্বাসঘাতকতার সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা জোয়ানকে আটক করে।

এক ইংরেজ পাদ্রির অধীনে তার বিচারকাজ চলে। বিচারে তার কার্যকলাপকে প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী আখ্যা দিয়ে তাকে ‘ডাইনি’ (Witch) সাব্যস্ত করা হয়। আইনে এর শাস্তির বিধান ছিল জীবন্ত পুড়িয়ে মারা। এই রায় অনুসারে জোয়ানকেও তাই ১৪৩১ খ্রিষ্টাব্দে ৩০ মে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।

এতোটা বছর পার হয়ে এসেও কি তথাকথিত সভ্য বিশ্ব শত শত ‘জোয়ান অব আর্ক’কে পুড়িয়ে মারছে না? ধর্ষণ করে মারছে না? পুরুষ শাসিত সমাজে, দেশে, পুরুষ নির্মিত আইন কি একালের জোয়ান অব আর্কদেরকে রক্ষা করছে?

শেয়ার করুন:
  • 137
  •  
  •  
  •  
  •  
    137
    Shares

লেখাটি ৪২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.