জমে থাকা ক্ষোভ ও আমার প্রতিবাদ

0

তারান্নুম মৃত্তিকা:

একটা মানুষ নিশ্চয়ই সারাজীবন সুখী থাকে না! একটা না একটা সময় আসে যখন সে খুব অসহায় হয়ে পড়ে। যখন একটা মানুষের সবচাইতে অসহায় লাগে, তখন সে কই যায়?

অন্যদেরটা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই, কিন্তু অসহায়ত্বের শেষ সীমায় পৌঁছলে আমি অন্য মানুষের সাহায্য কামনা বাদ দিয়ে নিজের কাছেই আসি। নিজেকে প্রশ্ন করি, এই অসহায়ত্বের কারণ কী? মেয়েদের জন্মের পর থেকেই কেন এমন বৈষম্য সহ্য করতে হয়? বিশেষ করে বয়ো:সন্ধিতে পা দেয়ার পরপর সমাজ থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত যেসব নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় সেগুলো অসহ্যকর লাগে, অসহ্যকর!

মাঝে মাঝে মনে হয় আমার জন্মের সময় মায়ের গর্ভধারণের যেই জটিলতায় আমার মারা যাওয়ার কথা ছিল, মারা গেলেই পারতাম। এই কুৎসিত পৃথিবী না দেখলেও হতো। অথবা মেয়ে না হয়ে ছেলে হয়ে জন্মালে হয়তো এই বৈষম্যগুলোর মুখোমুখি হতে হতো না। আমার সাথে হয়তো কেউ কোনো অন্যায্য আচরণ করার সুযোগ পেত না। আর পেলেও আমি নিজেই প্রতিবাদ করতাম আর সবাই সেটা গুরুত্ব সহকারে নিতো।
আমি হয়তো সমাজের অসহ্য পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে দূরে কোথাও একা একা গিয়ে ‘হাওয়া বদল’ করতাম। অথবা পালিয়ে যেতাম। আমার যে হুটহাট পালিয়ে যাওয়ার কথা মনে হয় না, তা না। কিন্তু ওই ব্যাপারটা শুধু মনে হওয়া পর্যন্তই। বাস্তবে সাহস পাবো না এই ভেবে পালানোর সময় রাস্তায় কী সব ভয়াবহ বিপদে পড়বো এই ভেবে। এভারেস্ট জয়ী বাংলাদেশি নারী ওয়াসফিয়া নাজরিন তো নিজেই বলেছেন, পাহাড়ে ওঠার চেয়ে ঢাকার রাস্তায় একটা মেয়ের হাঁটা অনেক কষ্টের।

খুব ছোট থাকতে একবার আমার মা, আমি আর এক চাচাতো বোন মিলে এক শপিং সেন্টারে গেলাম। আম্মু তার কেনাকাটার কাজ সারছিল, সেই ফাঁকে আমরা দুইবোন পাশের এক রেস্টুরেন্ট আইসক্রিম খেতে গেলাম। আমরা আমাদের মতোই ছিলাম, হঠাৎ দেখি এক অল্পবয়সী ছেলে খুবই কুৎসিত দৃষ্টিতে আমার আর আমার বোনের দিকে তাকাচ্ছে। অপমানে আমার গা গুলিয়ে গেল।
আমি তাকে বললাম, ‘আপনি একটা অপদার্থ।’ চারপাশের মানুষকে মুখের ভাষা দিয়ে আমাকে পালটা আক্রমণের সুযোগ না দিয়ে আমি আমার বোনের হাত টেনে হন হন করে বের হয়ে গেলাম। বাসায় তখন বেশ কয়েকজন আত্মীয় এসেছিলেন। যখন এই ঘটনা আমি বললাম, বাসার সব মানুষ আমাকে পালটা আক্রমণ করলো, কেন আমি প্রতিবাদ করলাম! আমার কী নিরাপত্তার চিন্তা নাই! সেদিন আমি সবার সামনেই অপমানে হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম।

এখন যখন অসহায়ত্বের শেষ সীমায় পৌঁছেছি, মনে হয় সত্যিই পালানোর কী আছে? এটা আমার দেশ, আমার কি স্বাধীনতা নাই স্বাধীন ভাবে চলার?! নিজের মানবসত্তাকেই প্রশ্ন করি, ‘মানুষ হিসেবে আমার মধ্যে কি কোনো ঘাটতি আছে?’ অনেক চিন্তা করেও কোনো ঘাটতি খুঁজে পাই না। তাহলে সব এমন কেন? কারণ আমি তথাকথিত সমাজে মানুষ হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার যোগ্য না, আমি হলাম মেয়ে মানুষ।

ছোটবেলায় দাদু বাড়ি ছিলাম দুই বছর, তখন খুব দুরন্ত ছিলাম। এক প্রতিবেশি একবার আমার দুরন্তপনা দেখে বললেন, ‘তোমার নাম মৃত্তিকা না হয়ে বজ্র হওয়া উচিত ছিল।’ আমি বললাম, ‘নাম পালটে ফেলবো!’ ভদ্রমহিলা বললেন, ‘ইসসস! বজ্র ছেলেদের নাম!’
ওইদিনই ধরে নিয়েছিলাম আমাদের সমাজে সব মেয়েদেরই নামের অর্থ মনে হয় অপদার্থ!

কিন্তু আমার ধারণা আমি নিজেই ভুল প্রমাণ করলাম বড় হয়ে। গত বছর শেষদিকে আমার ছোটবোনের তায়কোয়ান্দো ফাইট দেখতে গিয়েছিলাম মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়াম এ। বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েরা শারীরিক কসরত দেখাচ্ছে। আমি দর্শকসারিতে আমার মায়ের পাশে বসে দেখছি। হঠাৎ এক মহিলা কথা নাই, বার্তা নাই আমাকে চিনেন না, জানেন না, এসে অনেক উঁচু গলায় সবার সামনে আমার মাকে বলতে থাকলেন, আমি ওড়না কেন পরি নাই। আমার মতো মেয়ের জন্য সমাজে নাকি বিশৃঙ্খলা। পুরুষ খেলোয়াড়রা নাকি কীভাবে তাকিয়ে আছে হ্যানত্যান। (অথচ পুরুষ নারী সব ধরনের খেলোয়াড় নিজেদের কম্পিটিশন নিয়ে ব্যস্ত। দর্শকসারিতে কে ওড়না পরলো কি পরলো না দেখার জো নেই।)
আমি প্রথমে মনে মনে ধাক্কা খেলেও নিজেকে সামলে নিলাম। আমার মা হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে ছিলো। এমন চমৎকার একটা কম্পিটিশনে আমার তর্ক করার শখ নেই, তাই আমি গটগট করে স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে গেলাম। যাওয়ার আগে শুনলাম, সেই ‘ভদ্রমহিলা’ আমাকে বলছেন, ‘আমার কথা ভালো লাগে নাই শুনতে, তাই না?’

আমি পিছন ফিরে স্পষ্টভাবে বিনয়ের সাথে বললাম, ‘জি, আপনার কথায় খুব বিরক্ত হয়েছি।’ বলে বাইরে গিয়ে বসলাম। তার আগে খেয়াল করলাম আমার উত্তর শুনে উনি থতমত খেয়ে চুপ হয়ে গেলেন, এমন ‘বেয়াদবি’ আশা করেন নাই সম্ভবত। আমি স্টেডিয়ামের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকলাম, উনি নিশ্চয়ই আমাকে আরো উপদেশ দিতে আসবেন। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। উনি আসলেন, আমার মাকেসহ এবং এসেই প্রথম যেই কথা বললেন, ‘তুমি একা বাইরে বসে আছো কেন?’
-‘আমার ইচ্ছা হইসে তাই বসছি।’
উনি আরো খেপে গিয়ে আরো আজেবাজে কথা বলা শুরু করলেন- ‘তোমার ভালোর জন্য বলসি এগুলা। ভালো কথা শুনতে ভালো লাগে না, তাইনা? ওদের চোখ আছে ওরা তো দেখবেই। তুমি ঠিকমতো চলতে পারো না? এত বাড়াবাড়ি করো কেম্নে!’ আরো কী কী জানি বললেন।

আমার হঠাৎ শেখ মুজিবের ভাষণের কয়েকটা লাইন মনে পড়লো, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিবো। এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ মনে মনে ভাবলাম, ‘বাড়াবাড়ি যখন করেছি, বাড়াবাড়ি আরো করবো। নিজেকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ!’

চুপ করে সব উপদেশ শুনে কিছু যুক্তি দিলাম,’এই স্টেডিয়ামে ছেলেমেয়ে সবাই একসাথে তায়কোয়ান্দো কম্পিটিশন এ অংশগ্রহণকারী। তাদের কোনো ঠ্যাকা পরে নাই কোনো চিপায় কে ওড়না পরলো, আর কে পরলো না সেটা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখার। আর আমি কীভাবে চলাচল করবো সেটা আমার ব্যাপার। আপনার বা অন্য কারো ঠিক করে দেওয়ার কোনোই অধিকার নাই।’
ঠাণ্ডা গলায় আমি আরো কী কী কঠিন যুক্তি দিয়েছিলাম আমার মনে নেই, কিন্তু উনি যখন সেগুলো শুনে যুক্তির কাছে হার মানলেন, তখন আরেক ধান্ধা শুরু করলেন, ‘আমি কিন্তু অমুক স্কুলের (কী একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নাম বললেন) সিনিয়র শিক্ষক।’ আমি শুধু বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বললাম, ‘আপনারা শিক্ষক হয়ে এমন ছোট মন নিয়ে চললে ছাত্রছাত্রীরা শিখবেটা কী?’ উনাকে দেখে মনে হলো কেউ এইমাত্র তাকে কারণ ছাড়া চড় দিয়েছে, কিছু একটা বলতে গিয়েও আর বলতে পারলেন না!

আচ্ছা, মেয়ে হয়ে জন্মানোর কারণে কি একটা রেস্টুরেন্ট এ শান্তিমতো আইসক্রিমও খেতে পারবোনা? পৃথিবীতে জন্মেও এর বায়ুমন্ডলে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ নাই? একটা বদ্ধ ঘরেই পরে থাকতে হবে নাকি আমাকে?!

এভাবেই আমার মানবসত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আমার দিন কাটে, কোনো কূল কিনারা খুঁজে পাইনা। তবে বলে না, অগ্ন্যুৎপাতের আগে আগ্নেয়গিরি একদম শান্ত থাকে। বিভিন্ন যৌন হয়রানিতে নির্যাতিত, মেয়ে বলে অমুক কাজ করতে পারে নাই এমন অনেক মেয়েরা কিন্তু এখন চুপ থাকলেও অগ্নুৎপাত শুরু হলেই পুরুষতান্ত্রিকদের পায়ের নিচের মাটি একদম সরে যাবে।

কয়দিনই বা আমরা সহ্য করে যাবো? সেইদিন বেশিদূরে না যেদিন আমরা নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করার বদলে সমাজের প্রচলিত সব নিয়মকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবো। ক্ষোভ জমতে জমতে সেটা একদিন এমন প্রতিবাদ হিসেবে বিস্ফোরিত হবে যে তখন কোনো মানুষরূপী জানোয়ারের সাহস থাকবে না কোনো সত্যিকার মানুষকে দমিয়ে রাখার!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.